পুরনো ক্ষত ভুলে নতুন মিশনে এমবাপ্পে
- ২৪ বছর পর মুখোমুখি দুই দল

যদি জিজ্ঞেস করা হয় এবারের বিশ্বকাপে ফেভারিট কোন দল, তাহলে বেশিরভাগ মানুষ বিনা দ্বিধায় জবাব দেবেন ফ্রান্স। কেউ কেউ হয়তো বলতে পারেন স্পেন। দুদলেরই দারুণ সম্ভাবনা রয়েছে শিরোপা জেতার। কিন্তু অধিকাংশ মানুষেরই বাজি থাকবে ফ্রান্সের পক্ষে। কারণটাও পরিষ্কার, টানা দুই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা ফরাসিরা এবার যে দল নিয়ে বিশ্বকাপে যাচ্ছে তাতে সবার আস্থা অর্জন করাটা স্বাভাবিক। আক্রমণ, মধ্যমাঠ এবং রক্ষণ— তিন বিভাগেই কোচ দিদিয়ের দেশমের হাতে রয়েছে একাধিক অস্ত্র।
আক্রমণভাগের দিকে তাকালে যেকোনো দলের বুকে কাঁপন ধরাটা স্বাভাবিক। এমবাপ্পে, দেম্বেলে, দুয়ে এবং ওলিসে— এই নামগুলো যেকোনো রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্কের। সদ্য ব্যালন ডি’অর জয়ী দেম্বেলে আছেন ক্যারিয়ারের সেরা ছন্দে। পিএসজিতে তার সতীর্থ দেজিরে দুয়েকে অন্যতম সেরা তরুণ খেলোয়াড় মনে করেন অনেকে। ফ্রান্সের এই দুই তারকা পিএসজিকে টানা দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা উপহার দিয়েছেন।
আরেক তরুণ তুর্কি বায়ার্ন মিউনিখের মাইকেল ওলিসে। এরই মধ্যে বিশ্ব ফুটবলের বড় ক্লাবগুলোর নজর কেড়ে নিয়েছেন তিনি। গুঞ্জন উঠছে, রিয়াল মাদ্রিদ ১৫০ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে তাকে দলে ভেড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিশ্বকাপের আগে প্রীতি ম্যাচে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে প্রমাণ করেছেন-এতসব বড় নামের মধ্যে তাকে আড়াল করার সুযোগ নেই।
এমবাপ্পে একজন প্রকৃত নেতা এবং সে দলে থাকলে ফ্রান্স সবসময় আরও শক্তিশালী থাকে- দিদিয়ের দেশম
আক্রমণে এত তরুণ তারকার জন্য খেলাটা আরেকটু সহজ হয়ে যায়, কারণ তাদের অভিভাবক হিসেবে থাকবেন দলটির অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে। এমবাপ্পেকে নতুন করে পরিচয় করানোর কিছু নেই। ২৭ বছর বয়সেই তার সঙ্গে তুলনা করা হয় বিশ্বের নামিদামি অনেক কিংবদন্তির। পিএসজিতে আলো ছড়ানোর পর এখন রিয়াল মাদ্রিদের প্রাণস্পন্দন তিনি।
ক্লাব এবং জাতীয় দল— দুই জার্সিতেই সমানে সমান এমবাপ্পে। রাশিয়া বিশ্বকাপে চার গোল করে দলকে দ্বিতীয় শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। সেবারই প্রথম ফুটবল বিশ্ব চিনেছিল তাকে। অনেক বিশ্লেষক দাবি করেন, তিনিই হবেন ভবিষ্যতে ফুটবলের মহানায়ক।
বিশ্লেষকদের সেই মতামত সত্য প্রমাণ করতে হয়তো মরিয়া এমবাপ্পে। সময় যত যাচ্ছে ততই নিজেকে ছাড়িয়ে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যাচ্ছেন এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপের গত আসরে ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে দ্বিতীয় শিরোপা জেতার একদম দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপ ছিল পুরো এমবাপ্পেময়। এত সাফল্যের পরও আক্ষেপটা থেকে গিয়েছিল ঠিকই। শেষ মুহূর্তে টাইব্রেকারে হারতে হয় মেসির আর্জেন্টিনার কাছে। সেই হারের যন্ত্রণা এখনো ভুলতে পারেননি ফরাসি অধিনায়ক। তিনি বলেছেন, ‘বিশ্বকাপ ফাইনালে হার মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। চার বছর পরপর এমন সুযোগ আসে। সেই ম্যাচে খেলা অনেক ফুটবলারই এবার বিশ্বকাপে নেই। আমরা এত কিছু করার পরও শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরেছি। পেনাল্টিকে আমি ভাগ্যের খেলা মনে করি না, এটি একটি কারিগরি দক্ষতা। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনাল হারার জন্য এর চেয়ে নিষ্ঠুর উপায় আর নেই।’
ফাইনালে সেই হারের ক্ষতটা এতটাই গভীর যে, তিনি সরাসরি বলেই ফেলেছেন, সুযোগ পেলে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালটি আবার খেলতে চাইতেন, যাতে ভাগ্যের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।
তবে সেই সুযোগ বাস্তবে আর নেই। এখন এমবাপ্পের সামনে নতুন লক্ষ্য। গতবারের অধরা স্বপ্নটা পূরণ করতে মরিয়া তিনি। দায়িত্বটাও অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তিনিই হলেন ফ্রান্স সমর্থকদের ভরসার পাত্র। ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশমের মুখেও পাওয়া যায় একই ইঙ্গিত, ‘এমবাপ্পে একজন প্রকৃত নেতা এবং সে দলে থাকলে ফ্রান্স সবসময় আরও শক্তিশালী থাকে।’
এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের তৃতীয় শিরোপা অভিযানে প্রথম প্রতিপক্ষ সেনেগাল। আফ্রিকার এই দেশটির নাম শুনলে পুরনো দুঃস্মৃতি মনে পড়তে পারে ফ্রান্সের। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুবার সেনেগালের মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স এবং প্রতিবারই হারের মুখ দেখতে হয়েছে দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের।
১৯৬৩ সালে প্রথম মুখোমুখিতে ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারায় সেনেগাল। যদিও ফ্রান্সের মূল সারির দল তখন খেলেনি। কিন্তু ২০০২ বিশ্বকাপে তারকায় ঠাসা ফ্রান্সকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিল টেরাঙ্গার সিংহরা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জেতার পর জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে অনেকে ফ্রান্সকেই ফেভারিট ভেবেছিলেন। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই ১-০ গোলে হেরে হোঁচট খায় তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। ২৪ বছর পর আবারও গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি দুদল। তবে এবার অনেক বেশি পরিণত ফ্রান্স। ২০০২ বিশ্বকাপে সেনেগাল দলে ছিলেন প্রধান কোচ পাপে থিউ। বিশ্বকাপের আগে তিনি জানিয়েছেন, ফ্রান্সকে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত তার দল, ‘হ্যাঁ আমরা ২০০২ সালে ভালো করেছি। কিন্তু এবার বিষয়টি মোটেই সহজ না। ফ্রান্স বর্তমানে অন্যতম শক্তিশালী দল। কিন্তু তাদের হারানোর জন্য যা করা দরকার আমরা তা করব।’




