হাদিসের আলোকে দোয়া কবুলের নিশ্চিত সময়গুলো
- যেই পাঁচ সময়ে খোলা থাকে আসমানের দরজা
- দোয়া কবুলের পাঁচ বিশেষ সময়

সংগৃহীত ছবি
মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আছে; যখন দোয়া সহজে কবুল হয়, আমল দ্রুত আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায় এবং বান্দা তার রবের বিশেষ নৈকট্য লাভ করে। ইসলাম আমাদের সেই সময়গুলো চিহ্নিত করে দিয়েছে, যাতে আমরা সেগুলোকে গুরুত্ব দেই এবং ইবাদত, দোয়া ও তাওবার মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে পরিশুদ্ধ করতে পারি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ (সূরা গাফির, আয়াত : ৬০)। এই আহ্বানের বাস্তব রূপ সেই বিশেষ সময়গুলোতেই ফুটে ওঠে যখন আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। সহীহ হাদিসের আলোকে মুসলিম স্কলাররা এমন পাঁচটি সময় চিহ্নিত করেছেন যেই সময়গুলোতে আসলামনের দরজা খুলে দেয়া হয় আর তখন বান্দার যেকোনো আকুতি খুব সহজেই কবুল করে নেওয়া হয়।
এক. জোহরের আগে বা সূর্য ঢলে পড়ার সময়
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য ঢলে পড়ার সময় আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জোহরের সালাত আদায় করা পর্যন্ত তা বন্ধ হয় না। তাই আমি পছন্দ করি যে, এই সময়ে আমার কোনো নেক আমল ওপরে উঠুক’ (সহীহুল জামে, হাদিস ১৫৩২)। এ সময়টি মূলত দিনের একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত, যখন মানুষ পার্থিব কাজের ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে পারে।
দুই. প্রতিটি আযানের সময়
আযান শুধু নামাজের আহ্বান নয়, বরং এটি রহমতের দ্বার উন্মোচনেরও ঘোষণা। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যখন সালাতের জন্য আযান দেওয়া হয়, তখন আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং দোয়া কবুল করা হয়’ (সহীহুত তারগীব, ২৬০)। তাই আযান শোনার সময় ও এর পরপরই দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
তিন. দুই সালাতের মধ্যবর্তী সময়ে অপেক্ষমাণ অবস্থায়
যে ব্যক্তি এক ফরজ আদায় করে পরবর্তী ফরজের জন্য অপেক্ষা করে, সে প্রকৃতপক্ষে ইবাদতের মধ্যেই অবস্থান করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের রব আসমানের একটি দরজা খুলে দিয়েছেন এবং তোমাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করে বলছেন; দেখ আমার বান্দাদের দিকে, তারা একটি ফরজ আদায় করেছে এবং পরবর্তী ফরজের জন্য অপেক্ষা করছে’ (সহীহুত তারগীব, ৪৪৫)। এটি এমন এক অবস্থান, যেখানে বান্দার ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়।
চার. মধ্যরাত
রাতের গভীর নির্জনতায় যখন মানুষ ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন আল্লাহর রহমত বিশেষভাবে নাজিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অর্ধরাতে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়, তখন এমন কোনো মুসলিম থাকে না যে দোয়া করে আর আল্লাহ তা কবুল করেন না’ (সহীহুত তারগীব, ৭৮৬)। পবিত্র কোরআনেও রাতের ইবাদতের বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরে বলা হয়েছে: ‘তারা রাতের অল্প অংশই নিদ্রায় কাটাত এবং শেষরাতে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত’ (সূরা আয-যারিয়াত আয়াত : ১৭-১৮)।
পাঁচ. সালাতের শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা বা সানা পাঠের সময়
এক সাহাবি যখন সালাতে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আল্লাহু আকবার কাবিরা, ওয়ালহামদুলিল্লাহি কাসিরা, ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়া আসিলা’, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি অবাক হলাম, কারণ এই বাক্যগুলোর জন্য আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়েছে’।
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে- আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সালাত আদায় করেছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি বলে উঠল:
اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلاً
উচ্চারণ: ‘আল্লাহু আকবার কাবীরা- ওয়াল হামদুলিল্লা-হি কাসীরা- ওয়া সুবহা-নাল্ল-হি বুকরাতান ওয়া আসীলা’-
অর্থা: আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, বড়। সব প্রশংসা আল্লাহর। আর সকাল ও সন্ধ্যায় তারই পবিত্রতা বর্ণনা করতে হবে।
(সালাত শেষে) রাসূলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ কথাগুলো কে বলল? সবার মধ্যে থেকে জনৈক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসূল আমি ঐ কথাগুলো বলেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, কথাগুলো আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। কারণ কথাগুলোর জন্য আসমানের দরজা খুলে দেয়া হয়েছিল।
আবদুল্লাহ ইবনে উমার বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে এ কথাগুলো বলতে শোনার পর থেকে তার ওপর আমল করা আমি কখনও ছাড়িনি। (মুসলিম, হাদিস : ৬০১)।
এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর মহিমা বর্ণনা নিজেই এক মহান আমল, যা সরাসরি আসমানের দরজা উন্মুক্ত করে।
এই পাঁচটি সময় আমাদের জন্য বিশেষ সুযোগের দরজা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই সুযোগগুলোকে কাজে লাগাচ্ছি?
বাস্তবতা হলো, আমরা অধিকাংশ সময় এসব মূল্যবান মুহূর্ত অবহেলায় হারিয়ে ফেলি। অথচ সামান্য সচেতনতা আমাদের জীবনকে বদলে দিতে পারে।
কাজেই একজন মুমিনের উচিত তার দৈনন্দিন জীবনে এই সময়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া। যোহরের আগে কিছু নফল ইবাদত, আযানের সময় দোয়া, দুই সালাতের মাঝখানে অপেক্ষা, রাতের নির্জনে কান্না আর সালাতের শুরুতে আন্তরিক প্রশংসা; এসবই হতে পারে তার মুক্তির পথ। কারণ, যখন আসমানের দরজা খোলা থাকে, তখন বান্দার জন্য আল্লাহর দরবারে পৌঁছানো সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
saifpas352@gmail.com

