ডাবল ইঞ্জিনের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি
বর্ষার আগের ভারী গুমোটে ঢাকা শহর সেদিন অদ্ভুত নিস্তব্ধ ছিল। সন্ধ্যার পর টেলিভিশনের পর্দায় একের পর এক ভেসে উঠছিল খবর— পশ্চিমবঙ্গে ইতিহাস বদলে গেছে। বহু বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙে বিজেপি গড়ে তুলেছে সরকার। দিল্লিতে আগেই ছিল তাদের ক্ষমতা, এবার কলকাতাও চলে গেল একই রাজনৈতিক ছাতার নিচে। ভারত জুড়ে শুরু হলো ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের নতুন অধ্যায়। কিন্তু সীমান্তের এপারে বাংলাদেশে সেই খবর অনেকের মনে তৈরি করল অন্যরকম অস্বস্তি।
কারণ, পশ্চিমবঙ্গ শুধু ভারতের একটি রাজ্য নয়; এটি বাংলাদেশের সঙ্গে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও দীর্ঘ সীমান্তে জড়িয়ে থাকা এক সংবেদনশীল ভূখণ্ড। আর সেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সীমান্ত, মুসলিম জনগোষ্ঠী, অভিবাসন ও দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের প্রশ্ন।
বিজেপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে হিন্দুত্ববাদ। সমালোচকদের মতে, এই রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য মুসলিমবিদ্বেষ ও ইসলামভীতি। এতদিন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলমান ও বাংলাদেশ ইস্যুতে তুলনামূলক নরম অবস্থান নিয়েছিলেন। বিজেপি বরাবরই সেই অবস্থানকে ‘মুসলমান তোষণনীতি’ বলে আক্রমণ করেছে। নির্বাচনী প্রচারে তারা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রশ্নকে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রচারে পশ্চিমবঙ্গের একাংশ ভোটারের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বিজেপির সেই প্রচার, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা স্থানীয়দের চাকরি ও সম্পদ দখল করছে’— রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
তবে উদ্বেগের জায়গা আরও গভীর হয়েছে বিজেপির জয়ের পরের ঘটনাপ্রবাহে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মক্তব ডটকম তাদের ১০ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, নাগরিক অধিকার সংগঠন এপিসিআর অন্তত ৩৪টি সহিংস ঘটনার তথ্য পেয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ছিল মসজিদে হামলা, ভাঙচুর এবং মুসলমান মালিকানাধীন স্থাপনায় আক্রমণের অভিযোগ।
এদিকে সীমান্ত ঘিরেও বাড়ছে উৎকণ্ঠা। ২০১৪ সালে ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বহু মুসলমানকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠেছে। এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ২ হাজার ৪৭৯ জনকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গেই। ফলে সেখানে বিজেপি সরকারের ক্ষমতায় আসাকে ঢাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ উদ্যোগ ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মুসলমান, মতুয়া ও দলিত ভোটার রয়েছেন। অনেকের নাগরিকত্ব এখন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) কার্যকর হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
এর মধ্যেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে আসে আরেকটি ঘোষণা— বাংলাদেশ সীমান্তে দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ। বিএসএফকে ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ঢাকায় এই ঘোষণাকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়নি।
বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, ‘বাংলাদেশ আর আগের অবস্থায় নেই। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশকে ভয় দেখানো যাবে না।’ তবে তার ভাষ্যেও ছিল অপেক্ষার সুর— নির্বাচনী বক্তব্য আর বাস্তব শাসন এক নয়; শেষ পর্যন্ত নতুন সরকার কী করে, সেটাই দেখার বিষয়।
উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক বক্তব্য। তিনি একাধিকবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ‘বৈধ প্রধানমন্ত্রী’ বলে উল্লেখ করেছেন। এমনকি নির্বাচনের আগে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরবেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পেছনে পাকিস্তানের প্রভাব রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। সমালোচকদের মতে, এসব মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে আরও স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে।
তবে সবকিছুর পরও অনেক বিশ্লেষক মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভারতের ফেডারেল কাঠামোয় শেষ কথা বলে দিল্লিই। পশ্চিমবঙ্গ সরকার চাইলেও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বাইরে গিয়ে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ সীমিত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষক এম আশিক রহমানও তাই এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নারাজ। তার ভাষায়, ‘নির্বাচনী বক্তব্য আর বাস্তব শাসনের মধ্যে পার্থক্য আছে। আগে দেখতে হবে সরকার বাস্তবে কী পদক্ষেপ নেয়।’
কিন্তু সীমান্তের দুই পাশে এখনো প্রশ্নটা বাতাসে ভাসছে— পশ্চিমবঙ্গে এই নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় কি শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন, নাকি তার ঢেউ বাংলাদেশেও এসে আঘাত করবে?




