চার বছরে পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকা ঋণ শোধের চাপে সরকার
- বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় বাড়বে। সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির হারের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন- রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
- অর্থ পাচার বন্ধ ও রেমিট্যান্স আয় বাড়ানো হবে- জোনায়েদ সাকি
- এখনো রেড জোনে যাইনি- পরিকল্পনা সচিব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে খেলাপির রেকর্ড নেই বাংলাদেশের। এই আত্মতুষ্টির মধ্যেও আগামী চার বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে প্রতি বছর গড়ে পরিশোধ করতে হবে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার বা ৭২ হাজার কোটি টাকা।
সরকারি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই ঋণ পরিশোধের অঙ্ক ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়নে দাঁড়াবে ২০৩০ সালে— যা অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে বলে শঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি আগামীর সময়কে বলেছেন, বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়ছে— এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তুতি না থাকলেও ঋণ পরিশোধে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য চেষ্টা চলছে ডলারের জোগান বাড়াতে। এক্ষেত্রে বিদেশে যাতে ডলার পাচার হয়ে না যায়, সে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর উদ্যোগও আছে। সেই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে আয় বাড়িয়েও ডলার বাড়ানো হবে। ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে খুব বেশি সমস্যা হবে না।
জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বৈদেশিক ঋণ শোধের চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি বলেছিলেন, বর্তমানে পরিচালন বাজেটের বেশিরভাগ ব্যয় হয় ঋণ পরিশোধে। আমরা জানি, ২০২৭ সালে ঋণ পরিশোধ অনেক বেড়ে যাবে। এজন্য প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির হার এবং পরিশোেধর বৃদ্ধির হারের একটা তুলনামূলক বিশ্লেষণ থাকা প্রয়োজন। এর জবাবে বৈঠকে উপস্থিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী ২০২৭ সালে ঋণ পরিশোধে দরকার ৫ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালে গিয়ে পরিশোধের অঙ্ক দাঁড়াবে ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। তবে বিনিময় হারের পরিবর্তনের ওপর ভিত্তি করে এর তারতম্য হতে পারে।
ইআরডি সূত্র জানায়, ২০২৮ সালে গড়ে পরিশোধ করতে হবে ৫ কোটি ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ। ২০২৯ সালেও প্রায় ৫ দশমিক ৮১ কোটি ডলারের মতো পরিশোধ করতে হবে। সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য বলছে, এর মধ্যেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরের দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। এর মধ্যে আসল পরিশোধ করা হয়েছে ৫১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ ছাড়া সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ১৮ কোটি ২৮ লাখ ডলার।
গত অর্থবছরের একই সময়ে অর্থাৎ দুই মাসে পরিশোধ করা হয়েছিল ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার। এর মধ্যে আসল পরিশোধ করা হয় ৪৮ কোটি ৮৭ লাখ ডলার এবং সুদ দেওয়া হয়েছিল ১৭ কোটি ৮৩ লাখ ডলার বা ২ হাজার ১৭৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এই দুই অর্থবছরের তুলনা করলে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের শুরুতেই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থবছরের সময় যতই গড়িয়ে যাবে, পরিশোধের এই অঙ্ক ততই বাড়তে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইআরডির হিসাব বলছে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বাড়লেও কমছে অর্থছাড়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে রয়েছে বৈপরীত্য। চলতি অর্থবছরের দুই মাসে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশ মিলে বিভিন্ন প্রকল্পের বিপরীতে অর্থছাড় করেছে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ৭৫ কোটি ডলার। এ হিসাবে তুলনামূলক অর্থছাড় কমেছে ৪৫ কোটি ৫৫ লাখ ডলার।
পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার আগামীর সময়কে বললেন, ‘অতীতে আমরা কোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হইনি। সে ক্ষেত্রে আশা করছি, আগামীতেও কোনো সমস্যা হবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বৈদেশিক ঋণঝুঁিকর যে সীমা, সেটির নিচেই রয়েছে বাংলাদেশ। সুতরাং আমরা এখনো রেড জোনে যাইনি। এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, যেসব প্রকল্পে ঋণ নেওয়া হচ্ছে সেগুলো থেকে যেন আউটকাম আসে। পরিকল্পনা কমিশন সেদিকে সচেতন রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১৫টি খাতের চলমান ২৪৫ প্রকল্পের অনুকূলে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলে বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। খাতভিত্তিক দেখলে দেখা যায়, সাধারণ সরকারি সেবা খাতে ২২ প্রকল্পের অনুকূলে বৈদেশিক ঋণ বরাদ্দ ১ হাজার ৭৩৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রতিরক্ষা খাতে কোনো বরাদ্দ নেই। জনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষায় ছয় প্রকল্পের অনুকূলে ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবায় ১০ প্রকল্পের অনুকূলে ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া কৃষিতে ২২ প্রকল্পের অনুকূলে ৩ হাজার ২২৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ২৯ প্রকল্পের বিপরীতে ২৫ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। পরিবহন ও যোগাযোগে ৪৭ প্রকল্পের বিপরীতে ২৭ হাজার ৬৬৫৪ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে ১৩ প্রকল্পের অনুকূলে ৩ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। পরিবেশ-জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ খাতে ২২ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলিতে ৩৩ প্রকল্পের বিপরীতে ৮ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যে ৯ প্রকল্পের বিপরীতে ২ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। ধর্ম, সাংস্কৃতিক ও বিনোদনে তিন প্রকল্পের বিপরীতে ৯৫০ কোটি টাকা। শিক্ষায় ১৫ প্রকল্পের জন্য ৪ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে পাঁচ প্রকল্পের অনুকূলে ৪৫২ কোটি ৬১ লাখ এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে আট প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ আছে ৫৬৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের দুই মাসে উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বৈদেশিক ঋণে অর্থ খরচ কমেছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অদক্ষতা, প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতার অভাব, উন্নয়ন-সহযোগীদের আমলাতান্ত্রিকতা, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতাসহ রয়েছে নানা কারণ। গত জুলাই ও আগস্ট মাসে মন্ত্রণালয় এবং বিভাগগুলো খরচ করেছে মোট বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ দশমিক ৯১ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দুই মাসে খরচ ছিল ৩ দশমিক ১০, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৫৮ এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে খরচ হয় ৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৫ সালেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে সতর্ক করেছে। এ ছাড়া ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে সংস্থাটি ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছর ধারাবাহিকভাবে মধ্যমঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর অর্থ হলো, রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে।



