মহাতারকা ছাড়াই মহাবিস্ময়

লিওনেল মেসি, নেইমার, কিলিয়ান এমবাপ্পে, সের্হিয়ো রামোস— কে ছিলেন না পিএসজিতে। একটি চ্যাম্পিয়নস লিগের জন্য ক্লাব কর্ণধার নাসের আল খেলাইফি মহাতারকাদের মহামিলন ঘটিয়েছিলেন পিএসজিতে। শিরোপাটা অধরা থেকে যায় তারপরও। লুইস এনরিকের কাছে এরপর প্রস্তাব যায় দলটিকে গড়ে তোলার। অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হচ্ছে বলে শুরুতে ‘না’ করে দেন এ স্প্যানিয়ার্ড কোচ।
তারকারা একে একে ক্লাব ছাড়তে থাকলে নতুন প্রকল্প নিয়ে পিএসজিতে নাম লেখান এনরিকে। সেই প্রকল্পের মধ্যমণি হতে পারতেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। তিনিও ছেড়ে যান ক্লাব। এমবাপ্পে রিয়ালে যাওয়ার পর এনরিকে বলেছিলেন, ‘পরের মৌসুমে আমরা আরও শক্তিশালী হব। এমবাপ্পে থাকলে সবসময় খেলা আমার নিয়ন্ত্রণে থাকত না। এখন থেকে থাকবে।’
কথা রেখেছেন এনরিকে। তারার পেছনে না ছুটে কার্যকর খেলোয়াড়দের কিনতে থাকেন তিনি। বেনফিকা থেকে নিয়ে আসেন জোয়াও নেভেসকে, রেনে থেকে দেজেরি দুয়েকে, ফ্রাংকফুর্ট থেকে পাচোকে, ক্রাসনোদার থেকে সাফোনভকে আর নাপোলি থেকে আনেন খিচা কাভারাস্কেইয়াকে।
এ পাঁচজনই খেলেছেন টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের একাদশে। পিএসজির টানা দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়েও অবদান রেখেছেন এই পাঁচজন। শুধু তাই নয়, গত ফাইনাল খেলা একাদশের ১০ জনই ছিলেন বুদাপেস্টে আর্সেনালের বিপক্ষে।
আমরা এখনো চ্যাম্পিয়ন, টানা দুইবার, এটা অসাধারণ। আর্সেনালকে অভিনন্দন, শারীরিকভাবে ওরা অনেক শক্তিশালী হওয়ায় আমাদের জন্য কঠিন ছিল ম্যাচটি -লুইস এনরিকে
আর্সেনালের বিপক্ষে বুদাপেস্টের ফাইনালে ষষ্ঠ মিনিটে কাই হাভার্টজের গোলে পিছিয়ে পড়েছিল পিএসজি। ৬৫ মিনিটে উসমান দেম্বেলের পেনাল্টিতে সমতা ফেরায় তারা। ক্রিস্টিয়ান মস্কেরা বক্সে খিচা কাভারাস্কেইয়াকে ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়েছিলেন রেফারি। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও আর গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানেই ৪-৩ ব্যবধানে বাজিমাত করে রিয়াল মাদ্রিদের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে টানা দুবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতল পিএসজি।
আর্সেনালের দ্বিতীয় শট এবেরেচি এজে বাইরে মারার পর পিএসজির নুনো মেন্দেসের শট ঠেকিয়ে দেন দাভিড রায়া। আর্সেনালের শেষ শটটা ব্রাজিলিয়ান সেন্টারব্যাক মাগালাইসের বারের ওপর দিয়ে মারলে বুনো উল্লাসে মাতে পিএসজি।
মহাতারকাদের ছাড়াই মহাবিস্ময় উপহার দিয়ে এনরিকের দল গত দুই মৌসুমে জিতল সম্ভাব্য ১০ শিরোপার ৮টি। তারা পারেনি শুধু গত ক্লাব বিশ্বকাপ আর এবারের ফ্রেঞ্চ কাপ জিততে। তবে চ্যাম্পিয়নস লিগে ইতিহাস গড়েছে তারা। একমাত্র ফরাসি দল হিসেবে মর্যাদার টুর্নামেন্টটিতে দুই শিরোপা তাদের। অন্য ফরাসি ক্লাব অলিম্পিক মার্শেই জিতেছে একবার।
আনকোরা খেলোয়াড়দের নিয়ে জয়ের ক্ষুধাটা তৈরি করে দিয়েছেন কোচ লুইস এনরিকে। পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর গত তিন বছরে নতুন খেলোয়াড় কিনতে তিনি খরচ করেছেন ৮২০ মিলিয়ন ইউরো। আর পুরনো খেলোয়াড় ছেড়ে দিয়ে ক্লাবকে পাইয়ে দিয়েছেন ৪১৯ মিলিয়ন ইউরো। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বিনা পয়সায় না ছাড়লে অঙ্কটা ছাড়িয়ে যেতে পারত ৬০০ মিলিয়ন ইউরো।
নতুন এই খেলোয়াড়দের নিয়ে পিএসজিকে নতুনভাবেই সাজিয়েছেন এনরিকে। এখন সবাই খেলে একটি দল হিসেবে। এজন্য এমবাপ্পে ক্লাব ছাড়ার পর ২০২৪-২৫ মৌসুমে সব টুর্নামেন্ট মিলিয়ে আগের মৌসুমের চেয়ে ৪৪ গোল বেশি করেছিল পিএসজি।
এ দলে এখন কেউ একা ৫০ গোল করে না, বরং পাঁচজন মিলে ৫০ গোল করানোটাই এনরিকের দর্শন। তার জাদু ছোঁয়ায় বার্সায় ব্যর্থ উসমান দেম্বেলে জিতেছেন ব্যালন ডি’অর। আশরাফ হাকিমি হয়ে উঠেছেন আদর্শ। ভিতিনিয়া এখন তার পজিশনে বিশ্বসেরাদের অন্যতম। রক্ষণে পাচো যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্য দুঃস্বপ্নের নাম। এই দল নিয়ে এনরিকের আত্মতৃপ্তি, ‘এটিই এ মৌসুমের সেরা মুহূর্ত। আমরা এখনো চ্যাম্পিয়ন, টানা দ্বিতীয়বারের মতো, এটা অসাধারণ।’






