লোডশেডিং থেকে সহসাই মিলছে না মুক্তি
- রেকর্ড ঘাটতিতে উদ্বিগ্ন আরইবি, সামালের চেষ্টায় সরকার

সংগৃহীত ছবি
তীব্র গরমে ওষ্ঠাগত প্রাণ। চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ। এরই মধ্যে স্মরণকালের ভয়াবহ বিদ্যুৎসংকট। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৪৩১ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে রবিবার মধ্যরাতে। এরপর কমলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি হয়নি স্বাভাবিক। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে। এমনকি বিদ্যুৎ না পেয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির স্থানীয় কার্যালয়ে। চলমান এ সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে খোদ পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)। যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে কিছু উৎপাদন বেড়েছে। তবে পুরোপুরি লোডশেডিংমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত দেখছে না বিদ্যুৎ বিভাগ।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকলেও মূলত জ্বালানি এবং অর্থসংকটের কারণে কয়েক বছর ধরেই গ্রীষ্মে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করার কারণে লোডশেডিং হচ্ছে। এর সঙ্গে এবার বিশ্বকাপ খেলা দেখার কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। এতে করে লোডশেডিংও বাড়ছে। তবে তাপমাত্রা কিছুটা কম হওয়া এবং সরকারের নানা উদ্যোগে উৎপাদন সামান্য বৃদ্ধির কারণে গতকাল সোমবার লোডশেডিং কম ছিল। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে বাড়বে লোডশেডিংও।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে আগামী তিন থেকে চার দিন রাতের তাপমাত্রা বাড়বে। এরপর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ আগামীর সময়কে বললেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে নানা চেষ্টা করছে। কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি মেরামত শেষে উৎপাদন শুরু হয়েছে। অন্য কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কিছুটা বৃদ্ধির কারণে আগের চেয়ে লোডশেডিং কমেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হচ্ছে, যাতে কোথাও কোনো ধরনের সমন্বয়হীনতা না থাকে। আশা করছি, পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।’
উদ্বিগ্ন আরইবি, বিপাকে পল্লীবিদ্যুতের কর্মীরা: বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে মূলত ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং করা হয় সবসময়। এবার ঢাকায়ও লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রামে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। অনেকেই দেখতে পারছেন না ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা। বিদ্যুৎ না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিভিন্ন এলাকায় আরইবির আওতাধীন পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের ওপর ঘটেছে হামলার ঘটনা। এতে করে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন পল্লীবিদ্যুতের কর্মীরা। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। অস্বাভাবিক লোডশেডিংয়ের কারণে উদ্বিগ্ন আরইবিও।
বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে গত রবিবার বিদ্যুৎ সচিবকে চিঠি দিয়েছেন আরইবির সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. শহিদুল ইসলাম। যাতে বলা হয়, ‘তীব্র গরম, বিশ্বকাপ ফুটবল ইত্যাদি কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোনো কোনো এলাকায় ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। আগামী ২ জুলাই থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে। মারাত্মকভাবে বিঘ্ন ঘটছে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার।’
গত ২৭ জুন বিদ্যুৎ সরবরাহের চিত্র তুলে ধরে আরইবি জানায়, ওইদিন রাত ৮টায় দেশ জুড়ে তাদের গ্রাহকদের বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১০ হাজার ৩৫১ মেগাওয়াট। বিপরীতে ৭ হাজার ৭৫৯ মেগাওয়াট সরবরাহের কারণে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট।
এলাকাভেদে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, স্থানীয় লোকজন ও গ্রাহক বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রে হামলা, দায়িত্বরত কর্মীদের মারধর, অফিস ঘেরাও, ভাঙচুরসহ নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে।
চাঁদপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনাসহ ১০ জেলায় এমন হামলার ঘটনার চিত্র তুলে ধরে ‘অপ্রীতিকর ঘটনা’ থেকে পরিত্রাণ পেতে বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয় ওই চিঠিতে।
বর্তমানে দেশে প্রায় পাঁচ কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে আরইবির গ্রাহক রয়েছেন ৩ কোটি ৮০ লাখের ওপরে।
চিন্তিত সরকার, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ বকেয়া ও ঋণের দায় চেপেছে বর্তমান সরকারের ওপর। ফলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সরকারি-বেসরকারি কোম্পানিগুলোর বিল পাওনা প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পাবে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বকেয়া আদায়ে বেসরকারি কেন্দ্রের মালিকরা চাপ দিচ্ছেন। জ্বালানি কেনার অর্থ নেই, এমন দাবি করে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না তারা। আবার এত বিপুল বকেয়া পরিশোধেরও সামর্থ্য এ মুহূর্তে সরকারের নেই। অন্যদিকে লোডশেডিং দিলে জনরোষ বাড়বে। বিদ্যুতের এই সংকট চিন্তায় ফেলেছে সংশ্লিষ্টদের। গরম আরও বাড়লে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আওতার বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকায়ও লোডশেডিং করার চিন্তা করছে সরকার। ঢাকায় লোডশেডিংয়ের আগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিতে চায় বিদ্যুৎ বিভাগ।
পাশাপাশি বাসাবাড়ি ও অন্যান্য কিছু খাতে গ্যাস কমিয়ে বিদ্যুতে সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কিছু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বৃদ্ধির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ালে আবার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন পিডিবি।
কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকির চাপ কমাতে জুনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে পিডিবির আয় বাড়বে এবং নতুন করে আর বকেয়া বাড়বে না। তবে পুরনো বকেয়া শোধ করতে আরও সময় লাগবে। আর তেলচালিত কেন্দ্র না চালালে ভর্তুকির ওপর চাপ কমে আসবে।
উৎপাদন পরিস্থিতি: দেশে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে গড়ে ১৪ থেকে সাড়ে ১৪ হাজারের মতো। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সক্ষমতা আছে ২৯ হাজার ৫৯৩ মেগাওয়াট। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় গতকাল দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৫৬ মেগাওয়াট। চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটেরও বেশি লোডশেডিং হয়েছে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৬ হাজার ৯২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা আছে দেশে। কিন্তু বর্তমানে সর্বোচ্চ উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের মতো।
এর মধ্যে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানিই সরবরাহ করছে ১ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। কয়েক দিন ধরেই আদানি তাদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বাংলাদেশে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদানির পুরনো বকেয়া পরিশোধের গতি বাড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বেড়েছে। বকেয়া পরিশোধে সন্তোষ প্রকাশ করে চাহিদা অনুযায়ী সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আদানি।
এদিকে কক্সবাজারে এসএস পাওয়ারের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ ছিল কয়লার অভাবে। মূলত পিডিবির কাছে তাদের বকেয়ার কারণেই কয়লা আমদানি ব্যাহত হয়। কিছু পাওনা পরিশোধের পর বর্তমানে দুটি ইউনিট থেকে ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা জানালেন, আপাতত কয়লা নিয়ে সংকট নেই। তবে পিডিবির কাছে বকেয়া না পেলে আবার সংকট শুরু হতে পারে।
অন্যদিকে পটুয়াখালী ১৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বর্তমানে সরবরাহ করা হচ্ছে ১ হাজার ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কেন্দ্রটি থেকে আরও প্রায় দেড়শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন কর্মকর্তা।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আছে ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট। কিন্তু গত রবিবার সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ৫ হাজার ৪৩৯ মেগাওয়াট। গতকাল কিছুটা বেড়ে তা ছাড়িয়েছে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট।
অন্যান্য বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাস বরাদ্দ ছিল ১২০ কোটি ঘনফুট থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট। এখন সেখানে দেওয়া হচ্ছে ৯১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে জানালেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে। এটিকে বাড়িয়ে ১০০ কোটি ঘনফুট করা হবে। সেক্ষেত্রে বাসাবাড়ি ও অন্যান্য কিছু খাতে সরবরাহ কমবে।
দেশে সরকারি-বেসরকারি খাতে ৪৩টি ছোট-বড় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। এর মধ্যে অন্তত ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদনের মতো কোনো তেল মজুদ নেই। বাকি বেশিরভাগ কেন্দ্রে তেল মজুদ আছে ১০ থেকে ১৫ দিনের। এর বাইরে পিডিবির ১০টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে শুধু শান্তাহার কেন্দ্র ৮ থেকে ৯ দিন চালু রাখার মতো তেল আছে। বাকিগুলোয় সর্বোচ্চ এক সপ্তাহের তেল রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকলেও এখন উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট। এই উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে সরকার।
কিছুটা আশার কথা শোনালেন পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম। তিনি বললেন, গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। রবিবার উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছিল সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। রামপালের দুটি ইউনিটের মধ্যে বন্ধ থাকা ইউনিটটি আজকালের মধ্যে আসবে উৎপাদনে। তাতে আরও অন্তত ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাড়বে। সব মিলিয়ে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।






