আগামীর সময়

ইসরায়েলি কারাগারে মৃত্যুর রাজনীতি

ইসরায়েলি কারাগারে মৃত্যুর রাজনীতি

সংগৃহীত ছবি

ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার লক্ষে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে নতুন আইন পাস হয়েছে। এটি ইসরায়েলি দণ্ডবিধিতে রাষ্ট্রীয় সহিংসতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার এক বিপজ্জনক পদক্ষেপ।

কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো জায়নবাদী রাষ্ট্র ফাঁসিসহ মৃত্যুদণ্ডকে শাস্তির নিয়মিত হাতিয়ার হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল। ‘সন্ত্রাসবাদ’ আখ্যা দিয়ে হামলার অভিযোগে আটক ফিলিস্তিনিদের জন্য আইনটিকে শাস্তির আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

৬২-৪৮ ভোটে অনুমোদিত এই আইনে বলা হয়েছে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। এতে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আইনে বিচারকদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই এবং আপিল বা ক্ষমা পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত রাখা হয়নি।

বাস্তবে, এটি এমন একটি আইনি কাঠামো যা একচেটিয়াভাবে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তু করার জন্য তৈরি। এই মামলাগুলোর বিচার হয় সামরিক আদালতে। অন্যদিকে, ইহুদি বসতি স্থাপনকারী যারা সহিংসতায় জড়িত এবং ইসরায়েলি নাগরিকরা দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থার আওতায় থাকলেও  তাদের বেলায় এ ধরনের শাস্তি খুব কমই প্রয়োগ করা হয়।

আইনটি হঠাৎ করে শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। এটি ইসরায়েলি কারাগার নীতি কঠোর করার এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের সরাসরি প্রভাব রয়েছে এতে।

বেন গভির একজন ফ্যাসিস্ট রাজনীতিবিদ ও ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থীদের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চরম শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রকাশ্যে ওকালতি করে তার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি কারাগারের পরিবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ এমনকি বন্দিদের সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মতো কঠোর নীতির দিকে সরকারকে নিয়ে গেছেন।

তার ভূমিকা কেবল বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মৃত্যুদণ্ড আইনের অন্যতম প্রধান রূপকার। যুদ্ধপরাধী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর এটি কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছেন তিনি।

এই পরিস্থিতি ইসরায়েলি সরকারের ভেতরেই রাজনৈতিক জবরদস্তির ধরন উন্মোচন করে। ভঙ্গুর জোটের ওপর নির্ভরশীল এবং অভ্যন্তরীণ সংকট ও আইনি অভিযোগের চাপে পিষ্ট নেতানিয়াহু বারবার কট্টর ডানপন্থীদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করেছেন। এর ফলে দমন-পীড়ন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর ফিলিস্তিনি বন্দিরা এখানে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে নারী ও শত শত শিশুসহ প্রায় ১০ হাজর ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্দি অবস্থার নাটকীয় অবনতি ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্যাতন, চিকিৎসায় অবহেলা, দীর্ঘায়িত নির্জন কারাবাস ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের নথিভুক্ত প্রমাণ।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হেফাজতে ডজন খানেক বন্দি মারা গেছেন। তাদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে শারীরিক নির্যাতন বা চিকিৎসার অভাবে। তাই এই আইন একটি গুণগত পরিবর্তন নির্দেশ করে। নিছক দমন-পীড়ন থেকে এখন ‘মৃত্যুর রাজনীতির’ দিকে যাচ্ছে দেশটি।

ইসরায়েলি সরকার নিরাপত্তার নামে এই নৃশংসতাকে জায়েজ করার চেষ্টা করছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। কয়েক দশকের গণ-গ্রেপ্তার, অবরোধ ও সামরিক অভিযান ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে নির্মূল করতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো, কারাগারের ভেতরে ও বাইরে সংগ্রামের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, শুধু শক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই মডেলের সীমাবদ্ধতা কতখানি।

প্রতিরোধ নির্মূল করার পরিবর্তে কারাগারগুলো রাজনৈতিক সংগঠন ও চেতনা তৈরির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। অনশন ধর্মঘট, অভ্যন্তরীণ সংহতি ও রাজনৈতিক আলোচনায় বন্দিদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা এটাই প্রমাণ করে যে, বন্দিশালা তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

এই ব্যর্থতার মুখে মৃত্যুদণ্ডকে দমনমূলক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যখন কারাবাস যথেষ্ট হয় না, তখন মৃত্যুই হয়ে ওঠে পরবর্তী বিকল্প।

কিন্তু এই যুক্তির ভেতরে একটি মৌলিক স্ববিরোধিতা রয়েছে। ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা এড়ানো অসম্ভব যে তাদের প্রতিরোধ কোনো সাময়িক ঘটনা নয়। বরং এটি দখলদারিত্ব ও অধিকার হরণের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া। যতক্ষণ এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে, ততক্ষণ কোনো শাস্তিমূলক নীতি তা যতই নৃশংস হোক না কেন— স্থিতিশীলতা আনতে পারবে না।
তাই এই মৃত্যুদণ্ড আইন কোনো শক্তির লক্ষণ নয়। এটি আসলে সংকটের উপসর্গ। জায়নবাদী শাসনের ধসে পড়ার একটি বহিঃপ্রকাশ যা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দিক থেকে দৃশ্যমান হচ্ছে।

কারাগার ব্যবস্থাকে ফাঁসির মঞ্চে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে জায়নবাদী রাষ্ট্র কেবল আন্তর্জাতিক আইনই লঙ্ঘন করছে না বরং স্পষ্টভাবে সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করছে যা বৈধতা ধরে রাখতে পারছে না।

মৃত্যুর রাজনীতিতে সংঘাতের সমাধান হয় না। এটি কেবল এটাই প্রমাণ করে যে, এই সংঘাত সৃষ্টিকারী ব্যবস্থা টিকে থাকার জন্য এখন সব বিকল্প হারিয়েছে।

লেখক: ব্রাজিল-ফিলিস্তিন ইন্সিটিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ

    শেয়ার করুন: