যে কারণে আল্লাহর বিধানই রাজনীতির চূড়ান্ত মানদণ্ড
- মানববুদ্ধি যেখানে থেমে যায়, ওহি সেখানেই পথ দেখায়

প্রতীকী ছবি
মানুষের বিবেক ও বুদ্ধি যতই উন্নত ও পরিশীলিত হোক না কেন, তা কখনোই সম্পূর্ণ নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত হতে পারে না। কারণ মানুষের বিবেক-বুদ্ধি কাজ করার একটা পরিসীমা রয়েছে। এর বাইরে মানব বিবেক কার্যকর নয়। ফলে তার প্রতিটি চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও কর্মের সঙ্গে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা জড়িত থাকে। যেমন মানুষের শারীরিক গঠন, যোগ্যতা ও সামর্থ্য একে অপরের থেকে ভিন্ন, তেমনি চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও মানুষে মানুষে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। এমনকি জ্ঞান ও দর্শনের উচ্চতম স্তরে উপনীত ব্যক্তিদের মধ্যেও মতভেদ ও মতবিরোধ লক্ষ্য করা যায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বহু দার্শনিক শেষ পর্যন্ত নিজেদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।
সীমিত জ্ঞানের মানব বিবেক রাজনীতির নীতিমালা প্রণয়নেও অপারগ। কারণ এক ব্যাক্তি যে বিষয়টাকে সংস্কার বলে মনে করে, অন্যজন সেটাকে বিশৃঙ্খলা বলে অভিহিত করে। একজন যেটাকে ন্যায়নীতি বলে মনে করে, অন্যজন সেটাকে শোষণনীতি বলে মনে করে। ইউরোপ যেটাকে শিল্প বলে ভেবেছে, এশিয়ার জন্য তা ধাংসাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সুতরাং রাজনীতির নীতিমালা প্রণয়নের অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। কারণ তিনি পুরো মানবজাতির স্রষ্টা। তিনি যে নিয়ম প্রণয়ন করবেন তাতে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ নিহিত থাকবে। তিনি যেহেতু অতীত ,বর্তমান ও ভবিষ্যতের জ্ঞান রাখেন, তাই তার প্রণীত নিয়মটাও সর্বকালের সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য বলে বিবেচিত হবে।
সর্বপ্রথম এই নীতিমালা মূসা (আ.)-এর যুগে শরীয়তের অংশ বলে অভিহিত হয়। তিনিই সর্বপ্রথম রাজনীতিক নবী ছিলেন। সে কারণেই রাজা বাদশাহদের সাথেই তার বেশির ভাগ মুকাবিলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা সুরা মায়েদায় ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তাদের জন্য তাতে বিধান দিয়েছি যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং যখমের বদলে অনুরূপ যখম। অবশ্য যে ব্যক্তি তা ক্ষমা করে দিবে এতে তারই পাপ মোচন হবে। যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার করে না, তারাই জালিম।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪৫)
ঈসা (আ.)-কেও আল্লাহ তাআলা ইঞ্জিল শরীফে অনুরূপ নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘ইঞ্জিল অনুসারীগণ যেন আল্লাহ তাতে যা নাযিল করেছেন, সে অনুসারে বিচার করে। যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে বিচার করে না, তারাই ফাসিক।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪৭)
সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কেও পূর্ববর্তী দুই নবীর মতোই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘সুতরাং তাদের মধ্যে সেই বিধান অনুসারেই বিচার করো যা আল্লাহ নাযিল করেছেন। আর তোমার নিকট যে সত্য এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪৮)
উপর্যুক্ত আয়াতসমূহে তিনটি শরীয়তের কথা উল্লেখ রয়েছে। মূসা (আ.)-এর শরীয়ত, ঈসা (আ.)-এর শরীয়ত এবং মুহাম্মদ (সা.)-এর শরীয়ত। এই তিন শরীয়তেরই একটি যৌথ বিধান হচ্ছে, প্রতিটি বিষয়েই আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের মাধ্যমে ফায়সালা হতে হবে।
আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যেহেতু সবচাইতে পরিপূর্ণ নবী, এজন্য তার রাজনীতিও সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক। সেজন্য নবীজিকে এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব প্রদানের জন্য কুরআনে মাজিদে বারবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুরা মায়েদার ৪২, ৪৯ ও ৫০ নং আয়াত এবং সুরা নিসার ১০৫ নং আয়াত বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য।
সেজন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান তালাশ করা শাসকের পক্ষে একান্ত অপরিহার্য। কারণ শাসনব্যবস্থার উদ্দেশ্য কেবল ক্ষমতা পরিচালনা নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং সমাজে কল্যাণ নিশ্চিত করা।
মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সীমাবদ্ধ হওয়ায় অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় পক্ষপাত বা প্রবৃত্তির প্রভাব সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থান পায়। ফলে জুলুম, বৈষম্য ও অন্যায় সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু আল্লাহর বিধান সর্বজ্ঞ ও সর্বকল্যাণময় সত্তার পক্ষ থেকে প্রণীত হওয়ায় তা মানবতার প্রকৃত কল্যাণ ও ন্যায়ের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আল্লাহর বিধানকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করার সর্বোত্তম উপায় ও পথ।
লেখক: শিক্ষক; মারকাযু ফয়জিল কুরআন আল ইসলামী, ঢাকা।




