বিদ্যুৎ ধনীদের গরিবের অন্ধকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দফায় দফায় দাম বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। গরম যত চড়ে, লোডশেডিংও তত বাড়ে। শহরে কিছুটা সহনীয়, কিন্তু গ্রামে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে না বিদ্যুৎ। জেনারেটর কিংবা আইপিএস থাকায় সামর্থ্যবানরা কষ্টটা অনুভব করেন কম। কিন্তু যার নেই তার ভাগ্যে লেখা শুধুই বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষার প্রহর। এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ আজ আর সবার অধিকার নয়, গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত মানুষের চোখে তা শুধুই ‘ধনীদের বিলাসী পণ্য’।
বিদ্যুতের এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি শুধু আলোই কাড়েনি, কেড়ে নিয়েছে জীবনের গতি। চিকিৎসা, শিক্ষা, কারখানা, কৃষিতে সেচ, ব্যবসা-বাণিজ্য— সবক্ষেত্রেই পড়ছে এর নেতিবাচক প্রভাব। সারা বিশ্বের মতো পুরো দেশ এখন আক্রান্ত ফুটবল বিশ্বকাপ জ্বরে। কিন্তু টানা লোডশেডিংয়ে টিভিতে সেই খেলা দেখতে না পেরে ক্ষুব্ধ অনেকে।
চলতি মাসে দেশে ২৫ বছরের ইতিহাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ (১৬.৬৮ শতাংশ) দাম বাড়ানো হয়েছে। আর এ মাসেই লোডশেডিং ছাড়িয়েছে ৩ হাজার মেগাওয়াট। এরপর অবশ্য লোডশেডিং কমেছে আবার কখনো বেড়েছে। সব মিলে গড়ে লোডশেডিং আড়াই হাজার মেগাওয়াটের মতো।
লোডশেডিং নিয়ে প্রায়ই বাহাস হচ্ছে জাতীয় সংসদে। সর্বশেষ গত সোমবার মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালা তার নির্বাচনী এলাকায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে প্রকাশ করেন ক্ষোভ ও অসন্তোষ।
লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে জানিয়ে সংসদে তিনি বলেছেন, ‘এলাকায় কারেন্ট না থাকলে গভীর রাতেও সাধারণ মানুষ সংসদ সদস্যকে ফোন দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। এই সংকট দ্রুত সমাধান না করলে এলাকায় জনপ্রতিনিধিদের মানসম্মান নিয়ে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়বে।’
এর আগে গত ৭ জুন সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বললেন, দেশে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করার প্রয়োজন হচ্ছে না। ঝড়-বৃষ্টিতে গাছ পড়ে লাইন ছিঁড়ে যাওয়া কিংবা সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের ত্রুটির কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটতে পারে।
তার দাবি, চাহিদা অনুযায়ী ঘাটতি না থাকলেও গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ঝড়-বৃষ্টির কারণে মাঝেমধ্যে কিছুটা বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে এবং চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বিগত সরকার জ্বালানির সংস্থান এবং চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখেই একের পর এক অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। জ্বালানির সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ। উৎপাদন না করলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পরিশোধ করতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ। এতে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। চাহিদামতো জ্বালানি কেনাও মুশকিল হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়ানির্ভর লোডশেডিং: বর্তমানে আমদানিসহ দেশে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা গড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটের মতো। যদিও শীতকালে এই চাহিদা নেমে আসে ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে গত ২০ মে রেকর্ড ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। যদিও সেদিনও ছিল লোডশেডিং। চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও মূলত জ্বালানি সংকটের কারণেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বর্তমানে গড়ে ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
গত মাসে আবহাওয়া তুলনামূলক ঠান্ডা থাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল কম। ফলে তেমন একটা লোডশেডিং হয়নি। কিন্তু আস্তে আস্তে গরম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিংও বাড়ছে। আবার তাপমাত্রা কমলে কিছুটা স্বস্তি আসে বিদ্যুতে।
মুক্তি নেই সহসা: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, কয়লা সংকটের কারণে এস এস পাওয়ার প্লান্টের উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে, বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ। এ কারণে লোডশেডিং বেড়েছে। কেন্দ্র দুটি পুরোদমে চালু হলে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়বে। কিন্তু এরপরও লোডশেডিং থাকবে। কারণ, চাহিদামতো জ্বালানির জোগান দেওয়া যাচ্ছে না।
তার মতে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালানো গেলে লোডশেডিং প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু তাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে অস্বাভাবিক হারে।
গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে বাড়ানো যাচ্ছে না উৎপাদন। জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকেও সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করা হচ্ছে না। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আড়াই থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা হলেও দিনের অধিকাংশ সময় উৎপাদন থাকে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট। কেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। বকেয়ার পাশাপাশি তেলে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় পিডিবিও এসব কেন্দ্র সীমিত সময় চালাতে চায়।
কিছুটা ভরসার জায়গা কয়লাবিদ্যুতে। কিন্তু গত ২০ মে দেশে রেকর্ড ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কয়লা থেকে এসেছিল ৬ হাজার ৮১ মেগাওয়াট। এখন তা কমে ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে। কয়লা সংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
নিজস্ব কয়লায় পরিচালিত দেশের একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায়ও সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন খুব কম। তিনটি ইউনিটের মোট সক্ষমতা ৪৫০ মেগাওয়াট, কিন্তু কয়লা মজুদ থাকার পরও কেন্দ্রটি গড়ে মাত্র ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন-ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শাসমুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘সংকট সমাধানের অন্যতম উপায় হলো বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমানো। সেজন্য এ খাতে লুণ্ঠনমূলক ব্যয়, অপচয়, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। বাস্তবে এভাবে সংকট কাটবে না। উল্টো পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
গ্রামে ও গরিবের ভোগান্তি বেশি: বিদ্যুৎসেবায় সবার জন্য সমান অধিকার থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে গ্রামের মানুষ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিদ্যুৎঘাটতি সামাল দিতে মূলত ঢাকা এবং বড় শহরগুলোর বাইরের এলাকায় লোডশেডিং করা হয় বেশি। দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এই বৈষম্য।
গত ১৬ জুন মধ্যরাতে সরকারি হিসাবে দেশে ৩ হাজার ২৭৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা আরইবির লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। এ থেকেই বৈষম্যের চিত্র অনুমান করা যায়।
চুয়াডাঙ্গার হাড়োকান্দি গ্রামের বাসিন্দা রাশেদ আলী বলছিলেন, ‘শহরে লোডশেডিং নেই বললেই চলে। কিন্তু গ্রামে লোডশেডিং পিছু ছাড়ে না। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তারা চার্জার ফ্যান, লাইট, আইপিএস কিংবা জেনারেটর ব্যবহার করে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করছেন। কিন্তু যাদের সেই সামর্থ্য নেই তারা থাকছেন অন্ধকারে চরম দুর্ভোগে। এই শ্রেণির বড় অংশ বাস করে গ্রামে। যেখানে বিদ্যুৎ মেলে চাহিদার তুলনায় অনেক কম।’
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক শামসুল আলম বলছিলেন, ‘রাষ্ট্রের সব সুবিধা নানা ফরম্যাটে ধনীরা বেশি ভোগ করেন। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সেই বৈষম্য তৈরি হয়েছে। অথচ এই প্রান্তিক মানুষ ছাড়া ধনীরা অচল। এটা বড় ধরনের সামাজিক অবিচার।’
শামসুল আলমের ভাষায়, ‘দেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হলো, কিন্তু সমাজের বৈষম্য দূর হয়নি। জ্বালানিবৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি আমরা। কিন্তু ডানপন্থী, বামপন্থী কোনো পন্থী রাজনীতিবিদদেরই এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই। এটা খুবই দুঃখজনক।’
তিন দিনের পর্যবেক্ষণ: গত ২০ থেকে ২২ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করেন আগামীর সময়ের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা। সাতক্ষীরা প্রতিনিধি এসকে আহসানুর রহমান জানিয়েছেন, শহরে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। তবে জেলার ৭টি উপজেলা ও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরও বেশি। অনেক এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গোপালগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তথ্য জানিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক মোজাম্মেল হোসেন মুন্না।
কাশিয়ানী উপজেলার সিংগা গ্রামের কৃষক পংকজ মণ্ডল বললেন, ‘দিনভর রোদ-বৃষ্টিতে কাজ করে রাতের বেলা যখন ঘুমাতে যাব, তখনই দেখা যায় বিদ্যুৎ নেই। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকলে ঘুমাই কীভাবে?’
দিনাজপুর প্রতিনিধি ইমানুল সোহান জানালেন, গত ১৬ থেকে ১৮ জুন জেলা সদরে বিদ্যুতের চাহিদা ৬০ মেগাওয়াট হলেও মিলেছিল ৩৪ মেগাওয়াট। এতে ওই সময় দিনরাতে সদরে ৫-৬ বার বিদ্যুৎ চলে যায় এবং ৪-৫ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। বান্দরবান প্রতিনিধি মনু ইসলাম জানালেন, গত শনি ও রবিবার জেলার মোট বিদ্যুৎ চাহিদা ৯৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যায় ৬০ মেগাওয়াটেরও কম।
চাঁদপুর শহরে দিনরাতে অন্তত ৫-৬ বার লোডশেডিংয়ের তথ্য দিয়েছেন প্রতিনিধি শরীফুল ইসলাম। তবে হাইমচর, মতলব উত্তর, ফরিদগঞ্জ ও কচুয়ার বাসিন্দারা এলাকাভেদে দিনে গড়ে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকার কথা জানিয়েছেন।




