নাহিদ ইসলাম
শ্রমিক আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগ করছে সরকার

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন নাহিদ ইসলাম
পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলন মোকাবিলায় সরকার ভুল পথ বেছে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেছেন, শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে আলোচনায় বসার পরিবর্তে সরকার বলপ্রয়োগ করে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গাজীপুরে জাতীয় শ্রমিক শক্তির গায়েবানা জানাজায় হামলায় আহত নেতাকর্মীদের দেখতে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলাম বলেন, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন শুরুর এক সপ্তাহ পর মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। কিন্তু বোর্ড গঠনের পরও তিন দিন কোনো বৈঠক হয়নি। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর বুধবার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে শ্রমিকদের দাবির প্রতি সরকারের অবহেলার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেও আন্দোলনটিকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার জন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের দায়ী করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, শ্রমিকদের ওপর রাষ্ট্রীয় ও দলীয় পর্যায়ে সহিংসতা চালানো হচ্ছে। গত মঙ্গলবার হকিস্টিক ও স্টাম্প হাতে কিছু লোককে রাস্তায় নামানো হয়েছে। শ্রমিকদের ওপর হামলা চালাতে তাদের কে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শ্রমিক কলোনিতে অভিযান চালিয়ে শ্রমিকদের আটক করছে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের আমলে যেভাবে শ্রমিক আন্দোলন দমন করা হতো, বর্তমান সরকারও একই পদ্ধতি অনুসরণ করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গাজীপুরে পোশাকশ্রমিক তৌফিকের মৃত্যুর পর তার স্মরণে আয়োজিত গায়েবানা জানাজায় হামলার অভিযোগ তুলে নাহিদ ইসলাম বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও পুলিশ, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা চালিয়েছে। গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় জাতীয় শ্রমিক শক্তির আহ্বায়কসহ নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ১৭ জন আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
আহত ব্যক্তিদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতেই তারা হাসপাতালে এসেছেন বলে জানান তিনি।
আন্দোলনকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানোর প্রবণতার সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন আন্দোলনে জামায়াত-শিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হতো। এখন বিএনপি কোনো আন্দোলন হলেই আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার কথা বলছে। এভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
তার মতে, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট শক্তি। তারা যেকোনো পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে সেই সুযোগ তৈরির দায় সরকারকেও নিতে হবে।
গত সাত মাসে বিএনপি বিভিন্ন ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। সাভারে এনসিপির পদযাত্রার সময় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার বিচার না হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।
শ্রমিকদের প্রতি সরকারের আচরণের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এখনো সময় আছে। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিতে হবে। গঠিত মজুরি বোর্ডের ওপরও শ্রমিকদের আস্থা নেই। সরকারের আগের ভূমিকা, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের কারণে শ্রমিকদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। ফলে সরকারের আশ্বাসে আস্থা রেখে শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, একদিকে আওয়ামী লীগ সহিংসতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, অন্যদিকে বিএনপি রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তাঁদের ন্যায্য ও অহিংস আন্দোলনের প্রতি দেশের জনগণের সমর্থন রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এ সময় শ্রমিকদের পক্ষে তিন দফা দাবি তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। দাবিগুলো হলো, নিহত শ্রমিক তৌফিকের পরিবারকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা; গ্রেপ্তার শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং অন্যায়ভাবে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার; আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই, হয়রানি, মামলায় জড়ানো, গ্রেপ্তার কিংবা কালো তালিকাভুক্ত না করা।
নাহিদ ইসলাম বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো সরকারকে আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। এই আন্দোলন মালিকদের বিরুদ্ধে নয়; বরং শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা ও বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই। পোশাকশিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে এ শিল্পের শ্রমিকদেরও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
মালিক, শ্রমিক ও রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকারকে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম।




