ট্রাম্পের পরেই পুতিনের চীন সফর কেন এত তাৎপর্যপূর্ণ

ঠিক চার দিন আগেই বেইজিং ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার রেশ কাটতে না কাটতেই দুদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে পা রাখলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিশ্ব রাজনীতির এই জটিল সন্ধিক্ষণে পুতিনের এই চীন সফর অত্যন্ত অর্থবহ। যদিও বলা হচ্ছে, ২০০১ সালের চীন-রাশিয়া মৈত্রী চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উদযাপনই এই সফরের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এই উপরি উদ্দেশ্যের মতো সরল নয় বৈশ্বিক পরিস্থিতি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পরপরই পুতিনের এই সফর আসলে বিশ্বকে এক জোরালো বার্তা দিচ্ছে। মস্কো ও বেইজিং দেখাতে চাইছে, বিশ্ব রাজনীতির যেকোনো সমীকরণে তাদের পারস্পরিক কৌশলগত জোট কতটা অটুট।
২০০১ সালের ওই ঐতিহাসিক চুক্তি দুই দেশকে একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তকে সম্মান জানানোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। কোনো সামরিক জোট ছাড়াই তারা একে অপরের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। আজ ২৫ বছর পর শি জিনপিং ও পুতিন সেই ধারাবাহিকতাই বজায় রাখতে চান। বৈঠক থেকে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি বিনিময়ের মতো একাধিক চুক্তি সই হতে পারে। ২০২৬-২৭ সালকে ‘চীন-রাশিয়া শিক্ষাবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। অর্থনীতি ও বাণিজ্য নিয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গেও পুতিনের বৈঠক হওয়ার কথা। তবে ২০২২ সালের সেই বিখ্যাত ‘সীমাহীন বন্ধুত্ব’ ঘোষণার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই সম্পর্কে বেশ কিছু সূক্ষ্ম বদল এসেছে।
ট্রাম্পের বিদায়ের পরপরই পুতিনের আগমন এই সফরের গুরুত্ব বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বিশ্বের দুই প্রধান প্রতিপক্ষ নেতার আতিথেয়তা করল বেইজিং। এটি কূটনীতিতে চীন ও শি জিনপিংয়ের এক বিরাট সাফল্য। শি জিনপিং আসলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাইছেন। একদিকে তিনি বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে চান; অন্যদিকে রাশিয়াকে আশ্বস্ত করতে চান যে মস্কোই বেইজিংয়ের সবচেয়ে বড় সঙ্গী। নিশ্চয়ই ট্রাম্পের সঙ্গে জিনপিংয়ের মধ্যকার কথাবার্তা বুঝতে চাইবেন পুতিন। বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কাঁচামাল সরবরাহ এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চীনের অবস্থান ট্রাম্পের কারণে বদলে যাচ্ছে কি না, সেটাই পুতিনের মূল জিজ্ঞাসা।
ওয়াশিংটন চাইলেই চীনকে রাশিয়া থেকে আলাদা করতে পারবে না। পশ্চিমা বিশ্বের বাইরেও যে বিকল্প এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে, এই সফর তারই ইঙ্গিত
অর্থনৈতিক দিক থেকে রাশিয়ার জন্য চীন এখন বড় ভরসা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে দুই দেশের বাণিজ্য এখন ২৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। রাশিয়া সস্তায় তেল-গ্যাস দিচ্ছে চীনকে। আর চীন তার বদলে রাশিয়াকে দিচ্ছে যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও ইলেকট্রনিকস। তবে এই বাণিজ্যে রাশিয়ার নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। রাশিয়ার অর্থনীতি এখন চীনের ওপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ভয়ে অনেক সময় চীনের ব্যাংকগুলো রাশিয়ার সঙ্গে লেনদেনে সতর্ক থাকছে। তাই ডলারের আধিপত্য কমাতে দুই দেশ এখন নিজস্ব মুদ্রা বা ‘ইউয়ান’-এ লেনদেন বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
সামরিক ও কৌশলগত ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে। যৌথ সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান— সবই চলছে। ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রাশিয়ার কাছ থেকে শিখছে চীন, আর চীন দিচ্ছে তার বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা। ব্রিকস (BRICS) বা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) মতো প্ল্যাটফর্মে তারা একসঙ্গে আমেরিকার একাধিপত্যের বিরোধিতা করছে। তবে এত কিছুর পরও চীন কিন্তু সরাসরি রাশিয়াকে যুদ্ধে কোনো মারণাস্ত্র দিচ্ছে না। চীন নিজের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চায় না। আমেরিকা অন্য যুদ্ধে ব্যস্ত থাকলে চীনের লাভ, তবে বিশ্ব জুড়ে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি হোক— তা বেইজিং চায় না।
পুতিনের জন্য এই সফর এক প্রকার রাজনৈতিক অক্সিজেন। জিনপিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে পুতিন বিশ্বকে দেখাতে চান যে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে কাবু করা যায়নি। দেশের মাটিতেও পুতিন নিজের ক্ষমতাশালী ভাবমূর্তি বজায় রাখতে পারছেন। তবে এই সম্পর্কের রাশ এখন কিন্তু বেইজিংয়ের হাতে। চীন এখানে বড় ভাই আর রাশিয়া যেন কিছুটা স্নেহপ্রার্থী। পর্দার আড়ালে এক ধরনের চাপা প্রতিযোগিতাও রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে বা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এই সম্পর্কে ফাটলও ধরতে পারে।
চীনের দিক থেকে দেখলে রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব তাদের একধরনের বাড়তি শক্তি দেয়। রাশিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকলে আমেরিকার পুরো নজর চীনের ওপর পড়ে না। তা ছাড়া তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে রাশিয়া সবসময় চীনের পাশে থাকে। আমেরিকার সঙ্গে দরকষাকষির বাজারে রাশিয়াকে পাশে রাখা বেইজিংয়ের জন্য একটা বড় তাস।
বিশ্ব রাজনীতির নিরিখে এই সফর এটাই প্রমাণ করে যে দুনিয়াটা এখন আর একমুখী নেই। ওয়াশিংটন চাইলেই চীনকে রাশিয়ার থেকে আলাদা করতে পারবে না। পশ্চিমা বিশ্বের বাইরেও যে বিকল্প এক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে, এই সফর তারই ইঙ্গিত।
পুতিনের এই চীন সফর কোনো জাদুকরি রাতারাতি পরিবর্তন আনবে না, আবার এটি কেবলই লোকদেখানো কোনো আনুষ্ঠানিকতাও নয়। এটি আসলে বর্তমান অস্থির সময়ে আমেরিকাকে বুঝে নেওয়ার দুই দেশের স্বার্থে এক বাস্তবসম্মত হিসাবনিকাশ। নতুন চুক্তি বা হাসিমুখে ছবি তোলার মধ্য দিয়ে তারা আসলে বিশ্বকে নিজেদের একতার বার্তা দিল। ওয়াশিংটন বা পশ্চিমাদের চাপের মুখে এই অক্ষ আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
হিন্দুস্তান টাইমস থেকে অনূদিত।
লেখক: ইউরেশিয়াবিষয়ক
অ্যাসোসিয়েট ফেলো, বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন, নয়াদিল্লি




