সবুজ ঘাসের কবি লিওনেল মেসি

লিওনেল মেসি
ম্যারাডোনা ও তাঁর অনুচরেরা ট্রফি জেতার ছত্রিশ বছর পর। আর্জেন্টিনা, আবারো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। এবং একটি জাতি এখান থেকে বুয়েনস আইরেস এবং তারও বাইরে পর্যন্ত উৎসবে মেতে উঠবে। লিওনেল মেসি স্বর্গের সঙ্গে করমর্দন করেছেন।
আর্জেন্টিনা, একটি পরিবার এক স্বর্ণখনি ফিরে পেল। এক রাজার অভিষেক। তার নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। রোজারিও থেকে অমরত্ব। লিওনেল মেসি তার চূড়ান্ত শিখর জয় করেছেন। লিওনেল মেসি স্বর্গের সঙ্গে করমর্দন করেছেন। সেই আকুতি, সেই কষ্টের দুর্দিনগুলো শেষ। আর্জেন্টিনা, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, এবং একটি জাতি সারারাত ধরে মেতে উঠবে উৎসবে।
২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামের আকাশে যখন উৎসবের রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ধারাভাষ্যকার পিটার ডিউরির কণ্ঠ যেন কেবল একটি ফুটবল ম্যাচের বিবরণ দিচ্ছিল না; একটি মহাকাব্য রচনা করছিল। তিনি যেন মানব-অধ্যবসায়ের এক মহাকাব্যের শেষ স্তবক পাঠ করছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল বিস্ময়, উল্লাস, আর এক ধরনের মুক্তির অনুভব। বহু বছরের অপূর্ণতা, অসংখ্য প্রশ্ন, অগণিত তুলনা আর ব্যর্থতার ভার পেরিয়ে অবশেষে বিশ্বকাপটি এসে ধরা দিয়েছিল লিওনেল মেসির হাতে। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, শুধু আর্জেন্টিনা নয়- ফুটবল নিজেও যেন তার সবচেয়ে মূল্যবান ধন ফিরে পেয়েছে। এক রাজমুকুটহীন রাজা অবশেষে মুকুট পরেছেন; ইতিহাস তার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে।
আর সেই মুহূর্ত থেকেই মেসির গল্প আর কেবল একজন ফুটবলারের গল্প নয়; তা হয়ে উঠেছে স্বপ্নের বিরুদ্ধে সকল প্রতিকূলতার, নীরবতার বিরুদ্ধে সকল সংশয়ের, এবং মানুষের অবিচল বিশ্বাসের এক অনন্য উপাখ্যান।
ধারাভাষ্যকার পিটার ডিউরি সেদিন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচের সমাপ্তি ঘোষণা করেনি, বরং এক দীর্ঘ মানবিক অভিযাত্রার পরিণতি রচনা করেছিল। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মতো আমরাও যেন অনুভব করেছিলাম-একজন মানুষের অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার গল্প শেষ পর্যন্ত তার প্রাপ্য গন্তব্যে পৌঁছেছে।
এক ছোট্ট বালক, যে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের ধুলোবালির মাঠে বল পায়ে ছুটত। তার শরীর ছিল ক্ষীণ, ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চিত। গ্রোথ হরমোনের সমস্যায় যখন তার স্বপ্ন প্রায় থমকে যেতে বসেছিল, তখন ভাগ্যের এক দরজা খুলে যায়। স্পেনের বার্সেলোনা তাঁকে আশ্রয় দেয়। একটি কাগজের ন্যাপকিনে লেখা চুক্তির গল্প আজ ফুটবল ইতিহাসের এক কিংবদন্তি অধ্যায়।
এরপরের পথও সহজ ছিল না। প্রতিভা তাঁকে আলোয় এনেছিল, কিন্তু মহত্ত্ব তাঁকে অর্জন করতে হয়েছে পরাজয়ের ভেতর দিয়ে। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার বেদনা-প্রতিবারই মনে হয়েছিল, বুঝি স্বপ্নের শেষ প্রান্তে এসে তিনি থেমে গেলেন। একসময় জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। অথচ জীবন অনেক সময় নদীর মতো; সে বাঁক নেয়, কিন্তু থামে না।
ফুটবল সম্রাট দিয়াগো ম্যারাডোনা একদিন বলেছিলেন, ‘মেসি একজন ভালো মানুষ, আর অসাধারণ খেলোয়াড়।’ ম্যারাডোনার সেই মন্তব্যে ছিল এক প্রজন্মের আরেক প্রজন্মকে স্বীকৃতি দেওয়ার স্নেহ। অনেকেই তাঁদের তুলনা করেছেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁরা দুই ভিন্ন যুগের দুই আলোকবর্তিকা।
মেসির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা উঠলে মনে আসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম। আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথের এক প্রান্তে ছিলেন রোনালদো, অন্য প্রান্তে মেসি। কিন্তু প্রতিযোগিতার মধ্যেও ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা। ক্রিশ্চিয়ানো একাধিকবার বলেছেন, তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফুটবলকে আরও সুন্দর করেছে। এ যেন দুই নক্ষত্রের পাশাপাশি জ্বলে ওঠা-একজনের আলো অন্যজনকে ম্লান না করে, বরং আকাশকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় ছিল মেসির জীবনের এক বড় মোড়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর দেশের জার্সিতে প্রথম বড় শিরোপা। তারপর ২০২২ সালের বিশ্বকাপ। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই অবিস্মরণীয় ফাইনালে তিনি যেন নিজের সমস্ত অপূর্ণতার হিসাব চুকিয়ে দিলেন। তরুণ তারকা এমবাপে সেদিন হ্যাটট্রিক করেও আলো কেড়ে নিতে পারেননি; কারণ ইতিহাসের মঞ্চে আরেকটি বড় গল্প লেখা হচ্ছিল।
মেসির জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষকে বড় করে তার প্রতিভা নয়, তার ধৈর্য। তিনি কখনও উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না, কখনও ঝড় তোলার জন্য শব্দের আশ্রয় নেননি। তাঁর ভাষা ছিল বল, তাঁর কবিতা ছিল ড্রিবল, তাঁর আত্মজীবনী লেখা হয়েছে সবুজ ঘাসের উপর।
আজ তাঁর ৩৯তম জন্মদিনে পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো ট্রফির সংখ্যা নয়। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিনয় কখনও মহত্ত্বের পথে বাধা নয়; নীরব মানুষও পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চারিত নাম হতে পারে।
রোজারিওর সেই ক্ষীণদেহী বালকটি আজ কিংবদন্তি। তবু তাকে দেখলে মনে হয়, সে এখনও মাঠের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে, পায়ের কাছে বল, চোখে স্বপ্ন। আর পৃথিবী বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে—একজন মানুষের গল্প কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে।
আজ মেসির জন্মদিন। এবারের বিশ্বকাপ তাঁর শেষ বিশ্বকাপের মঞ্চ। এরপর মেসি দর্শক, আমরাও তাঁর পাশে বসেই হয়তো দেখবো নতুন কাউকে। কিন্তু আমাদের যেদিন গেছে, মেসির রঙে রাঙ্গানো- সেইদিন কি আর ফিরে পাবো...?
জয়তু মেসি।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী




