হজে মৃত্যুবরণ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। কিন্তু কিছু মৃত্যু মানুষের হৃদয়ে আলাদা অনুভূতি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে যখন কেউ ইহরামের সাদা কাপড়ে, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনির মাঝে, কাবাঘর ও আরাফার পবিত্র পরিবেশে মৃত্যুবরণ করেন, তখন মুসলমানদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ইসলামের দৃষ্টিতে এ মৃত্যুর মর্যাদা কী?
ইসলাম হজের সময় মৃত্যুবরণকে সৌভাগ্য ও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের আশা হিসেবে দেখে। তবে এ বিষয়ে বাড়াবাড়ি বা নিশ্চিত জান্নাতের ফয়সালা করাও শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ চূড়ান্ত বিচার একমাত্র আল্লাহর হাতে। তবু কোরআন-হাদিসে এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে, যা হজের পথে মৃত্যুকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মৃত্যু হিসেবে তুলে ধরে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেই এক সাহাবি হজের সফরে ইহরাম অবস্থায় উট থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তখন রাসুল (সা.) সাহাবিদের নির্দেশ দেন— ‘তাকে পানি ও বরইপাতা দিয়ে গোসল দাও, তার ইহরামের কাপড়েই কাফন দাও, সুগন্ধি লাগিও না এবং তার মাথা আবৃত করো না। কারণ কিয়ামতের দিন সে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠবে।’ (বুখারি, হাদিস : ১২৬৫; মুসলিম, হাদিস : ১২০৬)
এই হাদিস ইসলামী ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মুহাদ্দিসগণ বলেন, এটি প্রমাণ করে যে ইহরাম অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি বিশেষ মর্যাদা লাভের আশা রাখেন। কিয়ামতের দিনও তিনি ইবাদতের অবস্থায় পুনরুত্থিত হবেন।
ইমাম নববি (রহ.) বলেছেন— ‘এই হাদিসে ইহরাম অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীর মর্যাদা ও ফজিলতের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।’ (শরহু সহিহ মুসলিম, ৮/১৩৩)
হজ মূলত গুনাহ মাফের সফর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকল, সে এমন নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫২১)
এই হাদিসের আলোকে আলেমরা বলেন, যদি কেউ হজের সফরেই মৃত্যুবরণ করেন, তবে তিনি এমন এক ইবাদতের মাঝে মৃত্যুবরণ করছেন, যা মানুষের গুনাহ মাফের অন্যতম বড় মাধ্যম।
তবে ইসলামের শিক্ষা হলো ভারসাম্য। তাই কাউকে নিশ্চিতভাবে ‘শহিদ’ বা ‘জান্নাতি’ ঘোষণা করা হয় না, যদি না শরিয়তে স্পষ্ট দলিল থাকে। কারণ মানুষের অন্তরের অবস্থা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।
ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেছেন— ‘হজে মৃত্যুবরণকারী সম্পর্কে কল্যাণের আশা করা হবে, তবে চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে।’ (ফাতহুল বারি, ৩/৪৯১)
হজের সফরে মৃত্যু মানুষকে আখিরাতের বাস্তবতার কথাও গভীরভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন হাজি যখন ইহরামের সাদা কাপড় পরে, তখন সেটি অনেকটা কাফনের মতোই দেখায়। দুনিয়ার সব অলংকার, পদমর্যাদা ও পরিচয় ছেড়ে সে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। এ দৃশ্য যেন মানুষকে বলে দেয়, জীবনের শেষ সফরও এমনই হবে।
ইমাম গাজালি (রহ.) লিখেছেন— ‘ইহরামের পোশাক মানুষের মনে মৃত্যুর কাফনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেন সে আখিরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।’ (ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২৪৭)
হজের সময় মৃত্যুবরণকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে আবেগও প্রবল থাকে। কারণ একজন মানুষ এমন একটি অবস্থায় দুনিয়া ত্যাগ করছেন, যখন তার জিহ্বায় আল্লাহর জিকির, অন্তরে তাওবা এবং চারপাশে ইবাদতের পরিবেশ বিদ্যমান থাকে।
বিশেষ করে আরাফার দিন সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘আরাফার দিনের চেয়ে বেশি এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ বান্দাদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৩৪৮)
তাই আরাফা বা হজের দিনগুলোতে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির ব্যাপারে মুসলমানরা আল্লাহর রহমতের বিশেষ আশা করেন।
তবে একটি ভুল ধারণা সমাজে কখনো কখনো দেখা যায়। কেউ মনে করেন, হজে মৃত্যুবরণ করলেই আর কোনো হিসাব হবে না বা নিশ্চিত মুক্তি হয়ে যাবে। এ ধরনের চূড়ান্ত বক্তব্য প্রমাণ ছাড়া বলার সুযোগ নেই। কারণ আল্লাহর বিচার ইনসাফপূর্ণ এবং তিনি মানুষের নিয়ত, আমল ও ঈমান অনুযায়ী ফয়সালা করবেন।
হজে মৃত্যুবরণ আমাদের জন্যও একটি বড় শিক্ষা বহন করে। মানুষ জানে না তার মৃত্যু কোথায় হবে। কেউ ঘরে বসে মৃত্যুর অপেক্ষা করে, আবার কেউ আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। তাই ইসলামের শিক্ষা হলো, মৃত্যু যেকোনো সময় আসতে পারে, সুতরাং সর্বদা আল্লাহর দিকে ফিরে থাকার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘তুমি দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত বা পথিক।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১৬)
হজের সফরে মৃত্যুবরণ যেন এই হাদিসের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। মানুষ এক সফরে বের হয়, আর সেই সফরই তার চিরস্থায়ী গন্তব্যের পথে পরিণত হয়।
মহান আল্লাহ আমাদের ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপন এবং ঈমানের সঙ্গেই মৃত্যু বরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।






