হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড বাধ্যতামূলক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সুস্থ হওয়ার আশায় এসে হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে মরণব্যাধি হাম। অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে এসে অনিরাপদ পরিবেশের কারণে হাসপাতালেই আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। শেষ রক্ষা হচ্ছে না অনেকেরই, নিভে যাচ্ছে তরতাজা প্রাণ। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সাধারণ রোগীর সঙ্গে হাম রোগীদের একসঙ্গে রাখাই এই মৃত্যুর মিছিলের মূল কারণ। এমন অবহেলা বন্ধে অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার সব সরকারি হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড ও কেবিন নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত সোমবার আগামীর সময়-এর প্রথম সংখ্যায় ‘হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে হাম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই এমন সিদ্ধান্তের কথা জানাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
এদিকে গত কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে আরও ১১ শিশু। এমন প্রেক্ষাপটে শিশুমৃত্যুর কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি গঠন ও তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড ও কেবিন নির্ধারণের পাশাপাশি ছুটির দিনসহ প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দুবেলা রাউন্ড দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এই নির্দেশনা দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা সদর/জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়েছে।
এই নির্দেশনার আগের দিন আগামীর সময়ে ‘হাসপাতাল থেকেই ছড়াচ্ছে হাম’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, অন্য রোগের চিকিৎসা করাতে এসে হাসপাতাল থেকেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। এমনকি শিশুদের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হাম আর সাধারণ রোগীদের যেভাবে একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হয়, তাতে হাসপাতাল থেকে হাম ছড়াবেই।
এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের সব হাসপাতালে ভর্তি রেখে বা ভর্তি ছাড়া প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে হবে। হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে নিশ্চিত করতে হবে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী।
এতে আরও বলা হয়, প্রত্যেক ভর্তি রোগীর সঙ্গে হাসপাতালে একজন অভিভাবক অবস্থান করতে পারবেন বা দেখা করতে পারবেন। এ ছাড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ভর্তি রোগীর তথ্য প্রতিদিন সার্ভারে আপলোডের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১১ শিশুর। একই সময়ে নতুন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৩৭ জন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গজনিত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭৫-এ। এর মধ্যে ৭৭ জন হাম সংক্রমিত ছিল বলে নিশ্চিত করেছে সরকার।
এই ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যুর সংখ্যা দুজন। একই সময়ে সন্দেহজনক মৃত্যুর মধ্যে ঢাকা ও সিলেটে তিনজন করে এবং চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনায় একজন করে মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৪ হাজার ৫১৫ জন। আর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৩ হাজার ৯৮৩ জন।
ক্ষতিপূরণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে হাইকোর্টের রুল: হামের প্রাদুর্ভাবে মারা যাওয়া শিশুদের প্রত্যেকের পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের সংশ্লিষ্টদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে ১০ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালকসহ বিবাদীদের আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে হবে। জনস্বার্থে করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি করে গতকাল বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
একই সঙ্গে আদালত সারা দেশে হাম ও জলাতঙ্ক টিকার প্রাপ্যতা, পর্যাপ্ততা ও সরবরাহের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দিয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের পক্ষে গত ১০ মে হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করা হয়।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জসিদুল ইসলাম জনি।
হাম নির্মূলে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে হঠাৎ এ বছর রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। গত তিন মাসে প্রায় ৫০০ শিশু মারা যায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৫০ হাজার।




