সেমিনারে বক্তারা
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আসলে শুভঙ্করের ফাঁকি

সিআইপিজি আয়োজিত সেমিনার। ছবি : আগামীর সময়
সামাজিক নিরাপত্তার নামে দেশে এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশিষ্ট নাগরিকেরা। আজ রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সেমিনারে এ কথা বলেছেন বক্তারা।
বক্তারা বলেছেন, এই খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেখানো হলেও তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনে। আর সাধারণ মানুষকে যে ৫০০ বা ১০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে, তা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিই খেয়ে ফেলছে।
ফলে শুধু সংখ্যার অঙ্কে নাগরিকদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেট জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
‘বাংলাদেশ বাজেট ২০২৬-২৭: মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির কার্যকারিতা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (সিআইপিজি)।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু আহমেদ দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, আমাদের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে রয়েছে। যেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো বেশ কষ্টকর। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কিছুটা সময় দেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে তার ভাষ্য, কোনো ব্যাংকের এমডি বা চেয়ারম্যান কে হচ্ছেন সেটি বড় কথা নয়, বরং ব্যাংকটি কেমন চলছে তা সরকারের দেখা উচিত।
উদাহরণ হিসেবে প্রফেসর আহমেদ বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক বসে গেলে সরকারেরই অনেক বড় ক্ষতি হবে।
প্রফেসর আবু আহমেদ আরও বলেছেন, একদিকে মানুষের কর দেওয়ার ক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে চাহিদা বাড়ছে। যার ফলে অনেক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
তিনি সরকারের আকার ছোট করার পরামর্শ দিয়ে জানান, এতে রাষ্ট্রের খরচ কমবে। জনগণের টাকায় করপোরেশনগুলোকে ভর্তুকি দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি এগুলো বন্ধ অথবা বিক্রি করে দেওয়ার তাগিদ দেন।
একই সঙ্গে বিদেশি ঋণ ও সুদের বোঝা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ঘাটতি বাজেট আরও ঋণ বাড়াবে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। তার মতে, সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে সুদের হার কমাতে হবে, যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বিকশিত হতে পারে।
‘সামাজিক নিরাপত্তার নামে শুভঙ্করের ফাঁকি বন্ধ করে অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে বেসরকারি খাতকে উজ্জীবিত করতে হবে’, নিজের পরামর্শ তুলে ধরেন প্রফেসর আবু আহমেদ।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে অংশ নিয়ে এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সামাজিক নিরাপত্তার সামান্য ভাতার আর কোনো কার্যকারিতা বা মূল্য থাকছে না। এটি শুধু কাগজের অঙ্ক ছাড়া কিছু নয় এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সঙ্গে এক ধরনের জালিয়াতি করছে।
সরকারের কার্ডের ব্যবসাকে আরেকটি প্রতারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই আড়াই হাজার টাকায় মানুষের কী হবে? এর চেয়ে বরং চিকিৎসা খাতের উন্নয়ন করা উচিত। যাতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খরচ কমে আসে।
বাজেট বড় করে মানুষের ঘাড়ে করের বোঝা চাপানো হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এ সময় জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলছিলেন, বিরোধী দল সংসদে বাজেট নিয়ে কোনো কথা না বলে এসি বা ওয়াশিং মেশিনের দাবি তুলছে, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। জনগণ কী তাদের এই কাজের জন্য সংসদে পাঠিয়েছে, এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শফিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. একেএম ওয়ারেসুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সাবেক সচিব ড. আবুল হোসেনও আলোচনায় অংশ নেন।




