ক্লাইমেট সেন্ট্রাল
বছরে ২০০ দিন বিপজ্জনক তাপ-আর্দ্রতায় বাংলাদেশ
- গত পাঁচ দশকের তুলনায় দেশে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ তাপ-আর্দ্রতার দিন
- ঢাকায় ২১০, চট্টগ্রামে ২১১ দিন বিপজ্জনক পরিস্থিতি

সংগৃহীত ছবি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বিপজ্জনক তাপ-আর্দ্রতার প্রকোপ বাড়ছে। দেশে বছরে গড়ে ২০০ দিন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে কাটাতে হচ্ছে দেশের মানুষকে।
আজ বুধবার আন্তর্জাতিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে বিশ্ব জুড়ে বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার দিন বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে বিশ্বে বছরে গড়ে ১০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা রেকর্ড হলেও ২০১৬ থেকে ২০২৫ সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ দিনে। ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী রেকর্ড হওয়া এমন দিনের প্রায় ৬৪ শতাংশের পেছনে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সময়ে দেশে বছরে গড়ে ২০০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। অথচ ১৯৭০-এর দশকে এ সংখ্যা ছিল ১৭৫ দিন। অর্থাৎ গত পাঁচ দশকে ঝুঁকিপূর্ণ তাপ-আর্দ্রতার দিন বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে অতিরিক্ত ৩০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা যুক্ত হচ্ছে। ১৯৭০-এর দশকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ দিন। একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রার অংশ ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের যেসব দেশে মানুষ সবচেয়ে বেশি সময় ঝুঁকিপূর্ণ তাপ ও আর্দ্রতার মধ্যে বসবাস করছে। বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ নগরাঞ্চলগুলোয় এই ঝুঁকি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় বছরে গড়ে ২১০ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা অনুভূত হয়। এর মধ্যে ২৫ দিন সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যুক্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে বছরে গড়ে ২১১ দিন এমন তাপ-আর্দ্রতা দেখা যায়, যার মধ্যে ৩৬ দিন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যুক্ত হয়েছে। খুলনায় পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে বছরে গড়ে ২২৪ দিন বিপজ্জনক আর্দ্র তাপমাত্রা রেকর্ড হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তাপমাত্রা বেশি হওয়াই নয়, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াও মানবদেহের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। সাধারণত ঘামের মাধ্যমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং অতিরিক্ত তাপ জমতে থাকে।
এ অবস্থায় পানিশূন্যতা, তাপজনিত অবসাদ, হিটস্ট্রোক, হৃদরোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, খোলা পরিবেশে কর্মরত শ্রমিক এবং আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (শিশু) ডা. শিমুল মজুমদার বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহ ও আর্দ্রতা শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ফেলছে।’
তার ভাষায়, শিশুদের মধ্যে কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যাজমাসহ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ বাড়ছে। আগের বছরের তুলনায় অ্যাজমা ও সংশ্লিষ্ট শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু তাপজনিত অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘস্থায়ী গরমের সময় মানুষ বেশি পানি পান করতে বাধ্য হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা না থাকায় অনিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ে। এতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাশেদুল হাসান বলেছেন, ‘বাড়তে থাকা তাপপ্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। গরমের সময় মানুষ বেশি পানি পান করলেও অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
বিশ্বব্যাপী চরম তাপমাত্রা এরই মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী আবহাওয়া-সংক্রান্ত দুর্যোগগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে বিশ্বে চরম তাপমাত্রাজনিত কারণে আড়াই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সতর্কবার্তা, বাড়তে থাকা আর্দ্রতা তাপপ্রবাহকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে এবং অনেক অঞ্চলে পরিস্থিতিকে মানবদেহের সহনক্ষমতার সীমার কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তাপ-স্বাস্থ্য কর্মপরিকল্পনা জোরদার করা, শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নগর এলাকায় শীতলীকরণ অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু-সহনশীল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।




