বহমান লোকঐতিহ্যে আত্মঘাতী বাঁধ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সমাজে এমন কিছু গোষ্ঠী রয়েছে যারা সংস্কৃতিকে ধর্মের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। অথচ বাস্তবতা হলো, বাংলার সংস্কৃতি বহুমাত্রিক এবং সহনশীলতার ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে। এ সংস্কৃতির ভেতরে ধর্মীয় মূল্যবোধ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে লোকজ ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য ও সামাজিক উৎসবের সমন্বয়। নৌকাবাইচ, পহেলা বৈশাখ, গ্রামীণ মেলা, পালাগান কিংবা জারি-সারি— এসবই বাংলার মানুষের জীবনযাপনের অংশ। এগুলোকে একের পর এক নিষিদ্ধ করার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত সমাজকে অসহিষ্ণু ও সাংস্কৃতিকভাবে দরিদ্র করে তুলবে। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে যারা আপত্তি তুলছেন, তারা মূলত বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। এটি শুধু একটি খেলার বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং বাংলার ইতিহাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং মানুষের আনন্দচর্চার বিরুদ্ধে এক ধরনের সংকীর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
হাজার বছরের প্রাচীন লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ নৌকাবাইচ। মুসলিম শাসনামলে নৌবাহিনীর মহড়া ও নদীমাতৃক বাংলার ভাটি অঞ্চলে রাজ্য রক্ষা ও যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে এর প্রচলন ও বিস্তৃতি ঘটে বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। ওই আমল থেকেই নৌবাহিনীর শক্তি প্রদর্শন ও মহড়া থেকে এর জনপ্রিয়তা শুরু। এটি নদীমাতৃক এ দেশে কালে কালে বাঙালির নিজস্ব লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এটি ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অনুপম ও অবিতর্কিত ক্রীড়াশৈলী হিসেবে সাধারণত বর্ষাকালে নদীপ্রধান এলাকায় উৎসব হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এই জনপ্রিয় সর্বজনীন খেলাটিকে বিতর্কিত করে তোলা ও বন্ধ করার হীনচেষ্টা নিন্দনীয়। এটা আবহমান অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত।
এ কাজে ‘তৌহিদী জনতা’র নাম সামনে এসেছে। অামরা জানি না এরা কারা। এদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও ভিত্তি কী, নেতৃত্ব, সাংগঠনিক ভিত্তি, গঠনতন্ত্র, প্রধান ও আঞ্চলিক কার্যালয় সম্পর্কে জানা যায় না। এরা সংগঠন হিসেবে সরকারি নিবন্ধিত কি না, সেটাও স্পষ্ট নয়। গত অন্তর্বর্তী সরকার আমলে এদের তৎপরতা জাতির সামনে বেশি অাসে। কোনো কল্যাণকর বা রাজনীতি-সংস্কৃতির মূলধারায় এদের অবদানও নেই। শুধু উসকানিমূলক ও মব সৃষ্টি করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে সমালোচিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারও তাদের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তবে বর্তমান রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের এহেন কর্মকাণ্ড অপ্রত্যাশিত ও গ্রহণযোগ্য নয়।
এ কথা সত্য যে, যখনই উগ্রবাদ ও ধর্মান্ধতা সংস্কৃতির ওপর আঘাত হেনেছে, তখনই সমাজে বিভাজন ও পশ্চাৎপদতা বেড়েছে। সংস্কৃতি মানুষের সৃজনশীলতা ও মানবিকতার বিকাশ ঘটায়। আর উগ্র সংকীর্ণতা মানুষকে বৈচিত্র্যের প্রতি অসহিষ্ণু করে তোলে। তাই নৌকাবাইচবিরোধী অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে হস্তক্ষেপের উদ্বেগজনক প্রবণতা।
বিস্ময়কর হলো, যারা নৌকাবাইচ বন্ধ করতে চান, তারা এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও উপেক্ষা করছেন। নৌকাবাইচ আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হয় এবং গ্রামের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও আনন্দের পরিবেশ গড়ে ওঠে। তরুণ প্রজন্ম নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীনতা দিয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব— সংবিধানসম্মত সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষা করা। নৌকাবাইচবিরোধী উগ্র অবস্থানের নিন্দা জানানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সাংস্কৃতিক চেতনার পক্ষে দৃঢ় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান। যারা ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার পতাকা ওড়াতে চান, তাদের মনে রাখা উচিত— সংস্কৃতিকে দমন করে কখনো কোনো সমাজকে এগিয়ে নেওয়া যায় না। নদীর মতোই সংস্কৃতির স্রোতও অবিরাম; তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা আত্মঘাতী।






