ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে টাকা চাইলেই তা যৌতুক নয় : হাইকোর্ট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিয়ের শর্ত হিসেবে কিংবা বিয়ে টিকিয়ে রাখার শর্তে নয়, শুধু ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি করলেই তা যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের যৌতুকের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করে এমন পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অভিযোগে দুই বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত রাসেল উদ্দিনকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
গত ৩ আগস্ট বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এক ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর করে এ রায় দেন। ১২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি গতকাল রবিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
রায়ে আদালত বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২(ঞ) ধারায় বিয়ের শর্ত হিসেবে বর, বরের বাবা-মা অথবা বরপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অন্য কোনো ব্যক্তির দাবি করা অর্থ, সামগ্রী বা সম্পত্তিকে যৌতুক বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান মামলার নথি ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দণ্ডিত আপিলকারী রাসেল উদ্দিন তার স্ত্রীর কাছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এক লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। এই দাবি আইনের ওই ধারায় বর্ণিত যৌতুকের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না।
আদালত আরও বলেন, আপিলকারী যৌতুক হিসেবে টাকা দাবি করেছিলেন, তা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া স্ত্রীকে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও সাক্ষ্যপ্রমাণে অসংগতি রয়েছে।
আদালতে রাসেল উদ্দিনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আলী রেজা মো. আমির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনজুরুল আলম (সুজন)।
আইনজীবী আলী রেজা মো. আমির সাংবাদিকদের বলেন, ‘কনেপক্ষের কাছে শুধু ব্যবসার জন্য টাকা দাবি করলেই তা যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না বলে রায়ে বলা হয়েছে। তখনই যৌতুক হবে, যদি বিয়ের সময় অথবা সংসারজীবন চলাকালে টাকা দাবি করা হয় এবং ওই অর্থ না দিলে ডিভোর্স দেওয়া হবে কিংবা সংসার চালিয়ে নেওয়া হবে না, এমন শর্ত দেওয়া হয়। শর্ত ছাড়া ব্যবসা, বিদেশে যাওয়া কিংবা গাড়ি কেনার জন্য টাকা চাওয়া হলে তা যৌতুকের সংজ্ঞায় আসে না।’
মামলার বিবরণে জানা যায়, মুসলিম আইন অনুযায়ী ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মো. রাসেল উদ্দিনের সঙ্গে ইসমত আরা বেগমের বিয়ে হয়। স্ত্রীর অভিযোগ, বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে তার কাছে যৌতুক দাবি করেন স্বামী। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ব্যবসার জন্য এক লাখ টাকা চান রাসেল। স্ত্রী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে কাঠের লাঠি দিয়ে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়।
এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারায় মামলা করেন ইসমত আরা বেগম। কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার শেষে ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর রায় দেন। রায়ে রাসেল উদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও চার মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আপিল করেন রাসেল।
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, অভিযোগকারী স্ত্রীর জবানবন্দি এবং কয়েকজন প্রসিকিউশন সাক্ষীর বক্তব্যে ব্যবসার জন্য এক লাখ টাকা দাবির কথা উঠে এসেছে। তবে ওই অর্থ যৌতুক হিসেবে দাবি করা হয়েছিল, তা রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি।
এ ছাড়া কথিত আঘাতের স্থান সম্পর্কে স্ত্রীর মৌখিক সাক্ষ্য, চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও চিকিৎসা সনদের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেছে। আদালতের মতে, এসব অসংগতি শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ এবং রাষ্ট্রপক্ষের মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর সন্দেহ তৈরি করে। রাসেল অপরাধে জড়িত ছিলেন কি না, তা নির্ভরযোগ্য ও অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে ট্রাইব্যুনাল সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এসব বিবেচনায় আপিল মঞ্জুর করে রাসেল উদ্দিনকে খালাস দেন হাইকোর্ট।




