নতুন জীবনের সূচনা হোক উৎসমুখ থেকেই

ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ। গ্রাফিকস আগামীর সময়
বিশ্ব জলবায়ু কূটনীতির জমকালো মঞ্চগুলোতে বাংলাদেশ সবসময়ই সাহসী এক নাম। ব্রাসেলস, জেনেভা কিংবা দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে আমাদের প্রতিনিধিরা কার্বন মার্কেট, গ্রিন ট্রানজিশন কিংবা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল নিয়ে চমৎকার ও প্রভাবশালী তাত্ত্বিক বয়ান দিতে সদাই প্রস্তুত। কিন্তু যখন দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় চোখ ফেরানো যায়, তখন এক নিদারুণ বৈপরীত্য আমাদের থমকে দেয়।
বাংলাদেশের জলবায়ু কৌশলের বড় বড় তত্ত্ব ও নীতি এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের যাপিত জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। আমরা মেঘের মানচিত্র এঁকেছি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির নিখুঁত হিসাব কষেছি; কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে মৌলিক ফ্রন্টিয়ার— নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধিকে (ওয়াশ) সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে নিশ্চিত করতে পারিনি।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের নীতিনির্ধারকরা ওয়াশকে স্রেফ পাইপলাইন বসানো, নলকূপ পোঁতা কিংবা পৌরসভার হিসাব-নিকাশের মতো একটি গৌণ ও কারিগরি বিষয় হিসেবে দেখে আসছেন। অন্যদিকে জলবায়ু অভিযোজনকে দেওয়া হয়েছে এক উচ্চমার্গীয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের রূপ, যা কেবল উপকূলীয় বিশাল বাঁধ আর কোটি কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের মধ্যেই ঘুরপাক খায়। সবচেয়ে বড় সত্য হলো, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো বিমূর্ত বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে না; এটি সরাসরি আঘাত হানে পানির মাধ্যমে। এটি উপকূলের মাটির নিচের নোনাপানি কিংবা চরাঞ্চলের এক ফোঁটা সুপেয় পানির তীব্র তৃষ্ণা হয়ে মানুষের সামনে দাঁড়ায়।
নীতিমালার এই খণ্ডিত রূপের খেসারত কোনো আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতায় পরিশোধ হয় না; এর মূল্য দিতে হয় মানুষের মানবিক মর্যাদা দিয়ে। উপকূল কিংবা চরাঞ্চলে যখন কোনো জলবায়ু বিপর্যয় আঘাত হানে, তখন এর সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতটি বইতে হয় মূলত নারীদের। এই সংকট লুকিয়ে আছে সেই মায়ের প্রতিদিনের যন্ত্রণায়, যাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়— তিনি চড়া দামে এক কলস মিষ্টি পানি কিনবেন, নাকি সন্তানের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেবেন। এই ট্র্যাজেডি গ্রাস করে সেই কিশোরীর ভবিষ্যৎকে, যে স্রেফ ঋতুস্রাবকালীন স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে স্কুল থেকে ছিটকে পড়ে। পরিবেশ যখন বৈরী হয়, সমাজ তখন সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিকে স্থায়ী বাস্তুচ্যুতির দিকে ঠেলে দেয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের জলবায়ু কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় টপ ডাউন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে রয়েছে ‘জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা’ (NAP), যা সুদূরপ্রসারী কৌশল নির্ধারণের পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এক বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে। এই কৌশলগত দিকনির্দেশনাই সরাসরি গাইড করে ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস’কে (NDC 3.0), যা এই উচ্চ পর্যায়ের জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট তৈরি করে।
ন্যাপ ও এনডিসি ৩.০-কে কেবল আন্তর্জাতিক পরিবেশগত চুক্তি রক্ষার খেরোখাতা হিসেবে দেখলে চলবে না। জলবায়ুর নামে বরাদ্দ হওয়া প্রতিটি ডলার খরচের আগে পানি সুরক্ষার চশমা দিয়ে তা যাচাই করতে হবে। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়লে উপকূলের মানুষ কীভাবে অভিযোজন করবে, যদি তার সুপেয় পানির উৎস স্থায়ীভাবে নোনাপানিতে তলিয়ে যায়? লাখ লাখ জলবায়ু উদ্বাস্তু যখন শহরের বস্তিতে এসে আশ্রয় নেবে, তখন প্রতি মৌসুমি বন্যায় যদি স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তবে নগর কীভাবে টিকবে?
উত্তরটি হলো— কখনোই পারবে না। প্রকৃত সক্ষমতা কোনো উপকূলীয় বাঁধের প্রান্তে শেষ হয় না; বরং তা শুরু হয় প্রতিটি সাধারণ ঘরের পানির কল আর সম্প্রদায়ের ল্যাট্রিন থেকে। এই বাস্তবতাকে নীতিমালায় রূপ দিতে আমাদের পরিকল্পনা কাঠামোয় কয়েকটি আমূল পরিবর্তন আনতে হবে:
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক দেয়াল ভেঙে ফেলতে হবে। NAP ও NDC 3.0-এর অধীনে সংগৃহীত তহবিল সরাসরি একটি সমন্বিত, জলবায়ু-সহনশীল পানি অবকাঠামো তহবিলে প্রবাহিত করতে হবে, যাতে অভিযোজনের অর্থ সরাসরি গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলের পানি সুরক্ষাকে শক্তিশালী করে। অকেজো ও পুরনো প্রযুক্তির পেছনে অর্থ অপচয় বন্ধ করে স্থানীয়ভাবে উপযোগী আধুনিক উদ্ভাবনে জোর দিতে হবে। সৌরশক্তিচালিত ক্ষুদ্র লবণাক্ততাকরণ প্ল্যান্ট, কমিউনিটি পরিচালিত স্যান্ড ফিল্টার এবং গভীর রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং নেটওয়ার্কের সুশৃঙ্খল সম্প্রসারণ, যা পানিচক্রের যেকোনো চরম বিপর্যয় মোকাবিলা করতে পারে।
জলবায়ু অভিযোজনের ধারণাকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি স্কুলের পরিচালন বাজেটে ছাত্রছাত্রীদের জন্য পৃথক, জলবায়ু-সহনশীল ও স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ সুবিধা রক্ষণাবেক্ষণের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে, যেন পরিবেশগত কোনো বিপর্যয় কিশোরী মেয়েদের শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।
জলবায়ু বিপর্যয়ের চরম মুহূর্তেও যারা আমাদের শহরের জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা নেটওয়ার্ক সচল রাখেন, সেই অনানুষ্ঠানিক স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে হবে। তাদের পেশাগত স্বাস্থ্যবীমা নিশ্চিত করে জলবায়ু সংগ্রামের প্রথম সারির যোদ্ধা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া আজ সময়ের দাবি।
বর্তমান সরকার যখন দেশের জাতীয় অগ্রাধিকারগুলো নতুন করে নির্ধারণ করছে এবং আগামী দিনের আর্থিক নির্দেশিকাগুলো তৈরি করছে, তখন আমরা এক ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি। একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’— যা হবে গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক— তার ন্যায্যতা কেবল সামষ্টিক অর্থনীতির বিমূর্ত তত্ত্ব বা জিডিপির প্রবৃদ্ধির উদযাপনে প্রমাণিত হতে পারে না। এর প্রতিফলন ঘটে সেই কাঠামোগত নিশ্চয়তায়, যেখানে প্রত্যন্ত চরের একটি শিশু কিংবা শহরের বস্তির একজন দিনমজুর কোনোরকম বিঘ্ন ছাড়া নিরাপদ পানি পায় এবং ন্যূনতম শারীরিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা লাভ করে।
প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে কীভাবে টিকে থাকতে হয়, বাংলাদেশ তা বিশ্বকে দেখিয়েছে। এখন আমাদের বিশ্বকে দেখাতে হবে কীভাবে সেই টিকে থাকার লড়াইকে সমতা, ন্যায্যতা এবং মানবিকতা দিয়ে শাসন করতে হয়। আসুন, এমন এক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করি, যেখানে মানুষের মর্যাদা এবং পানির নিরাপত্তাকে পরম ও অলঙ্ঘনীয় মানবাধিকার হিসেবে গণ্য করা হবে। আমাদের দেশের মানুষ অনেক অপেক্ষা করেছে; এবার সংস্কারের সূচনা হোক সেখান থেকেই, যেখান থেকে জীবনের সূচনা— একেবারে উৎসমুখ থেকে।
লেখক: আইন গবেষক ও উন্নয়নকর্মী




