দুর্যোগ মোকাবিলা প্রকল্প নিজেই দুর্যোগে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুর্যোগ মোকাবিলায় নেওয়া ‘নগরাঞ্চলের ভবন সুরক্ষা’ প্রকল্প যেন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দুর্যোগে। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২৩ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ৪৮ শতাংশ। এতে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরাঞ্চলের সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন, ডিজিটাল সার্ভে ও ডাটাবেজ উন্নয়ন এবং সরকারি সেবা কার্যক্রমের মান বৃদ্ধি ও জননিরাপত্তার জন্য নেওয়া হয়েছিল প্রকল্পটি। এর বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৭১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কিন্তু পরে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৭৩৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেশিরভাগ অর্থই ঋণ হিসেবে দেয় জাইকা। এক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে ২৯ শতাংশ।
এ ছাড়া অনুমোদনের সময় প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। পরে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে করা হয় ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে বাড়তি সময় যাচ্ছে ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গত মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ২৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা, অর্থাৎ আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ ছাড়া বাস্তব ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৪৮ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে সময় ও ব্যয় আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী আগামীর সময়কে জানান, এ বছর মূল্যায়ন করা আইএমইডির প্রতিবেদনগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যান্য বছর শুধু সুপারিশ দিয়েই কাজ শেষ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার সেটি হবে না। সুপারিশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কি ব্যবস্থা নেবে সেটিও মনিটরিং করা হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নগরাঞ্চলের দুর্যোগ ঝুঁকি কমানো, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন এবং ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা। তবে বাস্তবায়নে অত্যধিক বিলম্ব হওয়ার কারণে এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরের মানুষ। উল্টো ব্যয় বাড়ছে সরকারের। এর পেছনে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র মূল্যায়নে সময়ক্ষেপণকে দায়ী করেছেন তারা।
কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটির প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ১০ তলা বিশিষ্ট ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তর ভবন নির্মাণ, দুটি অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্রের রেট্রোফিটিং এবং উলম্ব সম্প্রসারণ, ফায়ার সার্ভিসের জন্য অগ্নিনির্বাপক যান সংগ্রহ করা। এ ছাড়া প্রকল্পের অধীনে ভূমিকম্প প্রতিরোধী বেজ আইসোলেশন সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের প্রকৌশলীদের জ্ঞানসমৃদ্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদনে আইএমইডি বলেছে, সদর দপ্তর নির্মাণকাজ আন্তর্জাতিক দরপত্রে হওয়ায় জাইকার শর্ত অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান ও মূল্যায়নে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ঠিকাদার অপারগতা প্রকাশ করে। পরে অন্য ঠিকাদারের সঙ্গে দর নেগোশিয়েশন প্রকল্পের কাজ দীর্ঘায়িত করেছে। এ ছাড়া ভবন নির্মাণ এলাকার পরিবর্তনও প্রকল্পের অগ্রগতি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
অন্যান্য অংশে ৬টি ফায়ার স্টেশনের মধ্যে দুইটির (কুর্মিটোলা ও বারিধারা) নির্মাণকাজ শেষ। বাকি ৪টি ফায়ার স্টেশনের মধ্যে সাভার কেন্দ্র ছাড়া ৩টির নির্মাণকাজ শেষের পথে। এগুলো হলো- ঢাকার পোস্তগোলা, মোহাম্মদপুর এবং মিরপুর। প্রকল্পের আওতায় সদর দপ্তর নির্মাণ প্যাকেজের বেজ আইসোলশনের কাজ চলমান। এ ছাড়া সরেজমিন পরিদর্শনের সময় ঢালাই কাজ চলমান থাকায় পরামর্শক দলের উপস্থিতিতে কংক্রিটের টেস্ট ও তাপমাত্রা সঠিক পাওয়া গেছে। কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের আওতায় ক্রয়সংক্রান্ত বিষয়াদি (দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান) পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সরকারি ক্রয়সম্পর্কিত আইন পিপিএ-২০০৬ ও বিধিমালা পিপিআর-২০০৮ অনুসরণ করা হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়েছে ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনে। নিরীক্ষা কার্যক্রমে উত্থাপিত অডিট আপত্তি দেওয়া হয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে ১৪টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনিষ্পন্ন ১৬টি, যা দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার সময়াবদ্ধ ব্যবস্থাপনা, দেশীয় ক্রয়বিধির সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের শর্ত সমন্বয়সাধন, বেইজ আইসোলেশন প্রযুক্তির ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় ফায়ার স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।








