স্মরণে ফিরোজা বেগম এবং কমল দাশগুপ্ত
বাংলা গানের দুটি কুসুম

ফিরোজা বেগম এবং কমল দাশগুপ্ত। ছবি: সংগৃহীত
ফিরোজা বেগম এবং কমল দাশগুপ্ত; বাংলা গানের দুই কিংবদন্তির জন্মদিন চলে গেলো নীরবে, না কোনো রাষ্ট্রীয় আয়োজন, না কোনো গণমাধ্যমের কোনো আয়োজন চোখে পড়লো। দুই অসামান্য শিল্পীর ভক্ত হিসেবে শোকাহত মনে এই স্মরণলেখা। এর মধ্যে ফিরোজা বেগমকে আমি দেখেছি, সাক্ষাৎকারও নিয়েছি— লেখক
আমাদের স্মৃতির দর্পণে ফিরোজা বেগম যেন এক চিরভাস্বর নক্ষত্র। তানপুরা হাতে, চোখ বুজে গানের গভীরে ডুবে যাওয়া এক শিল্পী। আরেকটি মুখ তখনই ভেসে ওঠে—কমল দাশগুপ্ত। সুরের নেশায় বিভোর, যে মানুষটি বাংলা গানের ভুবনে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ বয়সে এসে নিভৃতেই হারিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ অবাক কাকতাল্যে এই দুই শিল্পীর জন্মদিন একই তারিখে, ২৮ জুলাই। ১৯১২ সালে জন্ম নেওয়া কমল, আর ১৯৩০ সালে জন্ম নেওয়া ফিরোজা—বয়সে আঠারো বছরের ব্যবধান, কিন্তু সুরের জগতে তারা পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিলেন। তাদের জীবনের গল্প যেন এক মহাকাব্যিক সুরলিপি—কোথাও বেদনার রাগ, কোথাও প্রাপ্তির সুর, আবার কোথাও মিলনের অমোঘ টান।
কমল দাশগুপ্ত সৃষ্ট কিছু জনপ্রিয় গান: ‘তুমি কী এখন দেখিছ স্বপন’, ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে’, ‘এমনি বরষা ছিল সেদিন’, ‘সাঁজের তারকা আমি’, ‘মেনেছি গো হার মেনেছি’, ‘আমি ভোরের যূথিকা’, ‘আমি বনফুল গো’, ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, ‘তোমার জীবন হতে’, ‘ঘুমের ছায়া চাঁদের চোখ’
ফিরোজা বেগমের শৈশব কেটেছে ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ মহকুমার রাতইল ঘোনাপাড়া গ্রামের জমিদার পরিবারে। বাবা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী, মা কওকাবুন্নেসা ছিলেন সংগীতানুরাগী। কিন্তু গান শেখার কোনো বাধাধরা নিয়ম ছিল না। রক্ষণশীল সমাজের আবহে বাইরে থেকে তালিম নেওয়ার চল ছিল না। তবু ছোট্ট ফিরোজার মধ্যে সঙ্গীত যেন জন্মান্তরের সাধনা হয়ে ধরা দিয়েছিল। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গান গেয়ে তিনি সাড়া ফেলে দেন। ওই কিশোরীর কণ্ঠে এক অলৌকিক মাধুর্য ছিল, যা রেকর্ড কিনে শুনতে ছুটে আসত মানুষ।
কলকাতার এক সঙ্গীতাসরে নয়-দশ বছর বয়সী ফিরোজা একদিন গেয়ে উঠলেন, ‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা...’। আসরে উপস্থিত এক ব্যক্তি ঘিয়ে রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা পরে বসেছিলেন। গান শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এতটুকু মেয়ে, এই গান তুমি শিখলে কোথায়!’ ফিরোজা তখন জানতেন না, সেই মানুষটিই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নজরুলের সেই সান্নিধ্যই ফিরোজার জীবন বদলে দিল। কবির কাছ থেকে তালিম নেওয়া শুরু হলো, প্রায় আড়াই বছর তিনি সুস্থ নজরুলের সাহচর্য পান। এই সাক্ষাৎ এক সাধারণ মোড় বদলের গল্প নয়; এ যেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—যখন এক শিষ্য তার গুরুকে আবিষ্কার করে, আর গুরু তার উত্তরাধিকার বেছে নেন নিঃশব্দে।
নজরুলের সেই সান্নিধ্যই ফিরোজার জীবন বদলে দিল। কবির কাছ থেকে তালিম নেওয়া শুরু হলো, প্রায় আড়াই বছর তিনি সুস্থ নজরুলের সাহচর্য পান। এই সাক্ষাৎ এক সাধারণ মোড় বদলের গল্প নয়; এ যেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—যখন এক শিষ্য তার গুরুকে আবিষ্কার করে, আর গুরু তার উত্তরাধিকার বেছে নেন নিঃশব্দে
অন্যদিকে কমল দাশগুপ্তের গল্পটা ছিল আরও ঘোরালো। নড়াইলে জন্ম, পিতা তারাপ্রসন্ন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অনুরাগী। বড় ভাই বিমল দাশগুপ্তের কাছে হাতেখড়ি, পরে কানা কেষ্ট, ওস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁ, দিলীপকুমার রায়ের কাছে দীক্ষা। রবীন্দ্রসংগীত জানতেন অগাধ, কিন্তু নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করেননি কখনো, মনে করতেন রবীন্দ্রনাথের গান তার গলায় মানাবে না। অথচ কল্পনা করা যায় কী বিপুল আত্মসমালোচনা ছিল এই সুরকারের! কমলের আসল শক্তি ছিল সুর সৃষ্টিতে। তিনি রাগসংগীতের ভিত্তিতে এমন সব আধুনিক গানের সুর করলেন, যা বাংলা গানের ধারা পাল্টে দিল, বদলে দিল। ‘আমি ভোরের যূথিকা’, ‘সাঁঝের তারকা আমি’—এমন গান যেখানে তালবাদ্য ব্যবহার না করেও যে মূর্ছনা তোলা যায়, তা তিনিই প্রথম দেখালেন। তার সুরে প্রণব রায়, কাজী নজরুল, অজয় ভট্টাচার্যের কথা মিশে তৈরি হলো এক নতুন সুরের ভুবন।
জীবনের বিচিত্র নাট্যমঞ্চে ফিরোজা বেগম ও কমল দাশগুপ্তের পথ মিললো রেকর্ডিং স্টুডিওতে। ১৯৪২ সালে মাত্র বারো বছর বয়সে ফিরোজার প্রথম রেকর্ড বেরোলো এইচএমভি থেকে। ইসলামী গান ‘মরুর বুকে জীবনধারা কে বহাল’ আর ‘মোর আঁখিপাতে’ গান দুটি মুহূর্তে জনপ্রিয়তা পায়। এর কিছুদিন পরেই কমল দাশগুপ্তের তত্ত্বাবধানে ফিরোজার কণ্ঠে রেকর্ড হলো উর্দু গান—‘ম্যায় প্রেম ভরে প্রীত ভরে শুনাউ’ আর ‘প্রীত শিখানে আয়া’। সেই সূত্রে দুজনের মধ্যে বাঁধন তৈরি হলো। সেই বাঁধন সংগীতের, মনের, আবার তখনকার জন্য অনাগত জীবনের জীবনেরও। ১৯৫৬ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এই বিয়ে ছিল সমাজের চোখে বহু প্রশ্নের জন্ম দেওয়া এক ঘটনা। কমল দাশগুপ্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে কামালউদ্দীন আহমদ নাম নিলেন, ফিরোজা বেগমের পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নিলোনা। তবু ফিরোজা নিজের অন্তরের সত্যকেই প্রাধান্য দিলেন। তিনি ছিলেন স্বভাবের দিক থেকেই আপসহীন, অনমনীয়। পাকিস্তান আমলে ইসলামাবাদ রেডিওর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাক পেয়ে শর্ত দিয়েছিলেন, আগে বাংলা গান গাইতে দিতে হবে। গাইলেন ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি’। সেই একই আপসহীনতা তিনি দেখিয়েছিলেন কমলকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়ার সময়ও, নিজের জীবনের প্রায় প্রতিটি পরতে পরতে।
বিয়ের পর ফিরোজার সংগীতজীবনে এলো নতুন মাত্রা। স্বামীর কাছে তিনি পেলেন অফুরান তালিম, আর কমল তার কণ্ঠের জাদুতে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলেন উপমহাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে। কিন্তু ফিরোজা যে শুধু কমলের সৃষ্টির বাহক ছিলেন না, তিনি নিজেই এক আলাদা ঘরানার হীরে, অন্তরে এক নিরন্তর সাধক। একটা সময় তিনি উপলব্ধি করলেন, নজরুলের গানই তার আরাধ্য হবে। অন্য সব গান ছেড়ে শুধু নজরুলসংগীত গাওয়ার যে সিদ্ধান্ত তিনি নিলেন, তাকে তখন গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তারা ‘আত্মঘাতী’ বলেছিলেন। কিন্তু ফিরোজা দমে যাননি। তার কণ্ঠেই প্রথম নজরুলের গানের একক লং প্লে প্রকাশ পেল। ‘দূর দ্বীপবাসিনী’, ‘মোমের পুতুল’-এর মতো গান তার কণ্ঠ পেয়ে যে আবেগমণ্ডিত সত্তা পেল, তা যুগে যুগে শ্রোতাদের কাঁদাবে, ভাসাবে। তিনিই ‘নজরুলসংগীত’ নামটিকে প্রতিষ্ঠা দিলেন—যা আগে ছিল কেবল ‘নজরুলের আধুনিক গান’।
কবি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ফিরোজাই প্রথম নজরুলসংগীতের স্বরলিপি প্রণয়নের মহৎ কাজ শুরু করেন। যে গানগুলো এতদিন কেবল কণ্ঠে কণ্ঠে বয়ে চলত, সেগুলো তিনি শুদ্ধ সুর ও স্বরলিপির বাঁধনে গ্রন্থিত করলেন। এ জন্য তাকে কম বেগ পেতে হয়নি। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে বাংলা একাডেমির অনুরোধে একশোটি নজরুল গানের স্বরলিপি দিয়েছিলেন, পরে আরও বহু স্বরলিপি লিখেছেন, যা আজও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। নজরুল একাডেমিও সম্ভবত সময়ের ফোঁড়ে ভুলে গেছে স্বরলিপি প্রকল্পের কথা।
ফিরোজা বেগমের এই কঠোর সাধনার পাশে দাঁড়িয়ে যে মানুষটি তাকে সুরের দিক থেকে শানিত করেছিলেন, সেই কমল দাশগুপ্ত তখন নিজের জীবনের মধ্যগগনে। বাংলা, উর্দু, হিন্দি, ঠুমরি—সব সংগীত শাখাতেই তার সুরের জাদু। তিনি প্রায় আশিটি ছায়াছবির সংগীত পরিচালক ছিলেন। ‘তুফান মেল’, ‘শ্যামলের প্রেম’, ‘এই কি গো শেষ দান’-এর মতো গান একদা মানুষের মুখে মুখে ফিরত। শুধু নজরুলের গানই নয়, কমল নিজে প্রায় চারশো নজরুলসঙ্গীতে সুরারোপ করেছিলেন। ‘আমি বনফুল গো’ গানটি শুনলে আজও যে মুগ্ধতা জাগে, তার কারিগর প্রণব রায়ের কথা আর কমলের সুর। ‘পৃথিবী আমারে চায়, রেখো না বেঁধে আমায়’—মোহিনী চৌধুরীর কথা, কমলের সুরে গানটি পরে কাদেরী কিবরিয়া আর সাবিহা মাহবুবের কণ্ঠে নতুন করে প্রাণ পেয়েছিল। কমলের সুরের ভুবন ছিল রহস্যময়, সেখানে রাগের গভীরে বসে থাকা বেদনা, আবার চপল তরুণ্যের ছন্দ—দুই-ই সহাবস্থান করত। সৃষ্টিশীলতার এই জাদুকরী শক্তির জন্যই তিনি ছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি।
‘তুফান মেল’, ‘শ্যামলের প্রেম’, ‘এই কি গো শেষ দান’-এর মতো গান একদা মানুষের মুখে মুখে ফিরত। শুধু নজরুলের গানই নয়, কমল নিজে প্রায় চারশো নজরুলসঙ্গীতে সুরারোপ করেছিলেন। ‘আমি বনফুল গো’ গানটি শুনলে আজও যে মুগ্ধতা জাগে, তার কারিগর প্রণব রায়ের কথা আর কমলের সুর
কিন্তু সুরসাধক কমল দাশগুপ্তের জীবন শেষ অঙ্কে এসে করুণ সুরই বেজে উঠল। অথচ যে মানুষটা কলকাতার আকাশে সুরের মেঘ জমিয়েছিলেন, কলকাতার পর ঢাকায় এসে যেন সব আলো নিভে গেল তার। ১৯৬৭ সালে ফিরোজা বেগম সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন। প্রথমে রাজশাহীতে ভাই আসাফ্উদদৌলার বাসায় কিছুদিন থেকে তারপর ঢাকার ভূতের গলির ভাড়া বাড়িতে। কমল পরে এসে যোগ দিলেন। কিন্তু ঢাকায় তার সুরসৃষ্টির সেই জোয়ার আর দেখা গেল না। স্বাস্থ্যগত সমস্যা, সৃষ্টিশীল ক্লান্তি আর নানা কারণে তিনি নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। একটি স্টেশনারির দোকান ‘পথিকার’ খুলে বসলেন হাতিরপুলের মোড়ে। ভাবুন একবার, মনোহারী দ্রব্য, কলম, কাগজ, পেনসিল, সাবান,কেরোসিন বিক্রি করতেন যে হাতে, সে হাতেই একদিন কাঁপতে কাঁপতে সুরের স্বরলিপি লিখেছেন ‘মেনেছি গো হার মেনেছি’, ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারী করেছে’— এ যেন এক ট্র্যাজিক রূপকথা। শাফিন আহমেদ তার বাবা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘জীবন বড়ই বিচিত্র। অদ্ভুত। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে মিউজিক করে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়ে এসে হাতিরপুলের দোকানদারী। ট্র্যাজিক! ইট ইজ ভেরি ট্র্যাজিক!!’ সত্যিই, যিনি সুরের রাজ্যে সম্রাট, বাস্তবের দারিদ্র্য ও বিস্মৃতির কাছে তার হার কত নিষ্ঠুর।
‘জীবন বড়ই বিচিত্র। অদ্ভুত। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে মিউজিক করে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়ে এসে হাতিরপুলের দোকানদারী। ট্র্যাজিক! ইট ইজ ভেরি ট্র্যাজিক!!
যূথিকা রায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কমলের গলব্লাডারে পাথর হয়েছিল, অস্ত্রোপচার করাননি মায়ের ইচ্ছায়। তারপর থেকে তিনি আর স্বাভাবিকভাবে সুর করতে পারতেন না। দাঁড়াতেও কাঁপতেন, স্বরলিপিও আগের মতো রাখতে পারতেন না। নিজের অক্ষমতা বুঝতে পেরে তিনি নিজেই গান রেকর্ড করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সৃষ্টিশীলতার অকালমৃত্যু যেন জীবনের আগেই তাকে শেষ করে দিয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ফিরোজা বেগমের জীবনে নেমে আসে শূন্যতার অন্ধকার। একাকীত্ব। মাত্র আঠারো বছরের সুরময় দাম্পত্যের ইতি টেনে তিনি হারালেন তার গানের জগতের সবচেয়ে বড় বন্ধুকে।
কিন্তু ফিরোজা বেগম থেমে থাকার পাত্রী ছিলেন না। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি বরং আরও বেশি একাকীত্বের শক্তি নিয়েই নিজের সাধনায় ডুব দিলেন। তার কণ্ঠ যেন পাখির মতো সারা পৃথিবী উড়ে বেড়ালো। চীন, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ—সব মিলিয়ে তিনশো আশিটিরও বেশি একক অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। সেই অনুষ্ঠানগুলোতে নজরুলের গানের পাশাপাশি গেয়েছেন গজল, কাওয়ালি, ভজন, হামদ, নাত—সবেতেই তার সিদ্ধহস্ত প্রকাশ। সংগীত যে এক ঈশ্বরের উপাসনা, তা যেন তার প্রতিটি মুদ্রায় দৃশ্যমান। যন্ত্রণা, বেদনা আর সংগ্রামের মধ্যেও তিনি ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’, ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’, ‘আমি চিরতরে দূরে সরে যাব’-এর মতো গানগুলোকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, যেখানে শ্রোতা আর শিল্পী মিলেমিশে আবেগপশিত; একাকার হয়ে যান।
ফিরোজা বেগমের ব্যক্তিত্ব ছিল ইস্পাতকঠিন। সত্তরের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধিকার আন্দোলনের সময় করাচিতে গিয়ে তিনি রেকর্ড করেছিলেন ‘জয়, জয়, জয়— বাংলার জয়’ আর ‘জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো’। এই গান গাওয়ার অপরাধে তাকে হেনস্তা হতে হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, রেডিও স্টেশন থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গভীর রাতে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। ১৪ ডিসেম্বর একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে যান। মৃত্যুভয়কেও তিনি যেন সঙ্গীতের মতোই অনায়াসে উপেক্ষা করেছিলেন। দেশের প্রতি এই অনমনীয় ভালোবাসা, নজরুলের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য আর কমলের প্রতি নীরব শ্রদ্ধা—এই ত্রিবেণীসংগমেই তার চরিত্র গড়ে উঠেছিল।
তার অবদানের স্বীকৃতি এলো ধীরে, অতিধীরে। ১৯৭৯ সালে পেলেন স্বাধীনতা পদক, পরে একুশে পদক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দিল ‘বঙ্গ সম্মান’, ‘বঙ্গ বিভূষণ’ ও ‘মহাগুরু’ উপাধি। সত্যজিৎ রায় পুরস্কার, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র পুরস্কার, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট, জাপানের সিবিএস থেকে গোল্ড ডিস্ক—এ যেন সম্মানের বন্যা। কিন্তু ফিরোজা বেগমকে আমি যেদিন সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, সেদিন বুঝেছিলাম, এই সব পদক-সম্মান তার কাছে গৌণ। তার চোখের দৃষ্টি যেন তানপুরার সুরে ডুবে থাকা দূরের কোনো জগতে। তিনি বলেছিলেন, ‘নজরুল মানবসাধক। বিরল এই সাধকের সান্নিধ্য আমার জীবনের প্রধান স্মৃতি ও প্রেরণা। নজরুলসংগীত আমাকে দিয়েছে নতুন জগতের সন্ধান, যে জগৎ মানবিক সৌন্দর্যে ভরপুর।’ আর কমল প্রসঙ্গে তিনি খুব বেশি কথা বলতেন না, তবে তার চোখে সেই পুরনো বেদনার ছায়া আমি দেখেছি। যে মানুষটির কাছে তিনি গানের প্রকৃত তালিম নিয়েছিলেন, যাঁর হাত ধরে সুরের জগতে রাজকন্যা হয়ে উঠেছিলেন, সেই মানুষটির শেষ জীবন সম্পর্কে তার এক নীরব বেদনা ছিল।
অবদানের স্বীকৃতি এলো ধীরে, অতিধীরে। ১৯৭৯ সালে পেলেন স্বাধীনতা পদক, পরে একুশে পদক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার দিল ‘বঙ্গ সম্মান’, ‘বঙ্গ বিভূষণ’ ও ‘মহাগুরু’ উপাধি। সত্যজিৎ রায় পুরস্কার, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র পুরস্কার, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট, জাপানের সিবিএস থেকে গোল্ড ডিস্ক—এ যেন সম্মানের বন্যা
তিনি বারবার বলতেন, ‘আমি আছি আর আছে আমার তানপুরা।’ বিত্তের পেছনে তিনি কখনো ছোটেননি, খ্যাতির বন্যায় ভেসে যাননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ প্রতি বছর একজন সুযোগ্য সংগীত শিল্পীকে ‘ফিরোজা বেগম স্বর্ণপদক’ প্রদান করে। কমল দাশগুপ্তের স্মৃতিরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বড় পুরস্কারের কথা জানা নেই, অথচ তার সৃষ্ট গানগুলোই তার সবচেয়ে বড় পুরস্কার। যে ‘আমি ভোরের যূথিকা’ আজও মুখে মুখে ফেরে, যে ‘এমনি বরষা ছিল সেদিন’ বর্ষামুখর দিনে ঠোঁটের কোণে সুর তোলে, সেই গানগুলোই বলে দেয় কমল দাশগুপ্ত কত বড় মাপের স্রষ্টা ছিলেন। আর ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে নজরুলের ‘শাওন রাতে যদি’ গানটি জাপানে দশ লক্ষ কপি বিক্রি হওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সুর ও কণ্ঠের এই মিলন কত গভীরভাবে মানুষের হৃদয় ছুঁতে পারে।
২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ফিরোজা বেগম ঢাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যেদিন তিনি চলে গেলেন, তার এক নিবিড় অনুরাগী ওস্তাদ বাবু রহমান বলেছিলেন, ‘নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে মনে হয়েছিল ফিরোজা বেগম তো আছেন; আর ফিরোজা বেগমের মৃত্যুর পরে মনে হচ্ছে এবার সত্যি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু হলো।’ সেদিন আমরা উপলব্ধি করেছিলাম, ফিরোজা বেগম কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি অধ্যায়, এক জীবন্ত নজরুলসংগীত। আর কমল দাশগুপ্তের কথা ভাবলে যে নীরব বিষাদ জাগে, তা যেন ‘কভু পাই কভু পাইনা’ গানের মতোই অধরা এক বেদনায় জড়িয়ে আছে। দুই শিল্পীর জন্মদিন একই দিনে হয়েছিল, কিন্তু তাদের স্মৃতি যেন দুই ভিন্ন আকাশে ভাসমান—একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় মহাতারকা, অন্যজন বিস্মৃতির আড়ালে ঢাকা পড়া সুরের জাদুকর।
আমরা যারা তাদের গান শুনে বেড়ে উঠেছি, যারা ফিরোজা বেগমের সুরে নিজেদের জীবনের সুর মেলানোর চেষ্টা করেছি, তাদের কাছে এই দুই শিল্পী কেবল ইতিহাসের অংশ নন, তারা আমাদের হৃদয়ের গভীরে জেগে থাকা এক আনন্দবসন্তের নাম। এই অগণিত শ্রদ্ধার কাননে নীরবে গান গেয়ে চলেছে ‘সাঁঝের তারকা’ আর ‘মোমের পুতুল’—একটি তারকা হয়ে কমল দাশগুপ্ত, অন্যটি পুতুল হয়ে ফিরোজা বেগম। বাংলা গানের আকাশে তাদের মতো দীপ্তিমান জুটি বড়ই দুর্লভ। তাদের স্মরণে আমাদের প্রণতি, শোকাহত হৃদয়ের ভালোবাসা।











