দেশ ছাড়তে গোপনে পাসপোর্ট জোগাড়ের চেষ্টা করেন শিরীন শারমিন

ডিবি কার্যালয় থেকে আদালতের পথে শিরীন শারমিন। ছবি: আগামীর সময়। ইনসেটে শিরীন শারমিন
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ২৭ দিনের মাথায় ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর স্পিকারের পদ ছেড়েছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। বিগত অন্তর্বতী সরকার তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করে দিলে সাধারণ নাগরিক হিসেবে গোপনে পাসপোর্ট বানিয়ে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক এই স্পিকার। স্বামী সৈয়দ ইশতিয়াক হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকার আগারগাঁওয়ে পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। পরবর্তীতে ১০ অক্টোবর তাদের আঙুলের ছাপ ও আইরিশ ছবি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠে, বাড়িতে বসেই তারা আঙুলের ছাপ ও আইরিশ দিয়েছেন। পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের বাসায় ডেকে এনে পাসপোর্টের কাজ সেরে ফেলতে চেয়েছিলেন, যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারেন। পরবর্তীতে সেটা ফাঁস হলে তার এই চেষ্টা বিফলে যায়।
বাংলাদেশের প্রথম সাবেক নারী এবং সর্বকনিষ্ঠ স্পীকার ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। রাজনৈতিক জীবনে সর্বপ্রথম ২০০৯ সালে তিনি সংরক্ষিত নারী আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি নবম জাতীয় সংসদের স্পীকার নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে টানা দশম, একাদশ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদে তিনি স্পীকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যদিও এমন অনেকেই ছিলেন যারা টানা চারবার বা পাঁচবারের সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু তারা স্পিকারের পদে তখন আসতে পারেননি। যে কারণে তাকে অনেকের রোষানলে পড়তে হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে প্রাণহানির মামলায় আজ মঙ্গলবার গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে শিরীন শারমিনকে। এর আগে ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে নেওয়া হয় মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে। সেখানে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরদিনই সংসদ ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ ভেঙে দেওয়া হলেও স্পিকারের পদ তাৎক্ষণিভাবে শূন্য হয় না। পরবর্তী স্পিকারের শপথ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থেকে যান। তবে সেই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা না করে ২৭ দিনের মাথায় ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন শিরীন শারমিন।
ওই বছর নভেম্বরে পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের এক বার্তায় বলা হয়, শিরীন শারমিন চৌধুরী ‘সাধারণ পাসপোর্টের’ জন্য যে আবেদন করেছেন তার কার্যক্রম মামলার কারণে ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে। তার কূটনৈতিক পাসপোর্টটি অন্যান্যদের কূটনৈতিক পাসপোর্টের মত আগেই বাতিল করা হয়েছে এবং তাকে নতুন কোনো পাসপোর্ট দেওয়া হয়নি।
চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের সময় আবার শিরীন শারমিনের অনুপস্থিতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে এবারও তিনি সামনে আসেননি। নতুন এমপিদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসাবে জাতীয় সংসদে আসেন শিরীন। তাকে দেওয়া হয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব।
নবম সংসদের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেই জায়গায় আসেন তখনকার স্পিকার আবদুল হামিদ। এরপর ২০১৩ সালে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন। তারপর থেকে তিন মেয়াদে তিনিই টানা স্পিকারের চেয়ারে ছিলেন।
শিরীন শারমিন ও তার স্বামী ইশতিয়াক হোসাইনের পাসপোর্টের আবেদনে স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছিল রাজধানীর ধানমণ্ডির ১৬ নম্বর সড়কের একটি বাসার ৪-ই ফ্ল্যাট। মায়ের উত্তরাধিকার সূত্রে এই বাড়ির মালিক সাবেক স্পিকার শিরীন।
সাবেক এ স্পিকার ও তার স্বামীর পাসপোর্টের আবেদন নিয়ে তখন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। তারা কি সত্যিই অসুস্থ? নাকি কোনো বিশেষ শক্তি বা গোষ্ঠী সুবিধা নিয়ে অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পাসপোর্ট পেতে তাদের সহায়তা করছে?- এমন বহু আলাপ তখন ভাসছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।















