সুযোগভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প-২
সুফল কম ব্যয় বেশি
- বাস্তব আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যাশিত প্রভাব নেই
- ভাতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী যাচাই, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব
- তদারকির দুর্বলতা, আর্থিক ও ক্রয় ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা

ছবি : এআই
খরচ হয়েছে বেশি, সংখ্যাগতভাবে কাজও হয়েছে ভালো, কিন্তু সফলতা এসেছে কম। অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত সুফলে ঘাটতি আছে। বলা হচ্ছে রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন (রস্ক) ফেইজ-২ প্রকল্পের কথা। ২০১৩ থেকে শুরু হয়ে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে আট বছর ধরে বাস্তবায়িত হয়েছিল এটি। এক্ষেত্রে সময় লেগেছে অতিরিক্ত ৭০ শতাংশ।
সুযোগভিত্তিক প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করাই ছিল প্রকল্পের উদ্দেশ্য। এটির মূল ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ১৪০ কোটি ২৬ লাখ, শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছিল ১ হাজার ২৫০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। বেশি খরচ হয় ১১০ কোটি টাকা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লক্ষ্য পূরণ হলেও সুফল ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
সমাপ্ত হওয়া এ প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন করেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। দেশব্যাপী প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর।
আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ আগামীর সময়কে বললেন, ‘প্রকল্পটি থেকে কেন সুফল কম এসেছে, এর জন্য কারা দায়ী তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিশেষ করে দায়িত্বপালনকারী প্রকল্প পরিচালক, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পিআইসি কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এত টাকা খরচে যদি সুফল কম আসে সেটি মেনে নেওয়া যায় না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি একদিকে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার, শিক্ষার্থী ধরে রাখা, নারীর অংশগ্রহণ, কমিউনিটি ব্যবস্থাপনা ও প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বাস্তবায়নে দেরি, তদারকির দুর্বলতা, আর্থিক ও ক্রয় ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা, শিক্ষার মানের বৈচিত্র্যায়ন এবং প্রকল্প-পরবর্তী টেকসইকরণে ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
আরও বলা হয়, বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায় ২১ হাজার ৬৩২টি শিখন কেন্দ্রের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তবায়িত হয়েছে ২০ হাজার ২৩৯টি কেন্দ্র। ৭ লাখ ২০ হাজার শিক্ষার্থীর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৫৫৬ শিশু শিক্ষার আওতায় এসেছে। অর্থাৎ প্রকল্পটি দ্বিতীয় সুযোগভিত্তিক শিক্ষার একটি কার্যকর মডেল হিসেবে কাজ করেছে। তবে সব এলাকায় শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় উপকারভোগী শনাক্তকরণ ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা প্রয়োজন ছিল।
শিক্ষা ভাতা খাতে ৭ লাখ ৯৫ হাজার জনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৫১৩ জন সুবিধা পেয়েছে। তবে শিক্ষার্থী যাচাই, ভাতা বিতরণ ও উপস্থিতিভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি ছিল। শহরে বস্তি শিশুশিক্ষা কর্মসূচিতে ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪৯ হাজার ৪৭৮ জন শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে শহরে ২ হাজারটি শিখন কেন্দ্রের বিপরীতে ১ হাজার ৬৪৭টি কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ায় কেন্দ্রভিত্তিক শিক্ষার্থী চাপ, শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া শহরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উচ্চ-স্থানান্তর প্রবণতাও শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল।
শিক্ষার মান ও অ্যাকাডেমিক তদারকির ক্ষেত্রে পুল শিক্ষক নিয়োগে ১ হাজার ২০০ জনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৯২২ জন যুক্ত হওয়ায় অ্যাকাডেমিক সহায়তা কাঠামো আংশিকভাবে দুর্বল ছিল। ফলে শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্তি ও পাসের হার ইতিবাচক হলেও শেখার গুণগত মান নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর মনিটরিং ও শিখন মূল্যায়ন প্রয়োজন ছিল। প্রাক-বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার জন প্রশিক্ষণার্থীর লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হলেও এর গুণগত ও কর্মসংস্থানভিত্তিক প্রভাব ভালো ছিল না। মাঠপর্যায়ের মতামত অনুযায়ী, সেলাই/টেইলারিং, বিউটিফিকেশন, মোবাইল সার্ভিসিং, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, কম্পিউটার বেসিক, ফুড প্রসেসিং ও হস্তশিল্পের মতো ট্রেড সব এলাকায় স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, ব্যবহারিক সরঞ্জাম, ল্যাব সুবিধা, নিরাপদ পরিবেশ ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী চাকরি সংযোগ কম ছিল। ফলে প্রশিক্ষণ সংখ্যাগতভাবে সফল হলেও বাস্তব আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রত্যাশিত প্রভাব নেই।
প্রকল্প-পরবর্তী শিক্ষার্থী ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে রস্ক শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মাধ্যমিক শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান বা স্ব-কর্মসংস্থানে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তার ধারাবাহিক ট্র্যাকিং পর্যাপ্ত ছিল না। প্রকল্প শেষে দীর্ঘমেয়াদি ফলোআপ ব্যবস্থা ছিল দুর্বল।
প্রকল্পটি শিক্ষাগত অন্তর্ভুক্তি বাড়ালেও বাল্যবিবাহ ও সামাজিক আচরণ পরিবর্তনে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেনি। প্রাইমারি ডেটায় বিবাহিতদের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বিয়ের হার প্রোগ্রাম গ্রুপে ২৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং কন্ট্রোল গ্রুপে ২৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ প্রায় একই। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে মাধ্যমিকে উত্তরণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে টিকে থাকা, শিক্ষার ব্যয় বহন, দূরত্ব, পরিবারিক আয়চাপ ও কিশোর-কিশোরীদের কর্মমুখী হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রকল্পের আওতায় শিক্ষা ভবিষ্যৎ আয়ের ভিত্তি তৈরি করেছে; কিন্তু প্রশিক্ষণ, চাকরি সংযোগ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও বাজারভিত্তিক দক্ষতা পর্যাপ্ত না থাকায় তা শক্তিশালী আয়বর্ধক প্রভাবে রূপ নেয়নি।
প্রকল্পের অডিট ও ক্রয়সংক্রান্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ক্রয় বিধিমালা অনুসরণে ঘাটতি, ভ্যাট/আয়কর কম কর্তন, চুক্তির অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া, কাল্পনিক ভ্রমণ ব্যয়, ব্যাংক সুদ জমা না দেওয়া এবং ক্রয় পরামর্শক নিয়োগে বিলম্বের মতো বিষয় উঠে এসেছে। যদিও অধিকাংশ অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে, তবুও এসব ঘটনা আর্থিক-শৃঙ্খলা, বিল যাচাই, ক্রয় নথি সংরক্ষণ ও তদারকির দুর্বলতা নির্দেশ করে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘আইএমইডিকে প্রকৃতপক্ষে কার্যকর করা উচিত। শুধু সুপারিশ দিয়েই কাজ শেষ করলে হবে না। এখানে আইএমইডির সংস্কার দরকার।’






