বিশ্বকাপ
সাম্রাজ্যবাদের ডেরায় পারস্যের দ্রোহ

সংগৃহীত ছবি
পারস্য উপসাগরের তীরে তখন থেমে গেছে গুলি-বোমার শব্দ। মার্কিন বোমারু বিমানগুলো ফিরে আসছে ঘাঁটিতে। আপাতত বন্ধ হয়েছে যুদ্ধ। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনে ইরান পরিণত হয়েছে মৃত্যু উপত্যকায়। মারা গেছে হাজারো মানুষ। ধ্বংস হয়েছে জনপদ, ঘরবাড়ি, সবকিছু। এত কিছুর পরও সেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ডেরায় বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম ম্যাচ খেলল ইরান। নাহ, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের ঠাঁই হয়নি।
বেসক্যাম্প করতে হয়েছে অন্য আয়োজক দেশ মেক্সিকোর টিহুয়ানায়। সেখান থেকে আকাশপথে ইরানের প্রথম ম্যাচের ভেন্যু লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামের দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি। এই দূরত্ব পাড়ি দিয়েই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে এসেছিল ইরান দল। শুধু তাই নয়, ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচ শেষে কোনোরকম বিশ্রাম ছাড়াই তাদের উঠতে হয়েছে মেক্সিকোর বিমানে। ইরানের প্রধান কোচ আমির গালেনোয়েই একরাশ আক্ষেপ নিয়ে বলেই দিয়েছেন, ‘ওরা আমাদের বিশ্রামের সময়টুকু দিল না। ম্যাচ শেষে বলেছে, তোমাদের এখনই চলে যেতে হবে!’
ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন কিছু প্রবাসী ইরানি, যারা দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর বিরোধী। ইরানের জাতীয় সংগীতের সময় গ্যালারিতে দুয়োও শোনা যায়। তবে মাঠের খেলা শুরু হতেই নজরকাড়া পারফরম্যান্স কিছুক্ষণের জন্য ভুলিয়ে দিল সবকিছু। দুই দলের মুহুর্মুহু আক্রমণে নেচে উঠল গ্যালারি।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটেই ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশটিকে এগিয়ে দেন এলি জাস্ট। ৩২ মিনিটে রামিন রেজাইয়ানের গোলে সমতা ফেরায় ইরান। এর পরই এ ডিফেন্ডার জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে গ্যালারির দিকে ছুটে যান। ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও তিনি স্পষ্ট বলে দেন, ‘হ্যাঁ, এটা একটা রাজনৈতিক ব্যাপার ছিল। তবে আমি এটা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। আমরা এখানে ফুটবল-সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে এসেছি। আমাদের (ইরানের জনগণের) যদি কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তবে সেটি আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।’
মার্কিন মুলুকে ম্যাচের প্রথমার্ধে রেজাইয়ান যে দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিলেন, ম্যাচের বাকিটা সময় জুড়ে রইল তারই আবহ। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৪ মিনিটে এলি জাস্ট নিজের দ্বিতীয় গোলটি করে কিউইদের আবারও এগিয়ে দেন। সমতায় ফিরতে সময় নেয়নি ইরানও। ৬৫ মিনিটে মোহাম্মদ মোহেবির দুর্দান্ত এক হেডে স্কোরলাইন ২-২ হয়ে যায়। এরপরই আসে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তটি। গোল করার পর ২৭ বছর বয়সী এ উইঙ্গার নিজের এক হাতের দুই আঙুল অন্য হাতের বাহুতে তাক করেন এবং পরে ডান হাতের দুটি আঙুল বন্দুকের মতো করে বাতাসে ঘোরান। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ইরানি ফুটবলারের এমন উদ্যাপন বিতর্ক সৃষ্টি করতে সময় নেয়নি।
মোহেবির এই উদ্যাপনকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখছে ফুটবলবিশ্বের একাংশ। এমনকি ফিফার কাছে তদন্তের দাবিও উঠেছে। তবে রেজাইয়ানের মতো বিতর্ক আর উসকে দিতে চাননি মোহেবি। ম্যাচ শেষে নিজের উদ্যাপনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে, ‘আমি লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসরত সব ইরানি প্রবাসীকে ধন্যবাদ জানাতে চেয়েছিলাম। স্টেডিয়ামে তারা দারুণ এক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন। গোল করার পর হঠাৎ করেই উদ্যাপনটা মাথায় আসে এবং আমি গ্যালারির সব ভক্তের উদ্দেশেই এটি করেছি। এটি স্রেফ একটি সাধারণ উদ্যাপন, অন্য কিছু নয়।’
মার্কিন ভূখণ্ডে পারস্যের ফুটবলারদের এই স্পর্ধিত উদ্যাপন ফুটবল আর রাজনীতির সেই অবিচ্ছেদ্য যুগলবন্দিকেই যেন বিশ্বমঞ্চের ক্যানভাসে আবারও ফুটিয়ে তুলল ইরান। একের পর এক বাধার পাহাড় ঠেলে বিশ্বমঞ্চে ঠিকই নিজেদের জানান দিয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। পয়েন্ট ভাগাভাগির একটা আফসোস তো আছেই। তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের সবুজ গালিচায় রেজাইয়ান-মোহেবিদের এই স্পর্ধিত দ্রোহের রেশ কতদূর গড়াবে, সেই উত্তর তোলা থাক মহাকালের হাতে। দিনশেষে বিশ্ববিবেকের কাঠগড়ায় প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে ইরানি কোচের সেই আকুতি— ‘ওরা আমাদের বিশ্রামের সময়টুকুও দিল না!’




