নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে সমন্বিত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি

প্রতীকী ছবি
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমের পাতা খুললেই দেখা যায় নতুন কোনো শিশুর আর্তনাদ, কোনো নারীর জীবনাবসান কিংবা একটি পুরো পরিবার ধ্বংসের খবর।
এই পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র নয়, বরং সমাজের গভীর নৈতিক অবক্ষয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতারও প্রতিফলন। নতুন সরকারের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় বিব্রতকর পরিস্থিতি এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং এক বাস্তবতা।
ধর্ষণ শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি মানবতা, সভ্যতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিরুদ্ধে এক বর্বরোচিত আঘাত। বিশেষত উন্নয়নশীল ও তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে আইনের দুর্বল প্রয়োগ, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক নীরবতার কারণে এই অপরাধ থামানো যাচ্ছে না, বাংলাদেশও সেই সংকট থেকে মুক্ত নয়। এই ভয়াবহ সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ স্পষ্টভাবে কাজ করছে, যা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে প্রথমত, সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে, যা নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দিচ্ছে। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার এই নেতিবাচক প্রবণতা অপরাধীদের মনে এক ধরনের অভয়ছত্র তৈরি করছে।
দ্বিতীয়ত, দ্রুত ও কার্যকর শাস্তির বড় অভাব রয়েছে, যার কারণে অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও বিচারপ্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকে।
তৃতীয়ত, মাদক ও পর্নোগ্রাফির ব্যাপক বিস্তার যুবসমাজকে বিকৃত মানসিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং যৌন সহিংসতাকে উসকে দিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
চতুর্থত, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, যার ফলে মানুষের স্বাভাবিক বিবেকবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ লোপ পাচ্ছে।
পঞ্চমত, প্রযুক্তির অপব্যবহার এই সংকটকে আরও গভীর করছে, যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নারীদের ব্ল্যাকমেইল ও ফাঁদে ফেলার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় অপরাধীদের সবচেয়ে বড় খুঁটির জোর হিসেবে কাজ করছে, যার ফলে প্রভাবশালী মহলের চাপে অনেক সময় মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সপ্তমত, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার একটি কুৎসিত সামাজিক প্রবণতা বিদ্যমান, যা অপরাধীর বিচার না চেয়ে উল্টো ভুক্তভোগীর আচরণ বা চলাফেরা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
অষ্টমত, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার অভাব রয়েছে, ফলে জটিল প্রক্রিয়া ও খরচের কারণে অনেকেই আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারে না।
নবমত, চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে মানুষ মুখ খুলতে ভয় পায় এবং মামলা করলে অপরাধীদের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় আইনি দুর্বলতা বা প্রভাবশালীদের চাপে সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে মামলা ভেঙে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের মনে আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয় এবং অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে।
এই সংকট মোকাবিলায় শুধু ক্ষণস্থায়ী আবেগ দিয়ে কাজ হবে না, বরং প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কর্মপরিকল্পনা।
এই বর্বরতা বন্ধে প্রথমত, দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে, যেন শাস্তি দৃশ্যমান ও কার্যকর হয়।
দ্বিতীয়ত, পুলিশি তদন্তে জবাবদিহি বাড়াতে হবে, কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুধু দুর্বল তদন্তের কারণে আদালতে টিকে থাকতে পারে না; এজন্য আধুনিক ফরেনসিক সুবিধা, প্রশিক্ষিত তদন্ত কর্মকর্তা এবং ডিজিটাল প্রমাণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।
তৃতীয়ত, শিক্ষা ও নৈতিকতা গড়ে তুলতে হবে, শুধু আইন দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়; পরিবার, বিদ্যালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে মানবিকতা, নারীর প্রতি সম্মান ও সামাজিক দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে।
চতুর্থত, অনলাইন অপরাধ ও অশ্লীল কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, যার জন্য সাইবার জগতে বিকৃত মানসিকতা ছড়ানো কনটেন্ট প্রতিরোধে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন এবং শিশুদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে পরিবারকে ভূমিকা রাখতে হবে।
পঞ্চমত, নারীবান্ধব সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেন ভুক্তভোগী লজ্জা বা ভয় না পেয়ে সহজে আইনি সহায়তা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবা লাভ করতে পারে।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে; এটি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিক্ষক, আলেম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সম্মিলিতভাবে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো সেখানে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত। যদি কোনো মা তার সন্তানকে নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে না পারেন, কিংবা কোনো শিশু ঘরের বাইরে যেতে ভয় পায়, তবে দৃশ্যমান উন্নয়ন, মেগাপ্রকল্প বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাফল্য অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
অতএব, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে রাষ্ট্রকে এখনই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং নৈতিক শিক্ষার ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ। মানবিকতা হারালে সভ্যতা টিকে থাকে না, তাই নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ






