দুর্নীতির প্রতিকার
অভিযোগের ঠিকানা জানেন না অর্ধেকের বেশি মানুষ, সইছে নীরবেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘর থেকে বের হলেই পদে পদে অনিয়ম। টেবিলে টেবিলে টাকা না দিলে আটকে থাকে ফাইল, পাওয়া যায় না বিনামূল্যের নাগরিক সেবা। সাধারণ মানুষ নিত্যই পিষ্ট হচ্ছেন দুর্নীতি নামের অদৃশ্য জাঁতাকলে। অথচ এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোথায় দাঁড়াতে হবে, সরকারের কোন দপ্তরে বা কার কাছে তুলে ধরতে হবে মনের ক্ষোভ— তা জানেন না দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ। ফলে নীরবেই সয়ে যাচ্ছেন সব অন্যায়-অবিচার।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশ করেছে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’, যাতে উঠে এসেছে ভয়ানক এক চিত্র।
ওই জরিপের তথ্য বলছে, দেশের ৫৩ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হলে তার প্রতিকার পাওয়ার কোনো ব্যবস্থার কথাই জানে না। অর্থাৎ, প্রতি দুই পরিবারের একটিরও বেশি পরিবার রয়েছে অন্ধকারে। তারা জানে না, কীভাবে বা কোথায় অভিযোগ করতে হয়।
সব মিলিয়ে অভিযোগ জমার কোনো না কোনো মাধ্যম সম্পর্কে অবগত মাত্র ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ। বাকিদের কাছে প্রতিবাদের পথটি সম্পূর্ণ অজানা।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নামটির সঙ্গে পরিচিত দেশের অনেকেই। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জানেন। কিন্তু অভিযোগ জানানোর মূল হাতিয়ার দুদকের হটলাইন (১০৬)। এই হটলাইন নম্বরটি সম্পর্কে জানেন মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ।
অবশ্য এই তথ্য মানতে নারাজ দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। সংস্থাটির উপপরিচালক আক্তার হোসেন আগামীর সময়ের কাছে দাবি করলেন, দুদক সম্পর্কে জানে না দেশে এমন মানুষ নেই। টিআইবি এ তথ্য কোথায় পেল, তা জানা না থাকায় তিনি এর বেশি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যান্য মাধ্যমের হালচাল
দুর্নীতির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগের সুযোগ সম্পর্কে জানেন ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। ওয়েবসাইট বা হটলাইনের মাধ্যমে অভিযোগের পদ্ধতি জানা আছে মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশের। তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে অবগত ১ দশমিক ৮ শতাংশ। আর সরকারের অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে জানেন মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ।
অন্যদিকে, টিআইবির জরিপে অংশ নেওয়া ৬ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা অন্যান্য উৎসের কথা উল্লেখ করেছেন। ফলে সব মিলিয়ে অভিযোগ করার কোনো না কোনো ব্যবস্থা সম্পর্কে জানেন ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ।
বিনামূল্যের নাগরিক সেবা পেতে ঘুষ দেওয়া এখন যেন এক বাধ্যতামূলক নিয়ম। দেশে ঘুষের শিকার হওয়া ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন।
ভুক্তভোগীর প্রায় ৮২ শতাংশ মনে করেন, ঘুষ না দিলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত সেবা মেলাই ভার। আর ৩৩ শতাংশের বেশি মানুষের ধারণা, যথাসময়ে কাজ পেতে হলে টেবিলের নিচ দিয়ে টাকা দিতেই হবে। সরকারি সেবার নির্ধারিত ফি জানা না থাকায় ৫৮ শতাংশ মানুষ পড়েন ঘুষের ফাঁদে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার জন্য কর্মচারীদের সঙ্গে যোগসাজশে ঘুষ দিয়েছেন ২৩ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে ১১ শতাংশেরই উদ্দেশ্য ছিল নির্ধারিত প্রক্রিয়া এড়ানো।
ঘুষের এই কালো টাকা দেশের অর্থনীতিকে করছে ধ্বংস। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপনে দিলেন এর ব্যাখ্যা। জানালেন, ঘুষের টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন হয় না। ফলে তা সরকারি হিসাবে আসে না এবং সরাসরি কালো টাকায় রূপান্তর হয়। এই টাকার বড় অংশ আবার দেশের বাইরে পাচার হয়ে যায়, যা সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর।
এই অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ‘ঘুষ বা দুর্নীতির টাকা আসলে ব্ল্যাক মানিতে রূপান্তর হয়ে যায়। এসব টাকা দেশের অর্থনীতিতে থাকছে না, বেশিরভাগই দেশের বাইরে চলে যায়। এসব টাকা অন্য কারেন্সিতে (মুদ্রা) রূপান্তর হয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার ফলে দেশের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভে একটা প্রেশার তৈরি করে। সরকার দুর্নীতি আটকাতে ও অর্থ পাচার রোধে নানা রকম কড়াকড়ি জারি করে। যদিও এতে খুব বেশি লাভ হয় বলে জানা যায় না। কারণ অতীতে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীরা।’
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা আরও করুণ। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক মোহাম্মদ কবিরের কথাই ধরা যাক। ১০ বছর আগে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পুলিশ ভেরিফিকেশনে তাকে ঘুষ দিতে হয়েছিল দুই হাজার টাকা। তিনি বলছিলেন, ‘নিজে করলে তিন হাজার টাকার মতো কম লাগে, দালাল দিয়া করলে ওই টাকাটা বেশি লাগে। আমরা তো সিএনজি চালাই, কখন কার কাছে যাইতে হয় জানি না বিধায় দালাল দিয়া কাজ করাইতে হয়।’
আবার একনাবিন সিএ ফার্মের শিক্ষার্থী মো. মাজহারুল ইসলামের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিনি জানালেন, ইউনিয়ন পরিষদ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সার্টিফিকেট তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের কিছু না কিছু টাকা দিতেই হয়। একরাশ ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে মাজহারুল বলছিলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত ঘুষ দিতে বাধ্য হই কিংবা স্বেচ্ছায় দিয়ে থাকি। এলাকার ইউনিয়ন কাউন্সিলে কিংবা যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কাজে গেলে ১০০-২০০ টাকা কর্মচারীদের দিতেই হয়। আবার ধরুন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো সার্টিফিকেট তুলতে গেলে কিছু পরিমাণ টাকা অফিস রুম থেকে চেয়েই নেয়। টাকার পরিমাণ অল্প হওয়ায় আমরা কখনো প্রশ্ন করি না। কিন্তু এগুলোও তো ঘুষ বা দুর্নীতি।’
টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, অভিযোগ ব্যবস্থার অজ্ঞতাই দুর্নীতি প্রতিরোধের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। মানুষ একদিকে অভিযোগের জায়গা চেনে না, অন্যদিকে নানান ভয়ে অভিযোগ করতেও চায় না।
ফলে দুর্নীতির অধিকাংশ ঘটনা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। আর আড়ালে থেকে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা; নিশ্চিত হচ্ছে না তাদের জবাবদিহি বা বিচার।





