শিক্ষায় হযবরল’র শেষ কবে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলায় হযবরল সাধারণত বিশৃঙ্খলা ও এলোমেলো অবস্থা বলতে বোঝায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, গোড়া থেকেই আমাদের শিক্ষার অবস্থা নানা বিশৃঙ্খলায় গড়ে উঠেছে। উনিশ শতকে ব্রিটিশদের কিছু শিক্ষা পরিকল্পনা ছিল, পাশাপাশি জমিদার এবং দানশীল ব্যক্তিরা কিছু স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা গড়ে তুলেছিলেন। পাকিস্তানকালে আমাদের এখানে প্রাথমিক শিক্ষায় ছিল না সরকারের কোনো নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা যারা পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে লেখাপড়ার হাতেখড়ি নিই, তাদের বাড়ির কাচারিতে লজিং থাকা কোনো মাদ্রাসা শিক্ষার্থী অথবা এলাকার স্বল্পশিক্ষিত কারও কাছেই পড়তে হতো। প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল একেবারেই হাতেগোনা, তাও আবার বেসরকারি— সরকার শিক্ষকদের তিন মাস পরপর কিছু গ্রান্ট ইন এইড ভাতা দিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম ৩৮ হাজারের মতো প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ হয়। ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারীকরণ হয়। এখন দেশে মোট ৬৪ হাজার ১৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কেজি স্কুল, নানা নামের মাদ্রাসা, মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় অপরিকল্পিতভাবে দেশে বেড়ে উঠেছে। শহরে আজকের তরুণ-যুবকরা ঘর থেকে বের হলেই কোনো না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডের সঙ্গে পরিচিত হয়। গ্রামেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব খুব একটা নেই। আমাদের ষাটের দশকেও নামিদামি কোনো হাই স্কুলের সাক্ষাৎ পেতে কয়েক থানা পার হয়ে যেতে হতো। কলেজ গোটা জেলায় এক-দুটোর বেশি খুব কমই দেখা যেত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এতটাই পাল্টে গেছে যে কেজি স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যাডেট কলেজ, মাদ্রাসা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান বাড়ি বাড়ি থেকে ছাত্র ডেকে নিচ্ছে; নানা প্রলোভন আর আশ্বাস দিচ্ছে। এসব কীসের ইঙ্গিত বহন করছে? এই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় যে দেশে গত কয়েক দশকে নানা বাহারি নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। কারা এসবের অনুমোদন দিচ্ছেন, কী পড়াচ্ছেন, কারা পড়াচ্ছেন— এসবের কোনো তোয়াক্কা খুব একটা করা হচ্ছে না। যদিও গণশিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বেশ কিছু অধিদপ্তর, শিক্ষা বোর্ড ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড দেশে রয়েছে; এদেরই দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুমোদনসহ দেখভাল করার কথা। কিন্তু অনেক ধরনের সাইনবোর্ডধারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশের শহরসহ যত্রতত্র গড়ে উঠেই চলছে। যাদের ওপর অনুমোদন দানকারী কর্তৃপক্ষের নজরদারি আদৌ আছে কি না, বলা মুশকিল।
বলা হয়ে থাকে, দেশে এখন কমপক্ষে ১৩ ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোতে পাঠদানের যোগ্য শিক্ষকের খোঁজখবর কেউ রাখেন না। অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই কাম্য সংখ্যক শিক্ষার্থী নেই। আবার কোনো কোনোটিতে পর্যাপ্ত শিক্ষকও নেই। দেশে কোন ধরনের কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে— এমন কোনো জরিপ আছে বলে মনে হয় না। ফলে কোথাও কোথাও পাশাপাশি তিন-চার ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেখা যায়, যেগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। সে কারণে বড় বড় শহরেই নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে সবাই ছুটছে। অথচ অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার বেহাল দশা সবার কাছেই জানা বিষয়। গ্রামাঞ্চলেও এখন ‘ভালো’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক অভাব। কিন্তু প্রায় প্রতিটি গ্রামেই স্কুল ও কয়েক ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে। ফলে কলেজও এখন গ্রামেগঞ্জে সংখ্যায় আর কম নয়। কিন্তু লেখাপড়ায় নেই কোনো প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি। শহরে দেশি-বিদেশি ইংরেজি শিক্ষাক্রম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি চলছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এগুলোতে পড়তে হচ্ছে। আছে শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায় ৯০০টি সরকারি-বেসরকারি কলেজে স্নাতক সম্মান ও মাস্টার্স নানা বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া বেশিরভাগ জেলাতেই এখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে। এর বাইরে আলিয়া, কওমি, নুরানি, ইবতেদায়ি ইত্যাদি মাদ্রাসার সঠিক সংখ্যাও অনেকের কাছে এখন খুব একটা জানা নেই।
দেশে ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও সেগুলোতে মানসম্মত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো শিক্ষকের অভাব সবাই জানেন। এ সময়ে নানা ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নামে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেগুলোরও তদারকি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিরাট অংশ এসএসসি কিংবা সমমানের পরীক্ষার গণ্ডি মানসম্মতভাবে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায়ও বিরাট সংখ্যক শিক্ষার্থীর স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা এখন বহুধারায় বিভক্ত হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সনদ অনেক ক্ষেত্রেই কর্মজীবনে খুব একটা সহায়ক হয়ে উঠছে না।
আমাদের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করলেও এদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোর জন্য যে ধরনের শিক্ষাক্রম পঠন-পাঠন, জ্ঞানার্জন, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সৃষ্টি একান্ত প্রত্যাশিত ছিল— সেটি যদি আমরা ঘটাতে সক্ষম হতাম, তাহলে এতদিনে আমরা পৃথিবীর অন্যতম শিক্ষিত জাতি হিসেবে পরিচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের দেশে বিশৃঙ্খলভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা গড়ে ওঠার কারণে আমরা বাস্তবেই গর্ব করার মতো কোনো মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পারিনি। অথচ আমাদের তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কোথাও কম নেই; বরং অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রয়েছে। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা, নীতিহীনতা, মানসম্মত পাঠদানের অভাব, শিক্ষাক্রম অনুসরণ না করা এবং দক্ষ জনগোষ্ঠীতে শিক্ষার্থীদের পরিণত না করতে পারার কারণে আমাদের সমগ্র শিক্ষাব্যস্থাটাই চলছে বাণিজ্যিক নানা অভিযোগ ও বাস্তবতার মধ্যে। শ্রেণিপাঠ এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চলে গেছে কোচিং সেন্টার আর শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনের টেবিলে। সেটিকে টেনে ধরার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। গাইড বই এখন স্থলাভিষিক্ত হয়েছে পাঠ্যবইয়ের। নানা পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএর দৌড়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকছেন। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা, জীবন গঠন, দক্ষতা অর্জন এবং আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান ও চিন্তার সম্মিলন ঘটানোর শিক্ষায়তনিক ব্যবস্থাই তলিয়ে গেছে গোটা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে। এখানে যতদিন আমরা শিক্ষাবিজ্ঞানের আধুনিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা সৃষ্টির কর্মযজ্ঞে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় পরিচালিত না করব, ততদিন আমাদের হযবরল অবস্থার রেলপথ অনিয়ন্ত্রিতই থেকে যাবে।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক





