বিপদের ওপর আইনজীবী বদলে নতুন বিপদ
- ৭ বছরে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে ৩৪৭৯ অভিযোগ

আদালতের বারান্দায় মানুষ আসেন আশার আলো খুঁজতে। চরম সংকটে আইনজীবীই হন তাদের শেষ ভরসা। তাকে ঘিরেই সমাধান খুঁজতে থাকেন বিপদে পড়া মানুষরা। কিন্তু বিপদ থেকে উদ্ধার হতে গিয়ে আরেক বিপদে পড়ছেন অনেকেই। মামলা পরিচালনায় অসন্তুষ্ট হয়ে আইনজীবী পরিবর্তন করতে গেলেই বাধছে যত বিপত্তি। চাইলেই মিলছে না অনাপত্তিপত্র (এনওসি)। উল্টো মক্কেলদের জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা দাবির অভিযোগ উঠছে। ন্যায়বিচার পেতে এসে বিচার প্রার্থীরা পড়ছেন নতুন ফাঁদে।
আইনজীবীর ভরসার হাতটিই যখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের আর যাওয়ার জায়গা থাকে না। অনাপত্তিপত্র না পেয়ে সাত বছরে আইনজীবীদের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার অভিযোগ জমা দিয়েছেন বিচার প্রার্থীরা। এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে তা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা আইনজীবী সমিতি। যদিও মক্কেলের আইনজীবী পরিবর্তনের অধিকার আইনত স্বীকৃত। কিন্তু বাস্তবে এই অধিকার প্রয়োগ করা বেশ কঠিন।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ইশরাত হাসান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বিচার প্রার্থীরা আইনজীবী পরিবর্তন করতে গেলে অনাপত্তিপত্র না পাওয়ার কারণে প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়েন। এতে মামলার অগ্রগতি থেমে যায়, শুনানি বিলম্বিত হয় এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণা হয় ক্ষুণ্ণ। যদিও বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ এবং পেশাগত আচরণবিধি অনুযায়ী মক্কেলের আইনজীবী পরিবর্তনের অধিকার স্বীকৃত। তবে বাস্তবে এই অধিকার প্রয়োগ সহজ নয়।’
এনওসি না মেলার নেপথ্যের কয়েকটি কারণ তুলে ধরলেন ইশরাত হাসান। তিনি বললেন, ‘প্রথমত, আর্থিক বিরোধ একটি বড় কারণ। আইনজীবীরা প্রাপ্য ফি না পাওয়ার অভিযোগে এনওসি দিতে গড়িমসি করেন। দ্বিতীয়ত, পেশাগত সম্পর্কের অবনতি অনেক সময় বিষয়টিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে যায়। তৃতীয়ত, বার কাউন্সিলে অভিযোগ করলেও দ্রুত প্রতিকার না পাওয়ায় সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হয়। এজন্য মক্কেলের সঙ্গে লিখিত ফি বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে এনওসি দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং বার কাউন্সিলের তদারকি থাকতে হবে।’
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মো. আব্দুল করিম চৌধুরী সন্তানের মামলার অগ্রগতির জন্য নিযুক্ত করেছিলেন আইনজীবী মো. রেজাউল করিমকে। যদিও চাহিদামতো টাকা দিয়ে দীর্ঘদিন পরও মামলার হয়নি কোনো অগ্রগতি। ব্যর্থতার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও এনওসি চাইলে আইনজীবী তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
হাজারীবাগ থানার একটি মামলায় কারাবন্দি মশিউর রহমানের স্ত্রী শাবানা খাতুন এক সপ্তাহের মধ্যে জামিনের আশায় সাড়ে ১৬ হাজার টাকা তুলে দিয়েছিলেন আইনজীবী মো. আব্দুল ওয়ারেছ আকন্দের হাতে। তিনি মামলা গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে জামিন করে দিতে প্রতিশ্রুতি দেন। এই বাবদ সাড়ে ১৬ হাজার টাকা গ্রহণ করলেও গত ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত জামিন হয়নি মশিউরের। অসন্তুষ্ট হয়ে ওই আইনজীবীর কাছে অনাপত্তিপত্র চাইলে শাবানা খাতুনের কাছে অতিরিক্ত ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
অনুরূপ অভিজ্ঞতা কহিনুর বেগমেরও। কারাবন্দি স্বামী লালন ফকিরের জামিনের জন্য আইনজীবী মো. মোর্শেদ মোল্লাকে নিযুক্ত করেন কহিনুর। জামিনের জন্য ঈদের আগে সাড়ে ৫ হাজার টাকা দেন। কাজ না হওয়ায় এনওসি চাইলে তাকেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়।



