সংকুচিত হচ্ছে কথা বলার অধিকার, উদ্বেগ নাহিদের

‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন নাহিদ ইসলাম।
দেশে বর্তমানে যে মুক্ত পরিবেশ রয়েছে, তা সাময়িক হতে পারে। গণতন্ত্র ও কথা বলার অধিকার ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম। তার মতে, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে মানুষের প্রতিবাদকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে বিরোধী মত দমন ও গ্রেপ্তারের পথ তৈরি করা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সাংবাদিকদের ভূমিকা, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বক্তব্য দেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়ের স্মৃতিচারণ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ওই সময় অনেকটা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মধ্যে সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়েছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সংবাদকর্মীরা চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন সফল হওয়ার পেছনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আন্দোলনের সময় সংগঠকদের সঙ্গে সংবাদকর্মীদের একটি গভীর পেশাগত ও আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল বা সাধারণ মানুষ গ্যাস, বিদ্যুতের মতো মৌলিক অধিকারের দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করলে সেটিকে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘হটকারিতা’ বা ‘বাস ভাঙচুর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে বিরোধী মত দমন ও গ্রেপ্তারের পথ তৈরি করা হচ্ছে।
মাঠের সাংবাদিকদের ভূমিকা
জুলাই আন্দোলনে সাংবাদিকদের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, অনেক সাংবাদিক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠ থেকে সংবাদ পাঠালেও তাদের নিজ নিজ গণমাধ্যমে সেসব খবর প্রকাশিত হয়নি বা প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি। আন্দোলনের একপর্যায়ে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে ওই পরিস্থিতিতেও অনেক সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে দেশপ্রেম ও মানবিকতার জায়গা থেকে কাজ করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর স্মৃতি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বললেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালানোর পর সাংবাদিকেরা আহত শিক্ষার্থীদের কাঁধে তুলে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। তার ভাষায়, এটি শুধু পেশাদারিত্বের বিষয় ছিল না; এর মধ্যে দেশপ্রেমও ছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত সাংবাদিকদের স্মরণ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ওই সময়ে অন্তত ছয়জন সাংবাদিক নিহত এবং কয়েক শ সংবাদকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। অনেক সাংবাদিকের শরীরে এখনো গুলির পিলেট রয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় আহত সাংবাদিকদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া এবং তাদের পাশে থাকার চেষ্টার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
সংস্কার বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে জনগণের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয়নি বলেও মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বললেন, নিজে সাত মাস সরকারের অংশ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে ওই সময় দেশের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। দেশকে স্থিতিশীল করতেই সরকারের বড় একটি অংশের শক্তি ও মনোযোগ ব্যয় হয়েছে।
তথ্য ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠিত হলেও এর সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন’সহ বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
নাহিদের স্পষ্ট বার্তা, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিরোধী দলের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা সুস্থ গণতন্ত্রের অন্যতম লক্ষণ।
গণমাধ্যমে হামলার নিন্দা
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও হামলারও নিন্দা জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নীতি বা আদর্শের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এ কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা বা অগ্নিসংযোগ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
আলোচনা সভার শেষ পর্যায়ে সাংবাদিকদের সহায়তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখার জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পাশাপাশি দায়িত্বশীল রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দেন নাহিদ।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত মতবিনিময় করতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়তে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।






