আগামীর চোখ
ইসির ডিজিটাল বৈরাগ্য

বরাবর
প্রধান নির্বাচন কমিশনার
জনাব, সালাম নেবেন। পত্রের শুরুতেই আপনাদের এই ডিজিটাল আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনাকে কোটি কোটি কুর্নিশ! যুগ যুগ ধরে ভোটাররা ভাবতাম, নির্বাচন মানেই হলো রঙ-বেরঙের পোস্টার, ঢোল পেটানো উৎসবের হাওয়া। নির্বাচনী গাছে পত্র-পল্লবের মতো পোস্টারের নড়াচড়ায় যে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো, আপনারা তা উড়িয়ে দিচ্ছেন। আসলেই তো! ভোট কোনো উৎসব হতে যাবে কেন? ভোট হবে একটা গম্ভীর, ছিমছাম করপোরেট শোকসভার মতো! প্রার্থীরা কাগজের বুকে ঝুলবেন না, বরং নির্দিষ্ট সাইজের উলম্ব বা আনুভূমিক বিলবোর্ডে জ্যামিতিক মাপ মেনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকবেন। নির্বাচনকে এমন করপোরেট বানানোর ফর্মুলা বেশ হাইপার। অনলাইন মনোনয়ন বাতিল করে কাগজের ফাইলের আদিম যুগে ফেরত যাওয়া, আবার কাগজের পোস্টার নিষিদ্ধ করে বিলবোর্ড ঝোলানো— ডিজিটাল আর অ্যানালগের এ খিচুড়ি মার্কা বৈরাগ্য সত্যিই এক বিরল শিল্পকর্ম!
সবচেয়ে রসালো লেগেছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়ার আইডিয়াটা। এতকাল অরাজনৈতিক ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এটা একটা জবরদস্ত প্রতিবন্ধকতা ছিল। আপনারা সেই বাধা দূর করে যে মহানুভবতা দেখালেন, তার জন্য ধন্যবাদ। তবে আমরা তো হুজুগে বাঙালি! এবার নির্বাচনী মৌসুমে ‘ইচ্ছে হলো আর দাঁড়িয়ে গেলাম’ টাইপের হুজুগে প্রার্থীর ঢল নামবে না তো? অবশ্য বিগত নির্বাচনগুলোর ইতিহাস দেখলে বোঝাই যায়, এই ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের আসলে কোনো কানাকড়ি মূল্যও ছিল না। যে প্রার্থীরা নমিনেশন টিকিয়ে রাখতে ১ শতাংশ ভোটারের জাল বা আসল স্বাক্ষর জমা দিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই মূল ভোটের দিন ১ শতাংশ তো দূরের কথা, তার চেয়েও কম ভোট পেয়ে রাজকীয়ভাবে জামানত হারিয়েছেন! আপনারা এতদিনে ধরে ফেলেছেন।
আইনি অস্পষ্টতার ধোঁয়াশা তা তো আরও রোমাঞ্চকর! আইনে ‘দল সমর্থিত প্রার্থী’ বলে কিছু নেই, তফসিল ঘোষণার আগে কে কীভাবে প্রচার চালাবে, তারও কোনো ঠিকঠিকানা নেই। এতে নির্বাচনের থ্রিল অনেক বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপেই যদি সব সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে আর নির্বাচন কমিশনের বাহাদুরি রইল কোথায়? আর জামানত বৃদ্ধির যে মাস্টারস্ট্রোকে দেশের গরিব মানুষ খুশিতে কাঁদছে। ওই যে হুজুগে প্রার্থীর পকেট কাটার জন্য জামানত বৃদ্ধির ফাঁদটি একেবারে জেনুইন হয়েছে! বাজারে চাল-ডালের দাম বাড়ছে, সেখানে ভোটের জামানত কেন সস্তা থাকবে? ভোট তো এখন কোটিপতিদের খেলা, সেখানে সাধারণ বা নতুন প্রার্থীরা এসে আপনাদের দাপ্তরিক খাটুনি বাড়াবে কেন? জামানত যত চড়া হবে, হুজুগে প্রার্থীর সংখ্যা তত কমবে আর আপনাদের ঘুমও তত ভালো হবে।
পরিশেষে বলি, ভোট যদি পান্তা ভাতের মতো
পানসে হয়, হোক না! উৎসবের কী দরকার?
বিনীত
একজন সাধারণ ভোটার






