স্মরণে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান
হাত পেতে নিয়ে চেটেপুটে খাই বিসমিল্লাহ্র পাগলা সানাই

নিজের বাড়ির চৌকিতে উস্তাদ বিসমিল্লাহ খাঁ। সময় ১৯৮৬। ছবি: রঘু রাই ফাউন্ডেশন
সানাই কোনো নরম যন্ত্র নয়। কাঠ আর ধাতুতে গড়া। ডবল রিডের ভেতর দিয়ে ফুঁউউ। অদক্ষ হাতে এর শব্দ কর্কশ, কঠোর, ভেদক্ষমতাসম্পন্ন। খোলা উঠান আর মন্দিরচত্বর পেরিয়ে দূর অবধি পৌঁছতে হয় বলেই শব্দটা যেন এমন তীক্ষ্ণ। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সানাই বরাবর বাস করেছে ঠিক অন্দরেই— বিয়েবাড়িতে, মন্দিরের আচারে, শুভ মুহূর্তের সমাগমে। সেখানে তার সৌন্দর্যের দরকার নেই। দরকার কেবল আওয়াজ। কিন্তু বিসমিল্লাহ খানের সানাই শুনে কেউ কোনোদিন তাকে কর্কশ বলেনি।
নয় দশক ধরে প্রতিদিনের সাধনায় তিনি সানাইয়ের ভেতর থেকে টেনে এনেছিলেন এমন এক ব্যথা, এমন এক মিহি আকুলতা, যা হয়তো যন্ত্রটির মধ্যে চিরকাল ঘুমিয়ে ছিল— কিন্তু কেউ কোনোদিন তত গভীর মনোযোগ আর ভালোবাসা দিয়ে শোনেনি, শোনাতে পারেনি বলেই কেউ জাগাতে পারেনি। প্রতিদিন ভোরে তিনি যে মনোযোগ আর ভালোবাসা নিয়ে সানাই শ্রোতার কানের জন্য তুলে দিতেন, তা বিসমিল্লাহ খানের জন্মের আগে আর কারও ভাগ্যে জোটেনি।
পৃথিবীর মানুষের সানাই বা শেহনাই শোনার এ আকুলতা হঠাৎ আসেনি। এসেছিল এক নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক আর আবেগময় জীবনচর্চা থেকে। গঙ্গার ঘাট থেকে কী! কিংবা ভোরের মন্দিরের ঘণ্টার ধ্বনি থেকে। এমন এক বিশ্বাস থেকে যা ইসলামী অনুশাসনের ভেতরে থেকেও প্রতিদিনের চর্চায় তার চেয়ে অনেক বেশি উদার। আর ভালোবাসতেন তিনি বারাণসীকে— এমন গভীরে, এমন নিবিড়ে যে পৃথিবীর বাইরের যেকোনো লোভের কাছে সেই ভালোবাসা তিনি বারবার, বিনা দ্বিধায় বিকিয়ে দিতে অস্বীকার করেছেন।
বিসমিল্লাহ খানের জন্ম ১৯১৬ সালের ২১ মার্চ, বিহারের ছোট্ট রাজ্য ডুমরাঁওয়ে। তার পরিবারের সঙ্গে সংগীতের সম্পর্কটা শখের বা পেশার নয়— পরিচয়ের। এতটাই সম্পূর্ণ যে পরিবার থেকে সংগীতকে আলাদা করলে স্রোত থেকে নদীকেই আলাদা করা হয়। বিসমিল্লাহ খানের দাদা রসুল বক্স খান ছিলেন ডুমরাঁওয়ের মহারাজার দরবারি সংগীতজ্ঞ। বাবা পায়গম্বর বক্স খানও রাজদরবারের শিল্পী। যে ঘরে বিসমিল্লাহ খানের জন্ম, সেখানে সংগীতই প্রথম ভাষা। সানাই আসবাবপত্রের মতোই নিত্যসঙ্গী। আর সন্তান কী হবে— সে প্রশ্ন ওঠার আগেই লেখা হয়ে আছে তার উত্তর।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। জন্মের সময়ে রাখা নাম কামরুদ্দিন। ‘বিসমিল্লাহ’ নামটা— যার অর্থ ‘ঈশ্বরের নামে’, কোরানের প্রথম শব্দ— এসেছিল পরে। শোনা যায়, নবজাতকের কান্না শুনে তার দাদা বলেছিলেন, শব্দটা এতই শুভ যে যেন বিসমিল্লাহ বলার মতো। গল্পটা ঠিক হোক বা মহাপুরুষদের ঘিরে তৈরি হওয়া স্নেহমাখা পুরাণই হোক (পড়ুন মিথ), সত্যের গন্ধ এতে আছে। নামটা তাকে মানিয়েছিল। নব্বই বছর যা কিছু তিনি করেছেন, সবই আক্ষরিক অর্থে শুরু হতো ভক্তি দিয়ে।
ছয় বছর বয়সে পরিবার পাঠাল তাকে বারাণসীতে, মামা আলী বক্স খানের কাছে। মামা বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাই বাদক। সংগীতশিক্ষা আর পারিবারিক টানের এই বাস্তব সিদ্ধান্তটাই ঠিক করে দিল সব। বারাণসী কেবল বাড়ি হলো না। হয়ে গেল তার আধ্যাত্মিক শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
বারাণসী, যার প্রাচীন নাম কাশী, মুখের ভাষায় বেনারস— পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবিত শহরগুলোর একটি। গঙ্গার পশ্চিম তীরে বসে আছে সে, যেখানে নদী বেঁকে উঠে পূর্বমুখী সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘাটগুলো তিন হাজার বছর ধরে গ্রহণ করে আসছে হিন্দুধর্মের প্রার্থনা, শবদাহ, আচার আর স্নান। শহরটা একই সঙ্গে আধ্যাত্মিকভাবে সবচেয়ে ঘন আর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে সবচেয়ে জীবন্ত— এমন মিশেল সেখানে যে কেউ সেখানে নিরপেক্ষভাবে বাস করতে পারে না। বারাণসী যেনও প্রত্যেক বাসিন্দার কাছে একটা উত্তর চায়।
বিসমিল্লাহ খানের উত্তর ছিল সানাই।
মামা আলী বক্স খানের কাছে বিশ্বনাথ মন্দিরে শিখতে শিখতে তিনি কেবল যন্ত্রের কারিগরি ভাষাই শিখলেন না, শিখলেন মন্দিরের পরিবেশ যে বিশেষ শ্রবণের দাবি রাখে তাও। মন্দিরে বাজানো আর মঞ্চে বাজানো এক নয়। মন্দিরের শ্রোতা মূল্যায়ন করতে আসে না। সে নিজের ভক্তিতে ডুবে থাকে, আর সংগীতের কাজ সে ভক্তিকে আরও গভীর করা— শিল্পীর দক্ষতা দেখানো নয়। আত্মসচেতনতা আসার আগেই প্রতিদিন মন্দিরে বাজিয়ে বাজিয়ে এই বোধ তার রক্তে মিশে গিয়েছিল। পরের মঞ্চজীবনের সব কিছুর ভিত হয়ে রইল এটিই।
তার সাধনার কথা শিষ্য আর সমসাময়িকরা বর্ণনা করেছেন মানুষের সাধারণ ক্ষমতার বাইরের কিছু হিসেবে। ভোরের আগে উঠতেন। মন্দিরে বাজাতেন। সকালভর রেওয়াজ করতেন। নদীর পাশে বসে থাকতেন। গঙ্গা তার জীবনে রূপক নয়। তিনি তাকে শুনতেন। নদীর শব্দকে বলতেন গুরু— তার অবিরাম বহে যাওয়া, বাধা পেরিয়ে নিজের স্বভাব না হারিয়ে পথ খুঁজে নেওয়া— রাগে ইমপ্রোভাইজেশনের আদর্শ তো ঠিক এটাই হওয়া উচিত!
সানাইয়ের আনুষ্ঠানিক বাদ্যযন্ত্র থেকে ধ্রুপদী মঞ্চে ওঠার যাত্রাটা বিসমিল্লাহ খানের জীবন থেকে আলাদা করা যায় না। কিন্তু তিনি যতটা বদলালেন, তা বোঝার জন্য আগে জানতে হবে সানাই ঠিক কী ছিল।
বিশ শতকের গোড়ায় ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে যন্ত্রদের একটা অলিখিত কিন্তু কঠিন তালিকা ছিল। শীর্ষে বসতেন মঞ্চের যন্ত্রীরা— সেতার, সরোদ, তবলা, পাখোয়াজ, সারেঙ্গি, ধ্রুপদী বাঁশি। এসব যন্ত্রের বাদকেরা উঠতে পারতেন ওস্তাদ বা পণ্ডিতের মর্যাদায়, রাজদরবারের আমন্ত্রণে, সঙ্গীত সম্মেলনে সারা রাতের আসরে, রসিক শ্রোতার মনোযোগের কেন্দ্রে।
সানাই সে দলে ছিল না। সে ছিল ‘মঙ্গল বাদ্য’— শুভ যন্ত্র। বিয়ে, পুজো, অনুষ্ঠানে বাজে। তার দাম সামাজিক কাজে, সংগীতের গভীরতায় নয়। সানাই বাদকেরা ছিলেন সম্মানিত কারিগর, কিন্তু তাঁদের ধ্রুপদী শিল্পী ভাবা হতো না— যেমন ভাবা হতো সেতারবাদক বা গায়ককে।
বিসমিল্লাহ খান এই রীতি বদলালেন তর্ক দিয়ে নয়, দাবি দিয়ে নয়— বদলালেন এক সোজা আর ভয়ংকর পদ্ধতিতে: সানাইকে এমন অসামান্য রূপে বাজিয়ে, রাগের পর রাগে, আসরের পর আসরে, যে পুরনো তালিকার আর সততার সঙ্গে তাঁকে বাইরে রাখার কোনো পথ রইল না।
১৯৩০-এর দশক থেকে আকাশবাণীতে রেকর্ড, জলন্ধরের হরবল্লভ সঙ্গীত সম্মেলন, আইটিসি সঙ্গীত গবেষণা অ্যাকাডেমির আসর, আর ষাট-সত্তরের দশকে আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, জাপানের আন্তর্জাতিক মঞ্চ— প্রতিটি ধাপে যুক্ত হলো একেকটা স্তর সেই প্রমাণের: সানাই সঠিক হাতে পড়লে অনুষ্ঠানের বাদ্যযন্ত্র নয়, ধ্রুপদী সংগীতের সর্বোচ্চ বাহন হয়ে ওঠে।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট, স্বাধীনতার আগের রাতে, নেহরু মধ্যরাতে দিলেন ‘ট্রিস্ট উইথ ডেসটিনি’ ভাষণ। পরদিন সকালে স্বাধীন ভারতের প্রথম যে শব্দ লালকেল্লায় বেজে উঠল, তা বিসমিল্লাহ খানের সানাই।
এটা কোনো অনুষ্ঠানসূচির জন্য আকস্মিক নির্বাচন ছিল না। স্বাধীনতার প্রথম দিনে বিসমিল্লাহ খানই বাজাবেন এই সিদ্ধান্ত ছিল সচেতন সাংস্কৃতিক আর রাজনৈতিক ঘোষণা— ভারত কী ধরনের জাতি হতে চায়, তার প্রতীক। বিহারের এক মুসলমান সংগীতজ্ঞ, মুঘল কেল্লার প্রাচীরে ধ্রুপদী যন্ত্র বাজিয়ে, ভোরের রাগে স্বাগত জানাচ্ছেন হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রথম সূর্যোদয়— ছবিটি এত নিখুঁতভাবে নতুন জাতির আদর্শের সঙ্গে মিলে যাওয়া যে, একে প্রতীক হিসেবেই বানানো হয়েছে মনে হয়।
বয়স তখন একত্রিশ। পরের বহু বছর প্রজাতন্ত্র দিবসে তিনি বাজিয়েছেন, আর তার সানাইয়ের সঙ্গে জাতীয় অনুষ্ঠানের যোগ এতটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল যে বহু ভারতীয়ের মনে সানাইয়ের শব্দ আর দেশাত্মবোধের আবেগ সত্যিই এক হয়ে গেলো।
শীঘ্রই বিদেশ থেকে ডাক এল। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে ইউরোপ-আমেরিকার কনসার্টে প্রথমবারের মতো সানাই পৌঁছল এমন সব শ্রোতার কাছে, যারা যন্ত্রটির নামও শোনেনি। সমালোচকেরা অভিভূত। পশ্চিমা সংগীত সমালোচকেরা এমন এক বিস্ময় নিয়ে লিখলেন, যাদের ভাষা যথেষ্ট নয়, তাই লিখলেন ‘আধ্যাত্মিক’, ‘অতীন্দ্রিয়’— শব্দগুলো অপর্যাপ্ত, অথচ অনিবার্য।
তিনিই প্রথম ভারতীয় সংগীতজ্ঞ, যিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা আন্তর্জাতিক উৎসবে সানাই পরিবেশন করেন। ষাটের দশকের সেই মঞ্চে প্রথমবারের মতো ইউরোপের ধ্রুপদী সংগীতের শ্রোতারা শুনল এমন এক যন্ত্রের স্বর, যার নামও তারা আগে জানে না। সেই স্বর শুনে তারা চমকে উঠলেন। কারণ এই যন্ত্র কোনোদিন তাদের কাছে অনুষ্ঠানের বাদ্যযন্ত্র হয়ে আসেনি— এসেছে তাদের সামনে ধ্রুপদী সংগীতের সর্বোচ্চ সম্ভাবনা নিয়ে।
বিসমিল্লাহ খানের জীবনের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র এমন এক সম্পর্ক, যাকে সহজে চেনা যায় না, আর তিনি নিজেও কখনও ব্যাখ্যা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের দরকার বোধ করেননি। তিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ মুসলমান— পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আজীবন পড়েছেন। আবার তিনিই প্রতিদিন ভোরে বিশ্বনাথ মন্দিরে সরস্বতীর উদ্দেশে সানাই বাজিয়েছেন— নিবেদন হিসেবে, অনুষ্ঠান হিসেবে নয়। গঙ্গার ধারে বসে নদীকে অনুভব করেছেন জীবন্ত আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে। নিজের সংগীতকে বলেছেন অর্পণ, প্রদর্শন নয়।
যে দেশে ধর্মীয় পরিচয় ক্রমে কঠিন আর রাজনীতিময় হয়ে উঠছে, সেখানে বিসমিল্লাহ খানের আধ্যাত্মিক জীবন ছিল একচেটিয়া ধর্মবিশ্বাসের প্রতি এক প্রত্যক্ষ ভর্ৎসনা। ইসলামচর্চা আর সরস্বতী-ভক্তির মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব তিনি বোধ করেননি। বোধ করেছেন একই মৌলিক স্পন্দনের দুটি প্রকাশ— মানুষের সেই ব্যাকুলতা, যা তাকে ঐশ্বরের দিকে টেনে নেয় তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে। জিজ্ঞেস করা হলে বিসমিল্লাহ্ খান উত্তর দিতেন সরলভাবে— সংগীতই ঈশ্বরের সবচেয়ে প্রিয় ভাষা। সংগীতের দেবী সরস্বতী। আমি যখন তার জন্য বাজাই, তখন ঈশ্বরের জন্যই বাজাই। এতে গোলমাল কোথায়?
তার মধ্যে কোনো গোলমাল ছিল না। গোলমাল ছিল কেবল তাদের মনে, যারা ধর্মের সীমানা এত কঠিন করে বাঁধতে চান যে সংগীত তাকে নরম হতে দেয় না। এই আধ্যাত্মিক উদারতা সরল বা চিন্তাহীন ছিল না। এসেছিল বারাণসীতে কাটানো আধ্যাত্মিক জীবনের গভীর থেকে— যে শহরে ঐতিহ্যের সীমানা সবসময়ই লাখো ছিদ্রযুক্ত। সুফি দরগা আর হিন্দু মন্দির শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সহাবস্থান করেছে, পরস্পরকে ভেজানো-শেখানো চলেছে। বিসমিল্লাহ খান গড়ে উঠেছিলেন এই বিশেষ সাংস্কৃতিক আর আধ্যাত্মিক বাস্তুতন্ত্রে— এত গভীরে যে কোনো রাজনৈতিক যুক্তি তাকে সরাতে পারবে না।
সারাজীবনে বিসমিল্লাহ খান এমন সব প্রস্তাব পেয়েছেন, যা অন্য যেকোনো সংগীতজ্ঞের সিদ্ধান্ত সহজ করে দিতে পারতো। আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপের একাধিক দেশে স্থায়ী আবাসনের আমন্ত্রণ তিনি পেয়েছেন। বড় বড় আন্তর্জাতিক সংগীত প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার প্রস্তাব পেয়েছেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতি আর আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের সম্ভাবনা— যা বারাণসীর জীবন কোনোদিন দেখা দেয়নি বরং কখনও কখনও দিয়েছে সত্যিকারের কষ্ট।
সব ফিরিয়ে দিয়েছেন বিসমিল্লাহ খান। কারণ সবসময় একটাই আর উত্তরটাও একই— শান্ত, নিরেট, স্পষ্ট; গঙ্গা কোথায়? বিশ্বনাথ মন্দির কোথায়? ঘাটগুলো কোথায়? বারাণসীকে আমি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি না। তাই আমাকে বারাণসীতেই থাকতে হবে। এ মিথ্যে বিনয় নয়, প্রদর্শনের নম্রতাও নয়। এ ছিল আধ্যাত্মিক বাস্তবতার হুবহু বিবৃতি। তার সংগীত সেই জায়গা থেকে আলাদা নয়, যেখানে তার জন্ম। ভোরের মন্দিরে বাজানো রাগগুলো কেবল কোনো ধ্রুপদী অনুশীলন নয়। সেগুলো এক বিশেষ মানুষ, এক বিশেষ নদী, এক বিশেষ দেবী আর এক বিশেষ শহরের নিরন্তর কথোপকথন। সে কথোপকথন ভিন্ন ভূগোলে সরিয়ে নিয়ে গেলে তার স্বভাবই বদলে যাবে— যার ক্ষতিপূরণ দিতে পারে, এমন আর্থিক বা পেশাগত কোনো কিছুই বিশ্বভুবনে নাই।
এই টানের গভীরতা সবচেয়ে মর্মস্পর্শী হয়ে উঠেছিল জীবনের শেষ বছরগুলোয় দেয়া বিসমিল্লাহ খানের সাক্ষাৎকারে। তখন ক্রমবর্ধমান বেদনা নিয়ে বলতেন বারাণসী আর ভারতের বদলে যাওয়া দেখে। সাম্প্রদায়িক সীমানার কঠিন হয়ে ওঠা, সেই দৈনন্দিন, সহজ বহুত্বের ক্ষয়— যা তার বারাণসীর শৈশবের সাধারণ বুনন ছিল— তা নিয়ে অস্থির ছিলেন তিনি। বেশ কয়েকটি নথিভুক্ত সাক্ষাৎকারে কেঁদেছেন, নিজের জন্য নয়, ভারতীয় হওয়ার যে পথটা হারিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করতেন, তার জন্য। নব্বই বছরের বৃদ্ধ, ভারতরত্নে ভূষিত, তখনও তার আসল পরিচয় তিনি ভোলেননি— তিনি এক বাদক, এক সাধক, যিনি দেখেছেন কীভাবে সুরের জগৎ ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসছে।
বিসমিল্লাহ খান সানাই দিয়ে কী করলেন, তা বোঝার জন্য রাগ কী বোঝা দরকার, আর রাগ তার সাধকের কাছে কী দাবি রাখে। রাগ কোনো স্কেল নয়, যদিও তার নির্দিষ্ট স্বর আছে। সুরও নয়, যদিও সে সুরের জন্ম দেয়। রাগ অনেকটা ব্যক্তিত্বের মতো— এক নির্দিষ্ট আবেগময় আর আধ্যাত্মিক ভূখণ্ড, যেখানে সংগীতজ্ঞ ঢুকে পড়েন আর বাঁধা নিয়মের মধ্যে ইমপ্রোভাইজেশনের মাধ্যমে তাকে আবিষ্কার করেন। প্রতিটি রাগের নির্দিষ্ট সময় আছে— দিন বা রাত, ঋতু, আবেগ, আর শতাব্দীর চর্চা আর কাব্যে গড়া সহাবস্থান।
ভোরে বিসমিল্লাহ খান যখন রাগ ভৈরব বাজাতেন, তখন তিনি শুধু সকালের রাগ পরিবেশন করতেন না। প্রবেশ করতেন এক বিশেষ আধ্যাত্মিক ভূগোলে, যা ঐতিহ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মানচিত্রে চিহ্নিত করেছে— ভোরের ধূসর-নীল আলো, প্রথম পাখির ডাক, শহর জাগার আগের নিস্তব্ধতার বিশেষ গুণ, ঘুম আর জাগরণের মাঝের মুহূর্তে আত্মার বিশেষ আকুলতা। রাগ ছিল এসব অভিজ্ঞতার পাত্র, আর তাঁর সানাই ছিল সেই পাত্রে সম্পূর্ণ ডুবে থাকার বাহন।
তার ইমপ্রোভাইজেশন নিয়ে সহ-সংগীতজ্ঞ আর সমালোচকেরা বলেছেন— তাতে অনিবার্যতার গুণ ছিল। মনে হতো, আগের বাক্যের পরে কেবল একটিই বাক্য আসতে পারে, যদিও ইমপ্রোভাইজেশন তৈরি হচ্ছে ঘটমান মুহূর্তে, যা কেউ— এমনকি স্বয়ং শিল্পীও— আগে থেকে জানতেন না। ইমপ্রোভাইজেশনে এই অনিবার্যতার গুণ সেই শিল্পীরই লক্ষণ, যিনি রাগের ব্যাকরণের এত গভীরে ঢুকিয়ে নিয়েছেন যে তাঁর সংগীতচিন্তা আর রাগের যুক্তি এক বা একাকার হয়ে গেছে।
সংগীতজ্ঞ ও সমালোচক কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন— বিসমিল্লাহ খানের সানাইয়ে প্রার্থনার এমন এক গুণ আছে, যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিষয়বস্তু থেকে স্বাধীন; শিল্পীর সম্পূর্ণ নিমগ্নতা থেকেই সংগীত নিজে সে গুণ তৈরি করে। এই পর্যবেক্ষণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে আধ্যাত্মিক সাধনা আর সংগীতের উৎকর্ষের সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে— যে সম্পর্ককে বিসমিল্লাহ খান তাঁর যুগের প্রায় সব সংগীতজ্ঞের চেয়ে বেশি সম্পূর্ণভাবে মূর্ত করেছিলেন।
তিনি তার ছেলেদের আর শিষ্যদের সানাই শিখিয়েছেন। কিন্তু সবসময় বলতেন— যন্ত্রের নিজের আত্মা আছে। শিষ্যকে কেবল দরজা দেখিয়ে দেওয়া যায়। সে দরজা দিয়ে ঢুকবে কি ঢুকবে না, সেটা তার আর সংগীতের মধ্যে। কেউ মাঝখানে দাঁড়াতে পারে না।
উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান মারা যান ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট, বারাণসীতে— যে শহর তিনি ছাড়তে রাজি হননি। বয়স হয়েছিল নব্বই। নব্বই বছরের প্রায় প্রতিদিনই সানাই বাজিয়েছেন। সমাহিত হলেন বারাণসীর ফতেহমান কবরস্থানে, যে শহরকে এত গভীর আর এত সুনির্দিষ্টভাবে ভালোবেসেছিলেন যে, ছেড়ে যাওয়া কখনওই সত্যিকারের বিকল্প ছিল না।
মৃত্যুর পর শোকলিপির ভৌগোলিক বিস্তার আর আবেগের উৎসারণ ছিলো অভূতপূর্ব। ভারতের শাস্ত্রীয় সংগীতমহল থেকে উত্তর আমেরিকা-ব্রিটেনের প্রবাসী সম্প্রদায়, ফ্রান্স-জার্মানি-জাপানের বিশ্বসংগীত সমালোচক থেকে রাজনীতিবিদ— এমনকি সাধারণ মানুষ, যারা কোনোদিন ক্লাসিক্যাল কনসার্টে যায়নি, তারাও টের পেয়েছিল— জগতের অপরিবর্তনীয় কিছু চলে গেছে। শুধু এক সংগীতজ্ঞ চলে যাননি— যদিও তিনি ‘ওয়ন অব ইটস কাইন্ড’ — তবু চলে গিয়েছিল এক বিশেষ কিছু। নব্বই বছরের প্রাত্যহিক সাধনা আর প্রকাশ্য পরিবেশনে তৈরি সেই যুক্তি: সংগীত আর বিশ্বাসের সম্পর্ক, জায়গা আর শিল্পের সম্পর্ক, এক মুসলমান আর এক হিন্দু দেবী আর পবিত্র নদী আর এমন এক যন্ত্রের সম্পর্ক, যাকে আগে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। সেই যুক্তি আজও জীবিত— তার রেখে যাওয়া রেকর্ডিংয়ে, তার শেখানো শিষ্যদের মধ্যে, আর সারা পৃথিবীতে সানাই আজ ধ্রুপদী যন্ত্র হিসেবে যে মর্যাদায় অধিষ্ঠিত— তার মধ্যে।
বিসমিল্লাহ খান ২০০১ সালে পান ভারতরত্ন, ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান— এই সম্মান পাওয়া সংগীতজ্ঞের সংখ্যা হাতে গোনা। রবিশঙ্কর আর এম.এস. সুব্বলক্ষ্মীর পর তিনিই সেই বিরল শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞদের একজন, যাকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। সরকারি ভাষার চেয়ে ব্যক্তিগত আবেগে উষ্ণ ছিল সেই সনদপত্র। কিন্তু তার আসল সম্মান কোনো সনদে নয়— বারাণসীর ভোরে, গঙ্গার বাতাসে, ভৈরবের প্রথম সুরে, যে সুর আজও খুঁজে পায় তার পথ।
ডুমরাঁওয়ের রাজপরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক আজীবন ছিল। যে রাজদরবারে তার দাদা সংগীতজ্ঞ ছিলেন, সেই পরিবারের স্নেহ তিনি পেয়েছেন আজীবন। বারাণসীতে কাটানো সত্তর বছরের জীবনেও ডুমরাঁও ছিল তার অহংকারের জায়গা। তিনি ভুলে যাননি কোথা থেকে উঠে এসেছেন। ভুলে যাননি সেই মাটি, যেখানে তার জন্ম, আর যে রাজপরিবার তাকে প্রথম চিনেছিল। তবু শেষ সত্য সেখানেই রয়ে যায়— ফতেহমান কবরস্থানে, গঙ্গার খুব কাছে, যে নদীকে তিনি বলতেন গুরু, যার শব্দে তিনি খুঁজে পেতেন রাগের চলন, যার তীরে তিনি সাত দশক ধরে বাজিয়েছেন ভোরের ভৈরবী, সেই নদীর কাছেই তিনি আজ ঘুমিয়ে আছেন। ঘুমের মধ্যে হয়তো শুনতে পান সূর্যের আলো ফোটার শব্দ, প্রথম পাখির ডাক, আর দূরে কোথাও তাঁর সানাই— পাগলের মতো, চিরকালের মতো বেজে চলেছে, পাগলা সানাই।











