শিক্ষা বাজেট
বরাদ্দ বৃদ্ধি কি মানসম্মত শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবারের শিক্ষা বাজেটকে। দীর্ঘদিন পর শিক্ষা খাতে এই উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের ক্ষেত্রে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহারই নির্ধারণ করবে এই বাজেট দেশের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থায় কতখানি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে।
প্রস্তাবিত বাজেটের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের অর্থাৎ জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ১.৩৯ শতাংশ ছিল। ফলে এক বছরে শিক্ষা বাজেট প্রায় ৫৬.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অতিরিক্ত বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ ১.৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.০ শতাংশ হওয়ায় এটি ০.৬১ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাত অন্যতম বৃহৎ অংশ দখল করেছে।
একই সাথে সরকার আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ঘোষণা করেছে। শিক্ষা ব্যয়ের জিডিপি অনুপাত বিগত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষা ব্যয় ছিল জিডিপির ১.৭৬ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১.৬৯ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১.৫৩ শতাংশে, যদিও কিছু হিসাব অনুযায়ী তা ১.৩৯ শতাংশ ছিল। কয়েক বছর ধরে এই নিম্নমুখী প্রবণতার পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বরাদ্দ জিডিপির ২.০ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় শিক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন ঘটেছে। পরিমাণগত দিক থেকে বিচার করলে এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী বৃদ্ধি।
এই বরাদ্দ বৃদ্ধির বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষা ব্যয় মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা ছাড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি কিংবা স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। বর্তমান বাজেটে সরকার দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। এর ফলে কারিগরি শিক্ষা, স্টেম বা বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-প্রকৌশল-গণিত শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যকার সংযোগ জোরদার হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা তহবিলের চরম স্বল্পতায় ভুগছে। বাজেট বৃদ্ধির ফলে গবেষণাগারের আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, গবেষণা অনুদান এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধির পথ সুগম হতে পারে। নারী শিক্ষার প্রসারেও এই বাজেট অবদান রাখবে, কারণ সরকার মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা দিয়েছে। এটি নারীশিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থানে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়।
শিক্ষা খাতে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ, তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বাংলাদেশ এখনও বেশ পিছিয়ে রয়েছে। ইউনেস্কো সাধারণত শিক্ষা খাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বিনিয়োগের সুপারিশ করে থাকে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের ২ শতাংশ বরাদ্দ এখনও আন্তর্জাতিক মানের নিচে।
অতীতে দেখা গেছে, শিক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ সময়মতো বাস্তবায়িত হয়নি কিংবা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। ফলে বরাদ্দের পরিমাণের পাশাপাশি এর দক্ষ ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ২০২৬-২৭ সালের শিক্ষা বাজেট পরিমাণগত দিক থেকে যুগান্তকারী হলেও, মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণায় এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বরাদ্দের সঠিক বাস্তবায়নের ওপর।
এই বিশাল বাজেট সফলভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা। বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দক্ষ জনবলের অভাব একটি পুরনো সমস্যা। শিক্ষা খাতেও একই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান এবং বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে বরাদ্দ বৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে যখন তা কার্যকরভাবে ব্যয় করা সম্ভব হবে। আরেকটি বড় সংকট হলো গবেষণা খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অনুদান অত্যন্ত সীমিত, যা আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ। শিক্ষা বাজেটের বড় অংশ এখনও অবকাঠামো নির্মাণ ও বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়ে যায়, ফলে গবেষণায় বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কমই থাকে।
শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার গুণগত মান ও শেখার ফলাফল নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী মৌলিক ভাষা ও গণিত দক্ষতায় প্রত্যাশিত মান অর্জন করতে পারছে না। কেবল অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই হবে না, শিক্ষার ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়নও এখন সময়ের দাবি। একই সাথে মানসম্মত শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হলো দক্ষ শিক্ষক। দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। ডিজিটাল শিক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক শিক্ষণ এবং গবেষণা তত্ত্বাবধানে শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
বাজেটের সুফল বণ্টনের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ, চরাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকার শিক্ষার্থীরা এখনও অবকাঠামো, মানসম্মত শিক্ষক এবং প্রযুক্তিগত সুবিধার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে গবেষণার মান নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, সাইটেশন, পেটেন্ট এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
এই পরিস্থিতি উত্তরণে এবং বাজেটের সর্বোত্তম ব্যবহারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, শিক্ষা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ কেবল গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য আলাদা করে সংরক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান চালু করা প্রয়োজন যাতে যোগ্য প্রজেক্টগুলো অর্থায়ন পায়। তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়াতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষা খাতে ডিজিটাল মনিটরিং ও কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার। পঞ্চমত, শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে এবং ষষ্ঠত, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শেখার ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত শিক্ষা বাজেট বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত হওয়া এবং ৫৬ শতাংশের বেশি বরাদ্দ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সাহসী উদ্যোগ। কয়েক বছরের নিম্নমুখী প্রবণতা কাটিয়ে শিক্ষা খাতে এই বরাদ্দ বৃদ্ধি নতুন আশার বার্তা দিচ্ছে। তবে কেবল অর্থ বরাদ্দই মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুশাসন, দক্ষ বাস্তবায়ন ক্ষমতা, গবেষণাকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ফলাফলভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এই বাজেট বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে, অন্যথায় এটি কেবল একটি কাগুজে সাফল্য হিসেবেই রয়ে যাবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ
[email protected]




