নাগরিকত্বের প্রমাণ আছে, তবু ঠেলছে ভারত
- ৩ দিন পর শূন্যরেখা থেকে ২১ জনকে ফেরাল বিএসএফ
- পুশইন ঠেকাতে বাংলাদেশ সরকারের ১৩ চিঠিতে উত্তর নেই ভারতের
- সীমান্তে নিরাপত্তায় বিজিবির পাশাপাশি আনসার

সংগৃহীত ছবি
ভারতের বীরভূমের মুরারইয়ের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুনকে তার স্বামী-সন্তানসহ গত বছরের জুনে বাংলাদেশে পুশইন করেছিল ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। সে সময় যে ছয়জনকে জোর করে বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতর ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, তাদের সবারই ছিল ভারতীয় নাগরিকত্ব। ফলে ঝড় ওঠে সমালোচনার। চার মাস পর আদালতের হস্তক্ষেপে সোনালী আর তার ছেলেকে ফেরত নেয় ভারত।
চলতি বছর আবারও শুরু হয়েছে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা। কোনো তথ্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে নাগরিকদের ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
গত এক সপ্তাহে দেশের অন্তত ২০টি সীমান্ত পয়েন্ট থেকে কয়েকশ মানুষকে পুশইন করার চেষ্টা হয়েছে। তবে প্রায় সব চেষ্টাই রুখে দিয়েছেন বিজিবি সদস্যরা। কোনো আইন না মেনে এমন পুশইনের বিষয়ে ভারতকে ১২-১৩টি চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার, কিন্তু কোনোটিরই জবাব আসেনি— জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
সীমান্তে যখন চলছে পুশইনের চেষ্টা তখন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করলেন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং আইন মেনেই অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে ভারত। তবে গতকাল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বললেন, ‘অবৈধ কেউ থাকলে তাদের ফেরাতে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া মানা উচিত দুই দেশেরই। ভারত থেকে যেভাবে লোকজনকে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে, তা একেবারে গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা যত রকম ডিপ্লোম্যাটিক নর্ম আছে, সেটা ফলো করছি।’
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হয়েছে বিজিবি-বিএসএফের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন। গতকাল সম্মেলনের প্রথম দিন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ভারতের পক্ষে ছিলেন বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের দল।
সম্মেলনে সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে, জানিয়েছেন এতে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা। এ ছাড়া অনুপ্রবেশ, ভারত থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের চোরাচালান রোধ, মানব পাচার প্রতিরোধ নিয়েও হয় আলোচনা।
আজ সীমান্ত সম্মেলনে আলোচনা হবে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কাঁটাতারের বেড়াসহ অন্যান্য অননুমোদিত অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ এবং চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের নিষ্পত্তি, তিন বিঘা করিডর দিয়ে পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপন, আগরতলা থেকে আখাউড়াগামী চারটি খালের বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের জন্য ইটিপি স্থাপন নিয়ে।
ভারতের আধার কার্ডও মানছে না বিএসএফ: ভারতের নাগরিক হওয়ার পরও বাংলাদেশে পুশইন করা সোনালী ও তার ছেলে দেশে ফিরলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা এখানো বাংলাদেশে। অথচ তাদের নামে রয়েছে দেশটির আধার কার্ডও। গত ২২ মে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে একটি রায়ও দিয়েছেন। বাংলাদেশে পুশইন হওয়া ভারতীয় নাগরিকদের এমন কয়েকটি আধার কার্ড এসেছে আগামীর সময়ের হাতে। যার মধ্যে রয়েছে সুইটি বিবি (৪১৩৮০২৩৮৮৪০২), কুরবান সেখ (২৮৮৩৫১৬১৫৭৮৮), ইমন দেওয়ান (৯৮৬৫৮০৮৯৪৮৩৪), দানেশ (৭২১৬২৫১৯৯৭৪২) ও সাব্বির সেখ (৭৪৪৯৯৮১৫৯৩৫৪)। ভারতীয় নাগরিক পরিচয়পত্র আধার কার্ড থাকার পরও কেন তাদের পুশইন করা হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর জানেন না খোদ এই ব্যক্তিরাও।
ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকার পরও বাংলাদেশে পুশইন করা আইনবহির্ভূত উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুমন কুমার রায় বললেন, ‘প্রতিবেশী রাষ্ট্র সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ হয়। কিন্তু ভারত যে অবৈধভাবে পুশইন করছে, এটা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন।’
বিশেষজ্ঞ ভাবনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সি আর আবরারের মতে, পুশইন ও সীমান্ত হত্যা বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড। যা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক— উভয় আইনকেই লঙ্ঘন করে। তিনি বললেন, ‘মানুষকে নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকে রাখা একটি মানবিক সংকট তৈরি করে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহেদুল আনাম খানের মতে, বিজিবির মূল দায়িত্ব হলো বাংলাদেশের সীমান্ত যেন কোনোভাবেই লঙ্ঘিত না হয় তা নিশ্চিত করা। সীমান্তে যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ বা আগ্রাসনে বাধা দেওয়া বিজিবির আইনি কর্তব্য এবং বর্তমানে তারা সঠিক কাজটিই করছে। যাদের জোর করে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তারা যদি বাংলাদেশি হয়েও থাকে, তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সেই প্রমাণ উপস্থাপনের দায় সম্পূর্ণ ভারতের।
তিনি বললেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ভারত যদি কাউকে ফেরত পাঠাতে চায়, তবে স্বীকৃত পারাপার কেন্দ্র, ইমিগ্রেশন ও বৈধ প্রবেশপথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।’
তিন দিন পর ফেরানো হলো ২১ জনকে
ঠাকুরগাঁওয়ে ও পঞ্চগড়ের সীমান্ত শূন্যরেখা থেকে তিন দিন পর ২১ জনকে ফিরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। গত ৪ জুন রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা মশালগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করা ১১ নারী-পুরুষ ও শিশু এবং পঞ্চগড় সদরের হাঁড়িভাসা ইউনিয়নের বড়বাড়ি সীমান্ত এলাকায় শিশুসহ অন্তত ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়। এরপর থেকে টানা তিন দিন খোলা আকাশের নিচে দুই দেশের মাঝে শূন্যরেখায় অবস্থান করেছিল তারা।
সীমান্তে নিরাপত্তায় বিজিবির পাশাপাশি আনসার
পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থানের মধ্যে নিরাপত্তা জোরদারে মোতায়েন করা হয়েছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। গতকাল আনসার বাহিনীর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সীমান্তবর্তী ১১টি জেলার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর এবং খাগড়াছড়িতে উপজেলা-থানা আনসার ও ভিডিপি-টিডিপি সদস্যদের এরই মধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবির সঙ্গে গত বছর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের অংশ হিসেবে সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তায় আনসার-ভিডিপি সদস্যদের নিয়োজিত করার কথাও তুলে ধরা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।




