ক্ষমাই যখন ক্ষমাপ্রাপ্তির সোপান
- মানুষের প্রতি দয়া, আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা
- ক্ষমাশীল হৃদয়ই পায় আল্লাহর রহমত

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে এমন কিছু গুণ আছে, যেগুলো যেমন সামাজিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমনি ব্যক্তির আখিরাতের মুক্তির পথও উন্মুক্ত করে দেয়। ক্ষমা তেমনই একটি মহৎ গুণ। প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যকে ছেড়ে দেওয়া, নিজের পাওনা থেকে সরে আসা, মানুষের দুর্বলতাকে উপলব্ধি করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় উদারতা প্রদর্শন করা ইসলামের এক অনন্য শিক্ষা। আজকের কঠোর, প্রতিযোগিতামূলক ও আত্মকেন্দ্রিক সমাজে এই গুণ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। অথচ নবী (সা.)-এর হাদিস আমাদের দেখায়, মানুষের প্রতি সামান্য দয়া ও কোমলতা কখনো কখনো একজন বান্দার চিরমুক্তির কারণ হয়ে যেতে পারে।
আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, পূর্বযুগে এক ব্যক্তি মানুষকে ঋণ দিত। সে তার কর্মচারীকে নির্দেশ দিত, ‘তুমি যখন কোনো অভাবগ্রস্ত মানুষের কাছে পাওনা আদায় করতে যাবে, তখন তাকে ছাড় দিও। হয়তো আল্লাহও আমাদের ক্ষমা করবেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, অতঃপর সে যখন আল্লাহর সামনে উপস্থিত হলো, তখন আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন। (বুখারি, হাদিস : ৩৪৮০)
হাদিসের যে ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তিনি আল্লাহর ক্ষমা লাভ করেছেন মানুষের প্রতি দয়া ও ঋণগ্রহীতার কষ্ট উপলব্ধি করার কারণে, বড় কোনো ইবাদতের কারণে নয়। ইসলামে মানুষের হক আদায়ের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনি অসহায় মানুষের প্রতি ছাড় দেওয়ার ফযিলতও অসাধারণ।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
‘ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে স্বচ্ছল হওয়া পর্যন্ত অবকাশ দাও। আর যদি ঋণ মাফ করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ২৮০)
এই আয়াত ও হাদিস আমাদের সামনে ইসলামের অর্থনৈতিক নৈতিকতার এক অপূর্ব চিত্র তুলে ধরে। ইসলাম শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য ও লেনদেনের নিয়মই দেয়নি, বরং সেই লেনদেনের মধ্যে মানবিকতা, সহানুভূতি ও আখিরাতের চেতনা সংযোজন করেছে। আজকের পৃথিবীতে অনেক মানুষ ঋণের চাপে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে, আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। সুদ, কিস্তি, দেনা ও অর্থনৈতিক চাপে মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়ে, তখন ইসলাম কঠোর আদায়ের বদলে সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়।
বর্তমান সমাজে পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে যে নির্মমতা দেখা যায়, তা ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। অনেক সময় সামান্য বকেয়া টাকার জন্য মানুষকে অপমান করা হয়, সামাজিকভাবে হেয় করা হয়, এমনকি আদালত ও জেল পর্যন্ত গড়ায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেই ব্যক্তিকে সর্বোত্তম বলেছেন, যে লেনদেনে কোমল আচরণ করে। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ সেই ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে বিক্রয়ের সময়, ক্রয়ের সময় এবং পাওনা আদায়ের সময় কোমল আচরণ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ২০৭৬)
ইসলামে ক্ষমা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি ঈমানি শক্তির বহিঃপ্রকাশ। কারণ মানুষ সাধারণত নিজের অধিকার ছাড়তে চায় না। কিন্তু যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রাপ্য ছেড়ে দিতে পারে, সে প্রকৃত অর্থেই আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে সক্ষম হয়। এ কারণেই মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ
‘তোমরা ক্ষমা করো, উপেক্ষা করো। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা নূর, আয়াত : ২২)
এই আয়াত যেন প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আমরা সবাই আল্লাহর ক্ষমা চাই, কিন্তু আমরা কি মানুষের ভুল ক্ষমা করতে প্রস্তুত? আমরা কি অন্যের দুর্বলতা উপলব্ধি করি? আমরা কি কোনো গরীব আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিত মানুষের প্রতি আর্থিক ছাড় দিতে পারি? যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, সে আল্লাহর দয়ারও যোগ্য হয় না।
ইবনু হাজার আসকালানী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, এখানে মূল শিক্ষা হলো মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা এবং আল্লাহর রহমতের আশা রাখা। বান্দা যখন আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া করে, তখন আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন। (ফাতহুল বারী)
আজ আমাদের সমাজে ক্ষমার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, সামাজিক শত্রুতা এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা মানুষের অন্তরকে কঠিন করে তুলছে। অথচ ক্ষমা শুধু অন্যকে মুক্তি দেয় না, ক্ষমাকারীকেও অন্তরের প্রশান্তি দেয়। মনোবিজ্ঞানীরাও বলেন, ক্ষমাশীলতা মানসিক চাপ কমায় এবং মানুষের হৃদয়ে ইতিবাচকতা সৃষ্টি করে। ইসলাম বহু আগেই এই মানবিক সত্য শিক্ষা দিয়েছে।
বিশেষ করে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত বাস্তবধর্মী। একজন অভাবগ্রস্ত মানুষের প্রতি নমনীয় হওয়া শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি আখিরাতের বিনিয়োগও। কখনো কখনো মানুষের প্রতি একটি ছোট সহানুভূতি, একটি সময় বৃদ্ধি, কিংবা সামান্য ঋণ মাফ করে দেওয়া আল্লাহর কাছে এত মূল্যবান হয়ে ওঠে যে, তা বান্দার সমগ্র জীবনের গুনাহ মুছে দিতে পারে।
পৃথিবীতে আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী। আমরা প্রতিদিন তাঁর কাছে ক্ষমা চাই। তাই অন্যের প্রতি কঠোর হওয়ার আগে আমাদের ভাবা উচিত, আমরাও তো আল্লাহর দরবারে এক অসহায় ঋণগ্রস্ত বান্দা। মানুষের প্রতি আমাদের আচরণই হয়তো একদিন আমাদের পরিণতি নির্ধারণ করবে।
ক্ষমা মানুষকে ছোট করে না; বরং আল্লাহর কাছে মর্যাদা বৃদ্ধি করে। যে ব্যক্তি মানুষের কষ্ট বুঝে, তাকে অবকাশ দেয়, তার দুর্বলতাকে মেনে নেয়, আল্লাহও কিয়ামতের দিন তার প্রতি রহমতের দরজা খুলে দিবেন। তাই প্রতিশোধ নয়, সহমর্মিতা হোক আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি; কঠোরতা নয়, ক্ষমাশীলতা হোক আমাদের ঈমানি পরিচয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




