সন্ধ্যা নামলেই গ্যাংয়ের মহড়া, মোহাম্মদপুর ছাড়ছে মানুষ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজধানীর মোহাম্মদপুর যেন অপরাধজগতের বিশাল সাম্রাজ্য। প্রকাশ্যে কুপিয়ে, গুলি করে হত্যা থেকে শুরু করে দেহ থেকে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করার মতো নৃশংস ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। ঢাকার মতো শহরের বুকে ভয়ানকজগৎ। সন্ধ্যা নামলেই চলে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায় না সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। অনেকে আতঙ্ক নিয়েই ছাড়ছেন এই এলাকা। কিংবা বাসা ভাড়া নিতেও চান না সহজে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে শুধু র্যাবের হাতেই প্রায় দেড় হাজার অপরাধী ধরা পড়েছে
সামাজিকমাধ্যমে মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রতিবাদ হয়। সমালোচনাও বাদ যায় না। কিন্তু অপরাধের মাত্রা কমছে না কিছুতেই। এর জন্য পুলিশের দুর্বলতাকেই দায় দিচ্ছেন মোহাম্মদপুরবাসী। প্রকাশ্যে এমন বর্বরতা দেখার পরেও পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি করছে? এমন প্রশ্ন বরাবরই আসে। তবে পুলিশের যুক্তি, ঘনবসতি এলাকায় অপরাধ দমন করতে বেগ পোহাতে হয়, আক্রমণের শিকারও হচ্ছেন তারা। প্রতিদিন অভিযান, গ্রেপ্তার করেও কমছে না অপরাধ। কখনো কখনো আশপাশের অন্য থানার ঘটনাও মোহাম্মদপুর থানা এলাকার বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, দাবি পুলিশের।
মোহাম্মদপুরের তালিকাভুক্ত কিশোর গ্যাং ১৬টি। তবে স্থানীয়দের মতে, এখানে রয়েছে অর্ধশত কিশোর গ্যাং, যাদের বেশিরভাগের ব্যাপারেই তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে
কিন্তু অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু বিদ্যমান আইনে খুব সহজেই পাচ্ছে জামিন। একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে ফের। খাটাচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাব। তাদের পরামর্শ, এসব প্রভাব পাশ কাটিয়ে অপরাধীকে শুধু অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে। এ বিবেচনায় গ্রেপ্তার করতে হবে।
২৩ জুলাই মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ে পুলিশের এক এসআইকে ছুরি মেরে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ছুরির আঘাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে কর্মরত পুলিশ সদস্য ওসমান গনির পিঠে ৪৩টি সেলাই দেওয়া হয়। এর আগে রায়েরবাজার ইটখোলা এলাকায় বাসা থেকে ডেকে নিয়ে আসাদুল নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। শুধু পুলিশ বা সাধারণ মানুষই নয়, কিশোর গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সংঘর্ষও ঘটে প্রতিনিয়ত।
মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার, চন্দ্রিমা, বসিলা, মডেল টাউন, ঢাকা উদ্যানে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে
এলাকাবাসীর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়ছেন তারা। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে, পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে এসে হামলা করছে অভিযোগকারীদের ওপর।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুরে ছোট থেকে বড় সবাই গ্যাংয়ের সদস্য। কিশোর, তরুণ ও যুবকরা বুঝে ওঠার আগেই জড়িয়ে পড়ে মাদক কারবারে। সহজেই তাদের হাতে চলে আসে দেশীয় অস্ত্র। এসব কারণে ‘ক্রাইম হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে মোহাম্মদপুর। অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হওয়ায় অনেকে মোহাম্মদপুর ছেড়ে চলেও যাচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিবেদনে মোহাম্মদপুর থানাকেন্দ্রিক মাত্র ১৬টি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, বাস্তবে এর সংখ্যা অর্ধশত। এর বাইরেও মোহাম্মদপুরের মধ্যাংশের প্রতিটি গলিতেই আছে শিশু-কিশোরদের একাধিক গ্যাং।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ছাড়াও তিন রাস্তার মোড় থেকে রায়েরবাজার, বসিলা ৪০ ফুট, পুলপাড় বটতলা, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, নবোদয় হাউজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, স্লুুইসগেট এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বেশি। বিশেষ করে পাটালি গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, লারা দে গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ডায়মন্ড ও দে ধাক্কা গ্রুপগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্কের নাম।
গ্যাংস অব মোহাম্মদপুর
২৬ জুলাই ২০২৬
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য আগামীর সময়কে জানান, মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার, চন্দ্রিমা, বসিলা, মডেল টাউন, ঢাকা উদ্যানে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে। ছোট বা বড় যেকোনো ইস্যুতেই এই এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া হয়। এসব গ্যাংয়ের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক নেতা ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।
ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান ছাড়াও তিন রাস্তার মোড় থেকে রায়েরবাজার, বসিলা ৪০ ফুট, পুলপাড় বটতলা, বসিলা গার্ডেন সিটি, একতা হাউজিং, নবোদয় হাউজিং, বোটঘাট, সাদেক খান রোড, স্লুুইসগেট এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বেশি
মোহাম্মদপুরের অপরাধ দমনে পুলিশের জনবল সংকটকে বড় কারণ হিসেবে দেখছে পুলিশ। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার (মোহাম্মদপুর জোন) জুয়েল রানা আগামীর সময়কে বললেন, ‘এখানে যেমন ঘনবসতি, কম আয়ের মানুষের বসবাস— সেরকম একটা শহরে কমসংখ্যক পুলিশ দিয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করা কষ্টসাধ্য। তবে পুলিশের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই।’
মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণ হওয়ার পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতা ও অদক্ষতা দায়ী বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তার মতে, ‘এখানকার বিহারিদের দিয়ে বিভিন্ন অপরাধ করানো, কম খরচে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বসবাসের মতো বিষয়গুলো বেশি অপরাধপ্রবণ হওয়ার জন্য দায়ী।’ এ ছাড়াও অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা নিজেরাই তাদের আশ্রয়দাতা হয়ে ওঠে বলে মত এই বিশেষজ্ঞের।
মোহাম্মদপুরের তালিকাভুক্ত কিশোর গ্যাং ১৬টি। তবে স্থানীয়দের মতে, এখানে রয়েছে অর্ধশত কিশোর গ্যাং, যাদের বেশিরভাগের ব্যাপারেই তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। জনবল সংকট ও নানা প্রতিবন্ধকতায় অপরাধ দমনে অসহায় পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, অপরাধ ঘটলে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে অপরাধী দলগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব–সংঘাতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গত প্রায় ২০ মাসে খুন হন ২৪ জন।
ভৌগোলিকভাবে পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল—এই তিন ভাগে মোহাম্মদপুরকে ভাগ করা যায়। পূর্বাঞ্চলটির পূর্বের অংশটি মিরপুর রোডের পশ্চিম পাশ থেকে আসাদ গেট হয়ে শ্যামলী পর্যন্ত বিস্তৃত। পশ্চিম দিকে এই অংশের বিস্তৃতি রিং রোড পর্যন্ত। এ অংশেই দেশের সবচেয়ে বড় জেনেভা ক্যাম্পের অবস্থান। স্থানীয়ভাবে রিং রোডের পশ্চিমাংশকে মধ্যাঞ্চল ধরা হয়, যা বেড়িবাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত। আর পশ্চিমাঞ্চল ধরা হয় বেড়িবাঁধের পশ্চিম অংশ, যা বুড়িগঙ্গা নদীর তীর পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধপ্রবণতা বেশি মূলত জেনেভা ক্যাম্প এলাকা, মধ্যঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে। এসব এলাকায় নিম্ন আয় ও ভাসমান মানুষের বসবাস বেশি।
রাজধানীর ৫০ থানাকে আটটি অপরাধ বিভাগে ভাগ করে কাজ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ। পুলিশের ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তেজগাঁও বিভাগে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ ও মাদকের মামলা সবচেয়ে বেশি। তেজগাঁও বিভাগের অধীনেই পড়েছে মোহাম্মদপুর। মোহাম্মদপুরের অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠার পেছনে আরও দুটি কারণ উল্লেখ করেন পুলিশ ও র্যাবের কর্মকর্তারা। একটি হলো আবাসন ব্যবসার প্রসার ও ‘জেনেভা ক্যাম্প’। মোহাম্মদপুরে ছোট–বড় ৯৭টি আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই ব্যবসার ‘কাঁচা টাকা’ ধরতে অপরাধী দলগুলো সক্রিয়।
পাটালি গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, লারা দে গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ডায়মন্ড ও দে ধাক্কা গ্রুপগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্কের নাম
সম্প্রতি র্যাব এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে শুধু র্যাবের হাতেই প্রায় দেড় হাজার অপরাধী ধরা পড়েছে। তাদের অনেকে পরবর্তী সময়ে জামিন পেয়ে আবারও অপরাধে জড়াচ্ছে।
মোহাম্মদপুরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবার বসিলায় একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ ক্যাম্প থেকে ২৪ ঘণ্টা টহল, ব্লক রেইড ও চেকপোস্ট পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধ দমনের আশা করছে পুলিশ। ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের সেকেন্ড ইন কমান্ড মো. ফজলুল করিম বললেন, ‘বসিলায় অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনে ৪০ জন সদস্য এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ৬৬ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এখানে আলাদা জনবল ও গাড়ি বরাদ্দ রয়েছে। আমরা আশা করছি, এলাকার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব।’






