বাঙালি মুসলমানের নজরুল সাধনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ঠিক পরের বছর ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে নজরুলকে নিয়ে এলেন। পরম মমতায় দিলেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। মুখে বললেন ‘জাতীয় কবি’। উদ্দেশ্য? নজরুলকে ‘আমাদের’ করা।
এরপর এলেন জিয়াউর রহমান। তিনি কাজটা পাকা করলেন। ১৯৭৬ সালে দিলেন নাগরিকত্ব আর একুশে পদক। কবি মারা গেলেন। জিয়াউর রহমান দ্রুততার সঙ্গে তাকে দাফন করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে। কবি চিরতরে বাংলাদেশের হয়ে গেলেন।
দুই নেতার এই কৌশল ছিল দারুণ। এক ঢিলে দুই পাখি। আবেগও হলো, আবার আইনি জটিলতার সুযোগও থাকল না। ভারত আর দাবি করতে পারবে না— নজরুল আমাদের! একজন করলেন আবেগে, অন্যজন কর্তব্যে। এমন ‘নজরুলপ্রেমের’ মিল ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
কিন্তু রাজনীতি বড় বালাই! এখানে মৃত কবিরাও শান্তিতে ঘুমাতে পারেন না। তাদেরও নামতে হয় ক্ষমতার কুরুক্ষেত্রে। ক্ষমতা বদলায়, বদলায় কবির পরিচয়ও। আমাদের প্রিয় দুই নেতা তো কবিকে রেখে গেলেন। কিন্তু এরপর আমরা কী দেখলাম? আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার আর বর্তমান বিএনপি সরকারের কাণ্ডকারখানা দেখলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।
আওয়ামী লীগ সরকার ভাবল, নজরুলের নামে কিছু একটা করা দরকার। ২০২৪ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি ঘোষণা দিল— ধানমন্ডি লেকে রবীন্দ্র সরোবরের পাশে হবে ‘নজরুল সরোবর’। ৬০ কাঠা অবৈধ জমিও উদ্ধার করা হলো। নকশাও তৈরি। রবীন্দ্রনাথের পাশে নজরুলকে বসিয়ে একটা ‘ভারসাম্য’ বানানোর চেষ্টা। উদ্যোগটা ভালোই ছিল। তবে আওয়ামী লীগ যেখানে ‘মুজিব বর্ষের’ টাকা মারতে ছাড়েনি, সেখানে নজরুলের প্রকল্পের টাকা কার পকেটে যেত, তা আর না-ই বলি!
নজরুল বেঁচে থাকতে এক হাত দিয়ে লিখেছেন শ্যামাসংগীত, অন্য হাতে ইসলামিক গজল। তিনি কোনো খোপে বন্দি হতে চাননি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার প্রতিটি খোপ তাকে নিজের মতো করে সাইজ করতে চায়
কিন্তু বিধি বাম! জুলাই মাসে হলো গণঅভ্যুত্থান। ক্ষমতার তখত উল্টে গেল। এলো অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকার এসেই গন্ধ শুকল। ‘সরোবর’ শব্দটায় নাকি ‘বিগত’ আর ‘হিন্দুয়ানি’ গন্ধ আছে! আমলারা নড়েচড়ে বসলেন। সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী আর নজরুল ইনস্টিটিউটের লতিফুল ইসলাম শিবলী বসলেন তিন মন্ত্রণালয়ের তিন উপদেষ্টার সঙ্গে। এক টেবিলে এত উপদেষ্টা! কঠিন ব্যাপার।
সিদ্ধান্ত হলো, ‘নজরুল সরোবর’ বাতিল। নতুন নাম হবে ‘বিদ্রোহী চত্বর’ বা ‘Rebel Square’। কী যুক্তি? ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের গরম আর নজরুলের বিদ্রোহ নাকি এক! শিবলী সাহেব ফেসবুকে আবেগে গদগদ হয়ে লিখলেন— ‘ব্রিটিশ থেকে ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদ, কেউ আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না।’
খুবই সুন্দর কথা! নজরুলকে এবার লেক থেকে তুলে এনে চত্বরে দাঁড় করানো হলো। কবি বনে গেলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী পোস্টার বয়!
এর মধ্যেই জুলাই আন্দোলনের পর ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ বানিয়ে আলোড়ন তুললেন তরুণ নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদি। কট্টর ভারতবিরোধী আর ইসলামপন্থী। ঢাকা-৮ আসনে ভোটের প্রচারের সময় আততায়ীর গুলিতে মারা গেলেন তিনি। সমালোচকরা বলতেন, তার স্লোগানে নারীবিদ্বেষ আর উগ্রতা ছিল। মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গেও তার দা-কুমড়া সম্পর্ক ছিল; কিন্তু মরার পর সব হিসাব বদলে গেল।
ক্ষমতার অলিন্দ থেকে এক চতুর ফরমান জারি করা হলো। সব বিতর্ক ধামাচাপা দিয়ে ভূরাজনীতির নতুন তাস হিসেবে হাদিকে শুইয়ে দেওয়া হলো খোদ নজরুল ইসলামের কবরের পাশে! কবির গাঘেঁষে স্থান পেলেন এক কট্টরপন্থী তরুণ। নজরুলের প্রতি ভালোবাসায় নয়, এটা করা হলো ক্ষমতার মেরূকরণে। সারা জীবন সাম্যের গান গাওয়া নজরুলের পাশে এমন একজনকে দেওয়া হলো, যার উগ্রতা নিয়ে সমাজে ফাটল ছিল। ক্ষমতা শুধু জীবিত মানুষকে খাটায় না, লাশের ‘স্ট্যাটাস’ও ঠিক করে দেয়!
কিন্তু ক্ষমতার চাকা তো ঘোরে। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিল। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এলো বিএনপি। এখন আবার দৃশ্যপট আলাদা। সেই ‘বিদ্রোহী চত্বর’ এখন আমলাদের ফাইলের নিচে চাপা পড়েছে। বর্তমান সরকার পুরো প্রকল্প পর্যালোচনার টেবিলে পাঠিয়েছে। চত্বর আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে খোদ শিবলী সাহেবও সংশয়ে। তিনি বলছেন, ‘আমলাতান্ত্রিক জটিলতা’। আসল কথা হলো, নতুন ক্ষমতার নতুন এজেন্ডা থাকে। পুরনো চত্বরের দ্রোহের মাপ এখন বদলে গেছে।
এদিকে আবার নতুন ধুমধাম। ২৫ মে, ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে ‘নজরুল বর্ষ’। চলবে ২০২৭ পর্যন্ত। প্রধানমন্ত্রী ত্রিশালে গিয়ে এ ঘোষণা দিয়েছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এখন কোমর বেঁধে নেমেছে। বাজেট কত? মাত্র ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা! কিন্তু মন্ত্রণালয়ের প্ল্যান দেখলে চোখ কপালে উঠবে। আমাজন আর নেটফ্লিক্সে দেখানো হবে নজরুলের ডকুমেন্টারি! বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশকে ব্র্যান্ডিং করা হবে ‘ল্যান্ড অব নজরুল’ হিসেবে। যেমন যুক্তরাজ্য ‘ল্যান্ড অব শেক্সপিয়ার’। ভাবা যায়? তুরস্কে কবিকে চালানো হবে কামাল পাশার দোস্ত হিসেবে। বিশ্ব জুড়ে গবেষক এনে হবে আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ডিজিটাল মাধ্যমে হবে ‘নজরুল ট্যালেন্ট হান্ট’। বিটিভিতে অনুষ্ঠান তো আছেই। রমজানে হবে হামদ-নাত, আর ডিসেম্বরে দেশাত্মবোধক গান। নজরুলকে একাধারে বিশ্বনাগরিক, বিদ্রোহী, আবার খাঁটি ধর্মীয় কবি বানানোর এক খিচুড়ি পরিকল্পনা চলছে।
দার্শনিক চোখে দেখলে এটি এক চরম কৌতুক। নজরুল বেঁচে থাকতে এক হাত দিয়ে লিখেছেন শ্যামাসংগীত, অন্য হাতে ইসলামিক গজল। তিনি কোনো খোপে বন্দি হতে চাননি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতার প্রতিটি খোপ তাকে নিজের মতো করে সাইজ করতে চায়।
ক্ষমতা বদলায়, সংস্কৃতির রঙ বদলায়, কবির সাইনবোর্ড বদলায়। নজরুল সর্বংসহা। তিনি অতীতেও ব্যবহৃত হয়েছেন, বর্তমানেও হচ্ছেন, ভবিষ্যতেও হবেন। কবি হয়তো ওপর থেকে সব দেখছেন আর হাসছেন। তবে এ হাসি দ্রোহের নয়।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক




