লঞ্চ ডুবে ৩৪ জনের মৃত্যু, ৬ বছরেও শেষ হয়নি বিচার

ছয় বছর আগে বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ডুবে যায় মর্নিং বার্ড লঞ্চ। প্রাণ হারান ৩৪ জন যাত্রী। ভয়াবহ ওই ঘটনার পরদিন, ২০২০ সালের ৩০ জুন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় করা হয় একটি মামলা। তদন্ত শেষে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিকসহ ১১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে দেওয়া হয় অভিযোগপত্র এবং তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক বিচার। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরোলেও এখনো শেষ হয়নি মামলার বিচার। তবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের এক ধাপ পেরোলেই শেষ হবে মামলার বিচার কার্যক্রম।
এ বিষয়ে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। আমরা সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণে সক্ষম হয়েছি। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা প্রার্থনা করব। আশা করছি, ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।’
অন্যদিকে, ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদের আইনজীবী সুলতান নাসেরের ভাষ্য, ‘এ মামলার কোনো সাক্ষী বলতে পারেননি, কোন লঞ্চটি কাকে ধাক্কা দিয়েছিল। তারা শুধু লঞ্চ ডুবতে দেখেছেন। তাই আমরা প্রত্যাশা করছি, আসামিরা খালাস পাবেন।’
বর্তমানে মামলাটি ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। এ মামলায় ৫১ জন সাক্ষীর মধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে ৩৬ জনের সাক্ষ্য। পরে আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে চেয়েছেন ন্যায়বিচার। আগামী ৬ জুলাই ধার্য রয়েছে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন। এরপর রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করবেন আদালত।
মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ২৯ জুন মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে মর্নিং বার্ড নামের একটি লঞ্চ। সদরঘাটে পৌঁছানোর আগেই লঞ্চটি ডুবে যায় চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ নামের লঞ্চের ধাক্কায়। দুর্ঘটনায় মর্নিং বার্ডের ৩৪ জন যাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পরদিন, ৩০ জুন রাতে নৌপুলিশের সদরঘাট থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ শামসুল বাদী হয়ে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেন।
মামলাটি তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ১১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন সদরঘাট নৌথানার উপপরিদর্শক শহিদুল আলম। পরে ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন। ওই আদালতেই শেষ হয় সাক্ষ্য গ্রহণ। পরে সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায় থেকে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মামলাটি বদলি করা হয় ঢাকার পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে।
এ মামলার আসামিরা হলেন— ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদ, মাস্টার আবুল বাশার মোল্লা, সহকারী মাস্টার জাকির হোসেন, চালক শিপন হাওলাদার, শাকিল হোসেন, সুকানি নাসির হোসেন মৃধা, গ্রিজার হৃদয় হাওলাদার, সুপারভাইজার আব্দুস সালাম, সেলিম হোসেন হিরা, আবু সাঈদ ও দেলোয়ার হোসেন সরকার। আসামিরা সবাই বর্তমানে হাইকোর্ট থেকে জামিনে রয়েছেন।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কিছু কমোড ও অন্যান্য মালামাল দ্রুত নামানোর জন্য লঞ্চের মাস্টার, সুকানি, চালক ও গ্রিজারদের নির্দেশ দেন ময়ূর কোম্পানির ম্যানেজার, সুপারভাইজার, মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা বোগদাদিয়া ডকইয়ার্ড থেকে তড়িঘড়ি করে লঞ্চ নিয়ে রওনা হন টার্মিনালের উদ্দেশে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবল না রেখে পরিচালনা করা হয় লঞ্চ। সার্ভে সনদ অনুযায়ী যাদের লঞ্চ পরিচালনার দায়িত্ব ছিল, তারা দায়িত্বে ছিলেন না। বরং মাস্টার ও সুকানির পরিবর্তে হেলপার দিয়ে লঞ্চ পরিচালনা করা হয়, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আসামি আবুল বাশার, জাকির, নাসির, শিপন, শাকিল ও হৃদয়ের নির্দেশনায় লঞ্চটি চালানো হচ্ছিল অতিরিক্ত গতিতে। যেখানে গতি কমানোর প্রয়োজন ছিল, সেখানে ফ্রন্ট গিয়ারে রেখে আরও বাড়ানো হয় বেপরোয়াভাবে গতি। তদন্তে এটিকেও উল্লেখ করা হয়েছে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ময়ূর কোম্পানির সার্বিক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন লঞ্চের মালিক মোসাদ্দেক হানিফ ছোয়াদ, ম্যানেজার দেলোয়ার হোসেন, সুপারভাইজার আবু সাঈদ, সেলিম হোসেন ও আব্দুস সালাম। তাদের ভুল দিকনির্দেশনা ও অবহেলার কারণেই এ দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে ৩৪ জন নিরীহ যাত্রীর।
মর্নিং বার্ড লঞ্চের মাস্টার ও সুকানিরা বারবার সংকেত দিলেও ময়ূর-২ লঞ্চের চালনাকারীরা দ্রুত ঘাটে পৌঁছানোর উদ্দেশে সেটিকে অতিক্রমের চেষ্টা করেন। এর ফলে দুটি লঞ্চের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই মর্নিং বার্ড পানিতে তলিয়ে যায়।





