পাতাল মেট্রোরেল থেকে চলে যেতে চায় জাপান

নানা কারণে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘ব্যয় পুনর্বিবেচনার’ নামে ফেলে রাখা কাজ এখনো শুরু করতে পারেনি বিএনপি সরকার। ৩০ জুনের মধ্যে জাপানের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি শেষ করার কথা ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে সময় বাড়ানোর প্রস্তাব জানানো হয়। কিন্তু প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সরকারকে পাল্টা চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরুর চুক্তি না হলে প্রতিষ্ঠানটি আর কাজ করবে না।
ঢাকার এই পাতাল মেট্রোরেল পরিচিত এমআরটি লাইন-১ নামে। মেট্রোর কাজ নিয়ে গত এক মাসের মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত চারটি বৈঠক হয়েছে সরকারের। এসব বৈঠকে মেট্রোর কাজের গতি বাড়াতে তাগিদ দেওয়া হয় জাপানের পক্ষ থেকে। গতকাল মঙ্গলবারও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে জাইকার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়। ঈদের আগে গত ২১ মে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতেও আলোচনা হয়েছে জাইকার সঙ্গে। কিন্তু কোনো সমাধান আসেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপানের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যদি কাজ থেকে সরে যায় তাহলে অর্থায়ন থেকেও সরে যেতে পারে দেশটি। সেক্ষেত্রে নতুন করে সরকারকে আবার আহ্বান করতে হবে দরপত্র, সঙ্গে নতুন করে খুঁজতে হবে অর্থায়নের উৎস। কেননা অন্য দেশের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান যদি কাজ করে সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই অর্থায়ন করবে না জাপান।
মেট্রোরেল ইস্যুতে জাইকার চাওয়া কী— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলছেন, ‘আমরা পজিটিভ মানসিকতা নিয়ে এগোচ্ছি। তবে তাদের কিছু দাবিদাওয়া আছে। তারা (জাইকা) কিছু কিছু জায়গায় ডলারের পুনর্মূল্যায়ন চাচ্ছে। দেরি হওয়ার কারণে কিছু জিনিস রি-শিডিউল করা যায় কি না। আমরা তাদের দাবিদাওয়া শুনেছি। ডলারের পুনর্মূল্যায়ন করলে ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।’
বর্তমান ঠিকাদারদের দিয়েই কাজ করানো গেলে ভালো হবে বলে মনে করছেন প্রতিমন্ত্রী। তার কথায়, ‘তাদের দিয়ে যদি না করাতে পারি, নতুন করে শিডিউল করে কাজ করতে গেলে ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এখন পর্যন্ত যে আটটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। বিগত রেটে (দরে) তাদের সেটি করতে হবে। নতুনগুলো নিয়ে তারা দেনদরবার করছে। দেখা যাক, এটি কোন পর্যায়ে পৌঁছায়।’
মেট্রো নির্মাণ ও পরিচালনাকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) গত ৫ মে এক চিঠির মাধ্যমে জাপানি ঠিকাদারকে মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ করে। সেই অনুরোধে সাড়া না দিয়ে গত সোমবার এক পাল্টা চিঠিতে জাপানের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান মেয়াদ আর বাড়াবে না বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ডিএমটিসিএলকে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বর্তমানে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তারা আর দরপত্রের বৈধতা এবং সিকিউরিটি মেয়াদ নবায়ন করবে না। একই সঙ্গে তারা জমা দেওয়া সিকিউরিটির ফেরত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করারও অনুরোধ জানায়। চিঠিতে আরও বলা হয়, টেন্ডার ডকুমেন্টের সংশ্লিষ্ট ধারার আলোকে জমা রাখা মূল বিড সিকিউরিটি ফেরত দিতে হবে। পাশাপাশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে একটি প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে, যাতে নিশ্চিত করা হবে যে বিড সিকিউরিটি ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং এ-সংক্রান্ত সব দায়দায়িত্ব থেকে জাপানের প্রতিষ্ঠানটি মুক্ত হয়েছে।
মূলত, সরকারি বা আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত বড় প্রকল্পের টেন্ডারে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের প্রস্তাব বহাল রাখার অঙ্গীকার করে। এই সময়কে বলা হয় ‘বিড ভ্যালিডিটি পিরিয়ড’। অন্যদিকে দরপত্রে অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা হিসেবে ‘ব্যাংক গ্যারান্টি’ বা আর্থিক নিরাপত্তা হিসেবে জমা রাখা অর্থকে বলা হয় ‘বিড সিকিউরিটি’।
গতকালের জাইকার সঙ্গে বৈঠকে আলোচনা নিয়ে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বৈঠকে উপস্থিত থাকা মেট্রোরেলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেননি।
যদিও বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বেশ কয়েকটি অংশের কাজ নিয়ে জাইকার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সরকার পক্ষ দরপত্র নিষ্পত্তি করার আগে ঠিকাদারদের সঙ্গে আবারও আলোচনা করতে চায়। বৈঠক শেষে ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসেন। সেখানে জাপানের ওই ঠিকাদারের চিঠির আইনগত দিক যাচাই করে দেখতে এক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। তখন বিস্তারিত জরিপ, নকশা এবং ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করা হয়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৯৩ একর জমিতে ডিপো নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাতাল মেট্রোরেলের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূলত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডিপো তৈরির উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় কাজের। কথা ছিল, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হবে। এরপর যাত্রী নিয়ে কাঞ্চন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ছুটবে এই মেট্রো ট্রেন।
বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বললেন, ‘শুধু ব্যয় কমানোর কথা বলে মেট্রোর কাজ এতদিন ধরে আটকে রাখা অন্যায় হয়েছিল। এতে ব্যয় কিন্তু কমানো যায়নি। উল্টো নানা কারণে আরও বেড়েছে। নতুন করে টেন্ডার করলে নির্মাণ ব্যয় আরও বাড়তে পারে। জাপানের সঙ্গে অর্থায়নের যে চুক্তি হয়েছিল তাতে উল্লেখ আছে যে, মূল কাজ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার পাবে জাপানি প্রতিষ্ঠান। সেই চুক্তি সংশোধন করা কঠিন। স্বাভাবিকভাবেই যে দেশ ঋণ দেয় তারা চায় তাদের দেশের প্রতিষ্ঠানই কাজটি করুক।’
রাজধানীর কাঞ্চন সেতু থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১.২৪ কিলোমিটার পথটি ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ নামে পরিচিত হবে। ২০২৬ সালে কাজ শেষ হলে প্রতিদিন প্রায় আট লাখ যাত্রী চলাচল করতে পারতেন। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা। দরপত্রে আরও ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে।




