উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে স্থবির
- পাঁচ বছরে বাস্তবায়ন ৩১ শতাংশ
- সাত ধাক্কায়ও গতিহীন
- ব্যয় বেড়েছে ৫৪.২৯, সময় ১৬০ শতাংশ
- বর্ধিত মেয়াদেও বাস্তবায়নে শঙ্কা

ছবি: আগামীর সময়
সাত কারণে গতি হারিয়েছে দেশের প্রাচীন নদীবন্দর চিলমারী উন্নয়ন কার্যক্রম। প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির এখনো বাস্তব ৩১ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৫৪ দশমিক ২৯ এবং মেয়াদ ১৬০ শতাংশ। এসব কারণে বর্ধিত মেয়াদের মধ্যেও কাজ হওয়া নিয়ে শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন্দরটির ঐতিহ্য ফেরানো গেলে আবারও মুখরিত হতে পারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বর্তমানে বর্ষা মৌসুমে ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে কৃষিপণ্য, কয়লা, পাথরসহ নানা ধরনের পণ্য আমদানি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। এ প্রেক্ষাপটে, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাকে উন্নত, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর করতে প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রকল্পটি যেসব ধাক্কা খেয়েছে সেগুলো হলো— প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন, ভূমির মূল্য ও পূর্তকাজের রেট শিডিউল পরিবর্তন, প্রথম সংশোধিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) অনুমোদনে ১৮ মাস ৬ দিন সময় অতিবাহিত হওয়া, ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, অধিগ্রহণ করা জমি থেকে অবৈধ দখলদার ও স্থাপনা উচ্ছেদে দেরি এবং ব্রহ্মপুত্র নদের মরফোলজিক্যাল পরিবর্তনের কারণে রাজিবপুর, রৌমারী ও নয়ারহাট এলাকায় কার্যক্রম শুরু করতে না পারা।
প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্যা আগামীর সময়কে বললেন, ‘রাজনৈতিক সরকার না থাকায় উচ্ছেদ করা যায়নি। এখন সবাইকে চেক দেওয়া হচ্ছে। আগামী সপ্তাহেই ৪৪ জনকে চেক দেওয়া হবে। ফলে জমির সংকট কেটে যাচ্ছে। এ ছাড়া ৮০ ভাগের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আশা করছি আগামী দেড় বছরে প্রকল্পটি শেষ করা যাবে।’
সূত্র জানায়, চিলমারী বন্দর বাংলাদেশের প্রাচীন নদীবন্দরগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি কুড়িগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে অবস্থিত। একসময় স্থানীয় পর্যায়ের কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রি এবং যাত্রী ও মালপত্র পরিবহনের এটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাট ছিল। সে অবস্থা ফিরিয়ে আনতে ‘চিলমারী এলাকায় (রমনা, জোড়গাছ, রাজিবপুর, রৌমারী ও নয়ারহাট) নদীবন্দর নির্মাণ’ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। এটির উদ্দেশ্য হলো, রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার নৌপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো। এ ছাড়া আধুনিক বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ এবং নৌবাণিজ্য ও প্রটোকল রুটের মাধ্যমে ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা সম্প্রসারণে একটি অন্যতম নৌবন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ২৩৫ কোটি টাকা। সেখান থেকে ১০০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বাড়িয়ে ব্যয় করা হয়েছে ৩৪৫ কোটি ২ লাখ টাকা। এদিকে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরে চার দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেগুলো হলো— চ্যানেল ও বেসিনে ড্রেজিং, তীররক্ষা, স্টিল জেটি নির্মাণ, রমনা ফেরিঘাট তৈরি, রৌমারী ফেরিঘাট নির্মাণ, আরসিসি জেটি এবং অ্যাক্সেস ব্রিজ নির্মাণ, পন্টুন বসানো ও বন্দর ভবন তৈরি। আরও রয়েছে টার্মিনাল ভবন ও পরিদর্শন বাংলো তৈরি, স্টাফ এবং অফিসার ডরমিটরি, যাত্রী বিশ্রামাগার, টয়লেট কমপ্লেক্স তৈরি, ভূমি উন্নয়ন এবং ভূমি অধিগ্রহণ করা।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ করেছে প্রকল্পটির।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় বারবার মেয়াদ বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব, ঠিকাদারকে যথাসময়ে সাইট হস্তান্তর করতে না পারা এবং ডিপিপি সংশোধনে বেশি সময় ব্যয় হওয়া প্রকল্পের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, কৃষি, মৎস্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি পণ্য ওঠানামার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বন্দর ও নৌ-চ্যানেলে পলি জমে ভরাট হওয়া, ব্রহ্মপুত্র নদের মরফোলজিক্যাল পরিবর্তন, স্থানীয় জনগণের অসহযোগিতা এবং সময় বৃদ্ধির কারণে বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।






