আগের পোশাকে ৭৬ কোটি গচ্চা, ফের ৭৭ কোটির অর্ডার
- সর্বনিম্ন দরদাতা বাদ, কাজ পেলেন পঞ্চম দরদাতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাঠে দিনরাত ডিউটি। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে পথচলা। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিতে পুলিশের চাই এক চিলতে আরামদায়ক পোশাক। কিন্তু সেই পোশাক নিয়েই একের পর এক টানাপড়েন। নতুন ইউনিফর্মের রঙ বদলায়। কাপড়ের মান বদলায় না। বদলায় না কেনাকাটার পেছনের চেনা সিন্ডিকেট। আগের কাপড়ের মান নিয়ে উঠেছিল অভিযোগ। পরীক্ষায় মিলেছিল ঘাটতির প্রমাণও। তার পরও সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে পঞ্চম দরদাতা সেই নোমান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান নাইস ফেব্রিক্স প্রসেসিং লিমিটেডকে দেওয়া হয়েছে নতুন করে ৫৫ কোটি টাকার কাজ।
এমন প্রেক্ষাপটে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। অন্যদিকে বিপুল অর্থ খরচের পরও মাঠের পুলিশ সদস্যদের মিলছে না আরাম।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের ২৫ নভেম্বর থেকে নতুন পোশাক দেওয়া শুরু হয় পুলিশ সদস্যদের। এরই মধ্যে গত ১৮ জুন পুলিশের নতুন পোশাক নিয়ে ফের প্রকাশ হয়েছে গেজেট। বাদ দেওয়া হচ্ছে ৭৬ কোটি টাকার নতুন পোশাক। তবে এবারও খাকি প্যান্ট নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করছেন পুলিশ সদস্যরা।
জানা গেছে, পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয় ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি। ইউনিফর্ম হিসেবে চূড়ান্ত করা হয় আয়রন কালারের শার্ট এবং কফি কালারের প্যান্ট। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর নতুন পোশাকে মাঠে নামে পুলিশ। যদিও সব সদস্য এখনো পাননি পরিবর্তিত নতুন পোশাক। এরই মধ্যে গত ১১ জুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকার নতুন পোশাকের। যাতে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পঞ্চম দরদাতা প্রতিষ্ঠান নাইস ফেব্রিক্স প্রসেসিং লিমিটেডকে।
পুলিশ সদর দপ্তরের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউনিফর্মের শার্ট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় আয়রন টিসি প্লেইন ফেব্রিক কেনার দরপত্রে অংশ নেয় চারটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সর্বনিম্ন দর দেয় সানজানা ফেব্রিক্স। তাদের দেওয়া দর ছিল প্রতি গজ ৫২২ টাকা। অন্যদিকে, নোমান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান নাইস ফেব্রিক্স প্রসেসিং লিমিটেডের দর দেওয়া ছিল ৫২৯ টাকা ৯৯ পয়সা। এ ছাড়া ইউনিক ট্রেডার্স ৫৩১ টাকা এবং ইসমাইল আঞ্জুমান আরা ফেব্রিক্স ৫৪৯ টাকা ৯৯ পয়সা দর প্রস্তাব করে।
একই চিত্র দেখা গেছে প্যান্টের কাপড় কেনার ক্ষেত্রেও। এ দরপত্রে সানজানা ফেব্রিক্সের দর ছিল প্রতি গজ ৪৩২ টাকা। বিপরীতে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল পিএলসি দর দেয় ৪৩৫ টাকা। এখানেও সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইলকে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন ইউনিফর্মের কাপড় কিনতে দেওয়া হয়েছিল ৭৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ। এর মধ্যে প্রায় ৫১ কোটি টাকার কাজ পেয়েছিল নোমান গ্রুপ। বাকি ২৫ কোটি টাকার কাজ পায় প্যারামাউন্ট গ্রুপ। সেই কাপড় দিয়েই গত বছরের নভেম্বর থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিটে চালু হয় নতুন পোশাক। তবে নতুন পোশাকে মাঠে নামার পরই পুলিশ সদর দপ্তরে আসতে থাকে নানান অভিযোগ। অনেক পুলিশ সদস্য বলেছেন, কাপড় শক্ত। দীর্ঘ সময় পরে থাকা কষ্টকর। গরমে সমস্যা বাড়তে পারে আরও।
পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানালেন, এসব অভিযোগ জমার পর ইউনিফর্মের কাপড় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ল্যাবরেটরিতে। সেই পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা। চুক্তি অনুযায়ী শার্টের কাপড়ে জিএসএম বা সুতার ঘনত্ব থাকার কথা ছিল ২০৫, কমবেশি ৫। অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য সীমা ছিল ২০০ থেকে ২১০ জিএসএম। কিন্তু পরীক্ষায় পাওয়া যায় ১৯৩ জিএসএম। শুধু তাই নয়, আর্দ্রতা শোষণ ক্ষমতার ক্ষেত্রেও পাওয়া যায় ঘাটতি। চুক্তি অনুযায়ী কাপড়ের উইকিং পারফরম্যান্স ৬ থেকে ১০ সেন্টিমিটার হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষায় তা পাওয়া যায় মাত্র ৪ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার।
বস্ত্র বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর্দ্রতা শোষণ ক্ষমতা কম হলে দীর্ঘ সময় ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন করা হয়ে পড়ে কষ্টকর। তাদের মতে, জিএসএম কমে গেলে কমে যায় উৎপাদন ব্যয়। একই পরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করে সম্ভব হয় বেশি কাপড় উৎপাদন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কেনাকাটায় সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দেওয়া অসম্ভব নয়। তবে তার জন্য শক্তিশালী ও নথিভুক্ত কারণ থাকতে হয়। কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিষ্ঠানের হাতে আবারও কাজ যাওয়ায় সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
দুদকের মামলার মধ্যেই কার্যাদেশ: নোমান গ্রুপকে ঘিরে আরেকটি বিতর্ক হলো, এর চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে প্রায় ১৯ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে। আদালত তার বিদেশ গমনের ওপরও দিয়েছেন নিষেধাজ্ঞা।
দুদকের তথ্য বলছে, তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের পরিমাণ ১৮ কোটি ৯৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
যদিও নোমান গ্রুপের পরিচালক শাহাদত চৌধুরীর দাবি, তাদের দেওয়া দর এবং কাপড়ের মান সন্তোষজনক হওয়াতেই নতুন করে পেয়েছেন পোশাকের কাজ। বললেন, ‘আমাদের দেওয়া রেট এবং মানে সন্তুষ্ট হয়েই পুলিশ সদর দপ্তর কাজ দিয়েছে। অবশ্যই আমাদের ওপর তাদের আস্থা আছে। ১১ জুন পাওয়া কার্যাদেশের শর্তই ছিল রঙ পরিবর্তন হলে সেই রঙের কাপড় আমরা সরবরাহ করব।’
গ্রুপ চেয়ারম্যান মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা প্রসঙ্গে শাহাদত চৌধুরী বললেন, ‘মামলাটি তার ব্যক্তিগত বিষয়। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’
যদিও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তাধীন ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে কোনো কার্যাদেশ দেওয়া অনৈতিক। ইফতেখারুজ্জামান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তাধীন ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে জেনেশুনে কার্যাদেশ দেওয়া হলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর না জেনে দেওয়া হলেও তা ক্রয় প্রক্রিয়ার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। উভয় ক্ষেত্রেই বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।’
ফের হরমুজ বন্ধ করল ইরান
২০ জুন ২০২৬
একই ধরনের মত মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমানের। তিনি বললেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই, পুলিশ ব্যস্ত ইউনিফর্ম নিয়ে। আগের সরবরাহকারীর পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পরও তাকে কাজ দেওয়াটা এক ধরনের স্বৈরাচারী আচরণ। গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে আমরা স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং মানবাধিকারের প্রত্যাশা করেছিলাম। পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে কোনোভাবেই আমরা সন্তুষ্ট হতে পারছি না।’
গত ১১ জুনের টেন্ডারের এই কার্যাদেশ নিয়ে জানতে চাওয়া হয় পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের কাছে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি সবকিছু মনে করতে পারছি না। আমার যতদূর মনে পড়ছে, সব কেনাকাটা যথাযথ নিয়ম মেনেই হয়েছে।’







