কোরআনের বাণী
চরিত্রহানির রাজনীতি ও কোরআনের শিক্ষা

ছবি: আগামীর সময়
কোরআনুল কারিমের বার্তা
সুরা : নূর, আয়াত : ২৬
بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
اَلۡخَبِیۡثٰتُ لِلۡخَبِیۡثِیۡنَ وَ الۡخَبِیۡثُوۡنَ لِلۡخَبِیۡثٰتِ ۚ وَ الطَّیِّبٰتُ لِلطَّیِّبِیۡنَ وَ الطَّیِّبُوۡنَ لِلطَّیِّبٰتِ ۚ اُولٰٓئِكَ مُبَرَّءُوۡنَ مِمَّا یَقُوۡلُوۡنَ ؕ لَهُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّ رِزۡقٌ كَرِیۡمٌ
২৬. দুশ্চরিত্রা নারী দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য; দুশ্চরিত্র পুরুষ দুশ্চরিত্র নারীর জন্য; সচ্চরিত্রা নারী সচ্চরিত্র পুরুষের জন্য এবং সচ্চরিত্র পুরুষ সচ্চরিত্রা নারীর জন্য। লোকেরা যা বলে তার সাথে তারা সম্পর্কহীন; তাদের জন্য আছে ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।
এই আয়াতটি মূলত আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধে মুনাফিকদের অপবাদ (হাদিসে ইফক) প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী (রহ.) বলেছেন, আয়াতের অর্থ হলো, অপবিত্র ও নোংরা কথাবার্তা অপবিত্র লোকদের মুখেই মানায়, আর পবিত্র কথা পবিত্র লোকদের মুখেই শোভা পায়।
তিনি সাহাবি ইবন আব্বাস (রা.) এবং অন্যান্য সালাফ থেকে বর্ণনা করেন যে, এখানে "الخبيثات" ও "الطيبات" দ্বারা অনেক মুফাসসির কথা বা বক্তব্য (الكلمات) বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ অপবাদের মতো নোংরা কথা নোংরা লোকদের উপযুক্ত, আর সত্য ও পবিত্র কথা সৎলোকদের উপযুক্ত। (তাফসিরে তাবারী, ১৯/১৫৮-১৬২)
ইবন কাসীর (রহ.) বলেছেন, এই আয়াত আয়েশা (রা.)-এর নির্দোষিতা প্রমাণের অন্যতম শক্তিশালী দলিল।
তিনি বলেছেন, আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বাপেক্ষা পবিত্র মানুষ, সুতরাং তার স্ত্রীও পবিত্র ও সম্মানিতা হওয়াই স্বাভাবিক। আল্লাহর নবীর ঘরে একজন ব্যভিচারিণী নারীর অবস্থান কল্পনাই করা যায় না।
ইবন কাসীর লিখেছেন: ‘যদি আয়েশা (রা.) সম্পর্কে অপবাদকারীদের কথা সত্য হতো, তবে তিনি নবী (সা.)-এর উপযুক্ত স্ত্রী হতেন না। অথচ আল্লাহ তাকে নবীর স্ত্রী হিসেবে বহাল রেখেছেন এবং তাঁর পবিত্রতার ঘোষণা দিয়েছেন।’ (তাফসির ইবন কাসীর, ৬/৪১-৪৩)
ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেছেন, মুফাসসিরদের মধ্যে দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। প্রথম মত: এখানে ‘খবীস’ ও ‘তাইয়্যিব’ দ্বারা কথা ও বক্তব্য বোঝানো হয়েছে। দ্বিতীয় মত: এখানে পুরুষ ও নারী বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণত আল্লাহর বিধান ও তাকদির অনুযায়ী সচ্চরিত্র পুরুষের প্রতি সচ্চরিত্র নারীর এবং অসচ্চরিত্র পুরুষের প্রতি অসচ্চরিত্র নারীর আকর্ষণ ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, আয়াতের মূল উদ্দেশ্য হলো আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা ঘোষণা। (তাফসির কুরতুবী, ১২/২০৮-২১০)
ইমাম বাগাভী (রহ.) বলেছেন, ‘পবিত্র নারীরা পবিত্র পুরুষদের জন্য, আর পবিত্র পুরুষরা পবিত্র নারীদের জন্য।’ এটি আয়েশা (রা.) ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বলা হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ (সা.)-এর স্ত্রী হিসেবে আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা সন্দেহাতীত। (তাফসির আল-বাগাভী, ৬/৪৪-৪৫)
ফখরুদ্দীন আর-রাযী (রহ.) বলেছেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ একটি যুক্তিগত সত্য তুলে ধরেছেন। মানুষের স্বভাব সাধারণত তার সমগোত্রীয় ও সমধর্মী মানুষের দিকে ঝোঁকে। পবিত্র মানুষ পবিত্রতার প্রতি আকৃষ্ট হয়, আর অপবিত্র মানুষ অপবিত্রতার দিকে।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, এটি কোনো অব্যর্থ জাগতিক নিয়ম নয়, বরং আয়াতের প্রসঙ্গে নবী (সা.) ও আয়েশা (রা.)-এর পবিত্রতা প্রতিষ্ঠাই মুখ্য বিষয়। (তাফসিরে কবীর, ২৩/১৭৮-১৮০)
একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল ধারণার সংশোধন
অনেক মানুষ এই আয়াত থেকে এমন ধারণা করেন যে, প্রত্যেক সৎ পুরুষ অবশ্যই সৎ স্ত্রী পাবে এবং প্রত্যেক সৎ নারী অবশ্যই সৎ স্বামী পাবে। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসির এ ধরনের চূড়ান্ত অর্থ গ্রহণ করেননি।
কারণ পবিত্র কোরআনেই দেখা যায়: নূহ (আ.)-এর স্ত্রী ছিলেন অবাধ্য। লূত (আ.)-এর স্ত্রী ছিলেন অবাধ্য। ফিরআউনের স্ত্রী আসিয়া (আ.) ছিলেন ঈমানদার, কিন্তু তার স্বামী ছিল পৃথিবীর অন্যতম জালিম।
অতএব,
আয়াতটি কোনো সর্বজনীন বৈবাহিক গ্যারান্টি
নয় যে, প্রত্যেক
ভালো মানুষের জীবনসঙ্গীও ভালো হবে। বরং এর মূল বক্তব্য হলো: (১) আয়েশা (রা.)-এর
বিরুদ্ধে অপবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা। (২) পবিত্র মানুষ ও পবিত্র চরিত্রের সঙ্গে
অপবিত্রতার অভিযোগ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
(৩) অপবিত্র কথা অপবিত্র লোকদের মুখে
মানায়, আর
পবিত্রতা পবিত্র মানুষের বৈশিষ্ট্য।
(৪) আল্লাহর কাছে সচ্চরিত্র ও পবিত্র
মানুষের জন্য রয়েছে ‘মাগফিরাত’ (ক্ষমা) এবং
‘রিযকুন
কারীম’ (সম্মানজনক,
উত্তম ও জান্নাতি জীবিকা)।
সুতরাং ক্লাসিক তাফসিরসমূহের আলোকে আয়াতটির কেন্দ্রীয় বার্তা হলো, হাদিসে ইফকের ঘটনায় আয়েশা (রা.)-এর নির্দোষিতা ও পবিত্রতা ঘোষণা করা এবং এ শিক্ষা দেওয়া যে, নোংরা অপবাদ নোংরা মানুষের কাজ, আর পবিত্র চরিত্রের মানুষ এসব অপবাদ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।




