অনলাইন বেচাকেনায় ইসলামী নৈতিকতা

প্রতীকী ছবি
ডিজিটাল যুগে অনলাইন কেনাকাটা মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। ঘরে বসেই পণ্য নির্বাচন করা, মূল্য পরিশোধ ও সরবরাহ পাওয়া এখন সাধারণ বিষয়। তবে এই সুবিধার পাশাপাশি বেড়েছে প্রতারণা, ভুয়া বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর ছবি, সাজানো রিভিউ এবং পণ্যের প্রকৃত অবস্থা গোপন করার প্রবণতা। ইসলাম ব্যবসাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে, কিন্তু সেই ব্যবসা হতে হবে সততা, স্বচ্ছতা ও আমানতদারির ভিত্তিতে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য হতে পারে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ২৯)। এই আয়াত অনলাইন বাণিজ্যেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ক্রেতার সম্মতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন সে পণ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানবে।
বর্তমানে অনেক বিক্রেতা বাস্তব পণ্যের পরিবর্তে অতিরিক্ত সম্পাদিত বা অন্য পণ্যের ছবি ব্যবহার করেন। এতে ক্রেতা প্রতারিত হন। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার খাদ্যের স্তূপে হাত দিয়ে ভেতরে ভেজা অংশ দেখে বলেছিলেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০২)। অতএব অনলাইনে পণ্যের প্রকৃত ছবি, সঠিক বিবরণ এবং ত্রুটি থাকলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা ইসলামী নৈতিকতার দাবি।
একইভাবে ভুয়া বা অর্থের বিনিময়ে ইতিবাচক রিভিউ দেওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মিথ্যা নেতিবাচক মন্তব্য ছড়ানোও গুরুতর অনৈতিক কাজ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯)। আবার তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য ও অসত্য প্রচার থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন (সুরা হাজ্জ, আয়াত : ৩০)। তাই রিভিউ হবে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে, অতিরঞ্জন বা বিদ্বেষ থেকে নয়।
বিক্রেতার মতো ক্রেতারও নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। অযৌক্তিক অভিযোগ তুলে রিফান্ড নেওয়া, পণ্য ব্যবহার করে ফেরত দেওয়া, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে কম রেটিং দিয়ে ক্ষতি করা ইসলামী নীতির পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়েরই (লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার আগে) স্বাধীনতা রয়েছে। তারা যদি সত্য কথা বলে এবং পণ্যের ত্রুটি প্রকাশ করে, তবে তাদের লেনদেনে বরকত দেওয়া হয়। আর যদি গোপন করে ও মিথ্যা বলে, তবে সেই বরকত নষ্ট হয়ে যায়।’ (বুখারি, হাদিস: ২০৭৯)।
ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিতে স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সন্তুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী ফিকহবিদরা বলেছেন, যে লেনদেনে প্রতারণা, অস্পষ্টতা (গারার) বা তথ্য গোপনের কারণে বিরোধের আশঙ্কা থাকে, তা পরিহার করা উচিত। (ইবন কুদামাহ, আল-মুগনি)
অনলাইন বাণিজ্য শুধূ প্রযুক্তিনির্ভর নয়; এটি নৈতিকতারও পরীক্ষা। একজন মুসলিম বিক্রেতা সঠিক তথ্য, প্রকৃত ছবি ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করবেন। আর একজন মুসলিম ক্রেতা সত্যনিষ্ঠ রিভিউ দেবেন এবং বিক্রেতার প্রতি ন্যায়বিচার করবেন। কারণ ইসলামে সফল ব্যবসা শুধু লাভের অঙ্কে নয়, বরং সততা, বিশ্বাস এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




