ক্যামেরার মোড়ে সভ্য চালক, সাধারণ মোড়ে অবাধ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ঢাকার রাস্তায় চিরচেনা রূপে চলছে যান। দুপুরের গুলিস্তান-পল্টনের যানজটের ধকল সামলে মৎস্য ভবন মোড়ের রাস্তা ধরে মিরপুরগামী বেপরোয়া গতির বিহঙ্গ পরিবহনের লোকাল বাস। পাশাপাশি ছুটছিল বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলও। মৎস্য ভবন মোড়ে পৌঁছাতেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট।
হাত উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে নেই ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্য বা সার্জেন্ট, কিন্তু সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলে উঠতেই বাসের চালক স্ব-উদ্যোগে কষে চাপলেন ব্রেক। তার দেখাদেখি পেছনেই থাকা মোটরসাইকেলগুলোর চালকরাও একদম মেপে মেপে জেব্রা ক্রসিংয়ের বেশ পেছনে গাড়ি থামিয়ে সুশৃঙ্খলভাবে গুনতে থাকলেন অপেক্ষার প্রহর। চালকদের শরীরী ভাষায় অদৃশ্য এক সমীহ আর আইনি ভয়।
আপাত ‘ভদ্র’ ও ‘সুশৃঙ্খল’ এই চালকদের রূপ বদলে যেতে সময় লাগল না ঠিক দুই মিনিটও। মৎস্য ভবন পার হয়ে গাড়িগুলো শাহবাগ মোড় পৌঁছাতেই, ডিজিটাল নজরদারি না থাকার সুযোগ নিয়ে মুহূর্তেই লেন ভেঙে ফেললেন লোকাল বাসের চালক। অন্য গাড়িকে পাশ কাটিয়ে, মাঝরাস্তায় আড়াআড়িভাবে বাস থামিয়ে হুড়মুড় করে তুলতে শুরু করলেন যাত্রী। একই ধরনের আচরণ মোটরসাইকেল চালকদেরও।
ট্রাফিক সিগন্যাল না মেনে জটলা পাকিয়ে তারা ভুস করে চলে গেলেন ফুটপাত ঘেঁষে। অথচ মিনিট দুয়েক এগোনোর পর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে আসতে না আসতেই চালকদের মধ্যে ফিরল মৎস্য ভবন মোড়ের সেই শরীরী ভাষা। বাস বা মোটরসাইকেল হোক, সব চালকই হয়ে গেলেন আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও একান্ত বাধ্যগত। এ চিত্র গত শনিবারের।
একই চালক, একই যান, অথচ মাত্র কয়েকশ মিটারের ব্যবধানে দুটি ভিন্ন স্টপেজে (মোড়) তাদের আচরণে তফাত আকাশপাতাল। আগের স্টপেজে যিনি ছিলেন শতভাগ আইন মানা আদর্শ নাগরিক, পরের স্টপেজেই তিনি হয়ে উঠলেন আইন অমান্যকারী এক অবাধ্য চালক।
রাজধানী ঢাকার বুকে চালকদের এমন দ্বিমুখী আচরণের পেছনে কাজ করছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নতুন বসানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি।
যেখানে সচল এআই ক্যামেরা, সেখানে চালকরা মামলার ভয়ে পরম বাধ্যগত। আর মাঝের যে অংশে বা স্টপেজে নেই ক্যামেরা, সেখানে তারা আগের মতোই বিশৃঙ্খল ও বেপরোয়া।
পল্টন থেকে বাংলামোটর, দূরত্ব মাত্র আড়াই কিলোমিটার। মাত্র মিনিট পনেরোর এই রাস্তায় পরিবহন চালকদের রূপের পরিবর্তন হয় চারবার। স্টপেজগুলোয় এআইযুক্ত ক্যামেরা দেখলেই এক রূপ, আর সনাতনীতে ভিন্ন রূপ। পল্টন থেকে বাংলামোটর যেতে রাস্তায় প্রধান স্টপেজ পড়ে চারটি।
এর মধ্যে দুটি স্টপেজে এনালগ ট্রাফিক ব্যবস্থা, অন্য দুটি ডিজিটাল এআই প্রযুক্তির আওতায়। পালাক্রমে চালকদের পাড়ি দিতে হয় দুই পদ্ধতির স্টপেজই। পল্টন স্টপেজে এখনো এনালগ ট্রাফিক ব্যবস্থা। এরপরের স্টপেজ মৎস ভবনেই মাথার ঝুলছে এআই ক্যামেরা। এই স্টপেজ পার হয়ে মিনিট দুয়েক এগুলেই শাহবাগ মোড়। সেখানে ফের এনালগ ট্রাফিক ব্যবস্থা। তার পরের গন্তব্য বাংলামোটর স্টপেজ মৎস ভবনের মতোই রয়েছে এআই ক্যামেরার নজরদারিতে।
গত ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীতে এ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। সনাতন বা ম্যানুয়াল পদ্ধতির পরিবর্তে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীর অত্যন্ত ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সিগন্যাল পয়েন্টকে আনা হয়েছে এআই প্রযুক্তির আওতায়। পরীক্ষামূলক প্রয়োগেই মিলেছে ইতিবাচক ফল। যে কারণে প্রথম পর্যায়ে ঢাকার ১২০টি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারসেকশনকে এ প্রযুক্তির আওতায় আনার চলছে পরিকল্পনা।
যেভাবে হয় স্বয়ংক্রিয় মামলা
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য বলছে, সড়কগুলোতে বসানো উচ্চক্ষমতার পিটিজেড (প্যান-টিল্ট-জুম) ও বিশেষ এআই লেন্সযুক্ত ক্যামেরাগুলো সার্বক্ষণিক স্ক্যান করে যানবাহনের গতিবিধি। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন অমান্য করলে সফটওয়্যারে পূর্বনির্ধারিত ভার্চুয়াল লাইন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে ওঠে সক্রিয়। আইন লঙ্ঘনের সঙ্গে সঙ্গে এআই সিস্টেম ব্যাক-এন্ডে ন্যূনতম ২৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ ও স্থিরচিত্র প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করে তা পাঠিয়ে দেয় কেন্দ্রীয় সার্ভারে। সেখানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয় ডিজিটাল মামলার কাগজ বা প্রসিকিউশন কেস। এরপর বিআরটিএর ডেটাবেজ থেকে মালিকের নিবন্ধিত মোবাইল ফোন নাম্বারে চলে যায় সংক্ষিপ্ত বার্তা (এসএমএস)। যাতে থাকা লিংকে ক্লিক করে চালক নিজেই দেখতে পারেন নিজের অপরাধের ভিডিওচিত্র।
স্টপেজভেদে চালকদের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে আগামীর সময়ের কথা হলো কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. শহীদুলের সঙ্গে। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘এআই প্রযুক্তি আসায় আমাদের মাঠপর্যায়ের খাটুনি অনেক কমেছে, বিশেষ করে যেসব মোড়ে এআই ক্যামেরা আছে সেখানে চালকরা এখন ট্রাফিক পুলিশ না দেখলেও মানছে আইন। চালকরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলা মোটর কিংবা কারওয়ান বাজার মোড় পার হন একদম সুবোধ ছেলের মতো, কিন্তু ক্যামেরা না থাকা স্টপেজগুলোতে শুরু করেন ওভারটেক আর উল্টো পথে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। পুরো ঢাকা শহর এই ক্যামেরার আওতায় না এলে চালকদের ফাঁকি দেওয়ার এমন মানসিকতা দূর করা কঠিন।’
একই দিন বাংলা মোটর মোড়ের সিগন্যালে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী কামরুল হাসান। আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে তুলে ধরলেন কয়েক দিন আগেই স্বয়ংক্রিয় মামলায় পড়ার দৃশ্যপট। কামরুল বলছিলেন, ‘গত সপ্তাহে আমার মোবাইলে একটা মেসেজ আসে। লিংকে ক্লিক করে দেখি কারওয়ান বাজার মোড়ে জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর চাকা উঠে যাওয়ার কারণে আমার নামে স্বয়ংক্রিয় মামলা হয়েছে। এরপর থেকে যেখানেই এআই ক্যামেরা দেখি, ভয়ে একদম সতর্ক হয়ে যাই। তবে হ্যাঁ, অফিস টাইমে যখন তাড়াহুড়ো থাকে এবং দেখি রাস্তায় কোনো ক্যামেরা নেই, তখন মাঝেমধ্যে লেনের বাইরে চলে যাই। কারণ ওখানে তো ধরার কেউ নেই।’
কথা হয় নাম প্রকাশে অনাগ্রহী লোকাল বাসের এক চালকের সঙ্গে। জানালেন, মালিকপক্ষ থেকে বলা হয়েছে এআই প্রযুক্তিতে মামলা হলে জরিমানার সেই টাকা দিতে হবে চালকদের। তাই এখন আর সিগন্যাল অমান্য করার সাহস পান না তেমন একটা। কিন্তু যেখানে ক্যামেরা নেই, সেখানে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা ও ট্রিপের তাড়ায় আইন ভাঙছেন অনেকেই।
সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা ডিএমপির এই ডিজিটাল রূপান্তরকে যুগোপযোগী উল্লেখ করে সাধুবাদ জানালেও তুলে ধরেছেন বাস্তবসম্মত কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও। তারা বলছেন, ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা মিশ্র—যেখানে রিকশা, লেগুনা ও অটোরিকশার মতো ধীরগতির যানবাহনের রয়েছে আধিক্য। যাদের নেই কোনো ডিজিটাল ডেটাবেজ, সেখানে এআইর শতভাগ সুফল পাওয়া কঠিন। সুনাগরিকদের ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থায় আইন মানা যেমন দায়িত্ব, তেমনি ম্যানুয়ালি ব্যবস্থায় মানাও।
যে আইন অমান্য করলে মামলা
এআই ক্যামেরা মূলত লাল বাতি বা সিগন্যাল অমান্য করে গাড়ি চালিয়ে যাওয়া, সিগন্যালে দাঁড়ানোর সময় পথচারী পারাপারের দাগ বা জেব্রা ক্রসিংয়ের সীমানা অতিক্রম করা, সড়কের নির্ধারিত লেনের বিপরীতে সম্পূর্ণ উল্টো পথে গাড়ি চালানো, মোটরসাইকেল চালক বা আরোহীর মাথায় হেলমেট না থাকা এবং নির্ধারিত বাস স্টপেজ ছাড়া মূল সড়কে গাড়ি থামিয়ে বা বামদিকের ফ্রি-লেন বন্ধ করে অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধগুলো শনাক্ত করছে নিখুঁতভাবে। এমনকি চালক বা সহযাত্রীর সিট বেল্ট বাঁধা আছে কি না এবং মোটরসাইকেলে অতিরিক্ত যাত্রী বা ‘ট্রিপল রাইডিং’ হচ্ছে কি না, তাও এই ক্যামেরার লেন্স এড়াতে পারছে না।






