সাইবার লিঞ্চিং
ভার্চুয়াল জগতের মব জাস্টিস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘মব জাস্টিস’ শব্দটি আমাদের জীবনে তুলনামূলক নতুন। যখন কোনো অভিযোগ বা সন্দেহের বশবর্তী হয়ে উন্মত্ত জনতা নিজের হাতে আইন তুলে নেয় এবং কোনো আইনিপ্রক্রিয়া ছাড়াই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়, তখন সেটিই হয় মব জাস্টিস। একই ঘটনা যখন বাস্তবের বদলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঘটে, তখন সেটি হয়ে যায় ‘সাইবার লিঞ্চিং’।
এক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এক হয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ফেসবুক, এক্স, ইউটিউবের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আক্রমণ চালায়। এর লক্ষ্য থাকে নেতিবাচক কমেন্ট বা ইমোজি ব্যবহারের মাধ্যমে কাউকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা, সামাজিকভাবে হেয় করা এবং অনেক ক্ষেত্রে তার পেশাগত বা ব্যক্তিগত জীবন ধ্বংস করে দেওয়া। এটি অনেক সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপরও করা হয়।
সাইবার লিঞ্চিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু ধাপ অনুসরণ করা হয়। প্রথমে কোনো ব্যক্তির মন্তব্য, ভুল কাজ বা অনেক সময় নিছক ভুল বোঝাবুঝি থেকে তাকে টার্গেট করা হয়। বেশিরভাগ সময় টার্গেট হন বিভিন্ন ক্ষেত্রের তারকারা। তার কোনো কনটেন্ট বা পোস্ট নেতিবাচক ক্যাপশন দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কিংবা তার পোস্টের নিচেই শুরু হয় গণআক্রমণ। হাজার হাজার মানুষ কমেন্ট বক্সে গালাগাল, হুমকি এবং কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে থাকেন। কখনো ভুক্তভোগীর ফোন নাম্বার, বাসার ঠিকানা বা কর্মস্থলের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেওয়া হয়। আবার দলবদ্ধভাবে ওই ব্যক্তির প্রোফাইলে রিপোর্ট করে বা রিপোর্ট বম্বিংয়ের মাধ্যমে করা হয় তার আইডি বন্ধ।
অনেক সময় ‘মব জাস্টিস’ পরিস্থিতি তৈরি করার আগে সাহায্য নেওয়া হয় সাইবার লিঞ্চিংয়ের। যেমন— আগে কাউকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এক ধরনের জনমত তৈরি করা হয়। এরপর তাকে ফেলা হয় মব জাস্টিসের মুখে। এতে আগে থেকেই মানুষের মাথায় নেতিবাচক বিষয় তৈরি হয়ে থাকায় কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তারা মব জাস্টিসকে সমর্থন করেন, অনেক সময় অংশও নেন। মব জাস্টিসের জন্য সমর্থন লাগে সাধারণত বিপুলসংখ্যক মানুষের। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট দিয়ে এই মানুষদের সমর্থন জোগাড় করা হয়।
যে বিষয় নিয়ে কারও ওপর মব জাস্টিস করা হবে, সেই ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কোনো একটি গুজব তথ্য অথবা পুরনো কোনো তথ্য বের করে। পরে সেই গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে দিয়ে সাধারণ মানুষকে সেই গুজবের সত্যতা প্রমাণ করানোর চেষ্টা করে। বিভিন্ন পোল, প্রশ্ন বা উসকানিমূলক পোস্টের মাধ্যমে গ্রুপের সদস্যদের মতামতের পালস বুঝে তৈরি করা হয় সমর্থন। একপর্যায়ে বড় একটি অংশের মানুষ বিশ্বাস করে ফেলে সে গুজবকে।
আবার কখনো যদি এমন হয় যে, কোনো ব্যক্তির ওপর মব জাস্টিস করা যাবে না; কিন্তু তাকে হয়রানি করতেই হবে— তখন নেওয়া হয় অন্য পন্থা। তখন সেই ব্যক্তির নামে শুরু হয় গুজব ছড়ানো, তার পোস্টের নিচে হুমকি দেওয়া। আর এক্ষেত্রে যেন সহজে আসল পরিচয় বের না করা যায়, সেজন্য ব্যবহার হয় বট অ্যাকাউন্ট।
সাইবার লিঞ্চিংয়ের প্রভাব
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনিতে অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই মৃত্যুর ঘটনাগুলোর পেছনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা সাইবার স্পেসে গুজব/মিথ্যা অপপ্রচার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জরিপ অনুযায়ী, সাইবার লিঞ্চিংয়ের কারণে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১৬৬।
কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই করা কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই ইন্টারনেট ব্যবহার করে এই সাইবার লিঞ্চিংয়ের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির জীবন নষ্ট হয়ে যায়। এটি ব্যক্তির জন্য যেমন মানসিক ট্রমার, তেমনি তার সামাজিক ও পেশাগত জীবনকেও ফেলে দেয় ঝুঁকির মুখে। হাজার হাজার মানুষের ঘৃণাবাচক মন্তব্য ও বুলিংয়ের শিকার হয়ে ভুক্তভোগী তীব্র বিষণ্ণতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, যা অনেক ক্ষেত্রে তাকে ঠেলে দেয় আত্মহত্যার মতো চরম পরিণতির দিকেও। এমনকি ঘটনার সত্যতা পরে ভিন্ন প্রমাণিত হলেও, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টে থেকে যাওয়া সেসব স্মৃতি তার সারা জীবনের দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সাইবার লিঞ্চিং মুহূর্তেই এই একটি প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডকে ঠেলে দিতে পারে ধ্বংসের মুখে। কেননা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গণঅনলাইন আক্রমণ শুরু হয়, সত্যিটা আর কেউ যাচাই করতে যায় না। গ্রাহক দ্রুত হারিয়ে ফেলে আস্থা। প্রায়ই দেখা যায়, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। সেই ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠান আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ পায় না। তার আগেই ব্যবসায় নামে ধস।
মানুষ ইন্টারনেটে এত নিষ্ঠুর আচরণ কেন করে, জানতে কথা হয় মনোবিজ্ঞানী ড. মো. মারুফুল হকের সঙ্গে। তিনি বিষয়টি বিস্তারিতভাবেই বুঝিয়ে বললেন। জানালেন, মানুষের মনের গঠনের তিনটি অংশ রয়েছে। এগুলো হলো ইড, ইগো এবং সুপারইগো। ইড হলো আমাদের মনের আদিম কামনা-বাসনা, ইগো মনকে সবসময় ভদ্র হয়ে চলতে বলে এবং সুপারইগো হলো মনকে ভারসাম্য হয়ে চলতে বলে। মানুষ যখন ঘরের মধ্যে বসে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তখন তারা তাদের সেই মনের আদিম কামনা-বাসনা অর্থাৎ, নিষ্ঠুর আচরণটা বের হয়ে আসে।
এই মনোবিজ্ঞানী বলছিলেন, ‘মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো কারও প্রতি অন্ধভক্তি থাকা, আবার নির্দিষ্ট কাউকে অপছন্দ করা। এ কারণে সাধারণত কেউ কিছু বললে বা কেউ কারও বিরুদ্ধে কিছু বললে, সহজেই বিশ্বাস করে ফেলি। এ সমস্যাটা আমাদের এই জাতিগতও।’
সাইবার লিঞ্চিংয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর কেমন প্রভাব ফেলে তা জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘সাধারণত স্ট্রেস ডিজঅর্ডার, পোস্ট ট্রমাটিক ডিজঅর্ডার হয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং সেই বৃদ্ধি একটা সময় আত্মহত্যায় গিয়ে পৌঁছতে পারে। যেসব মানুষ সাইবার লিঞ্চিংয়ের সমস্যা নিয়ে অন্য কারও সঙ্গে আলোচনা করে না। আবার যাদের এ সমস্যা সহ্য করার ক্ষমতাও কম থাকে, তারাই মূলত একটা সময় গিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।’
সমাধান হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কমানো বা যৌক্তিক ব্যবহারের পরামর্শ এই মনোবিজ্ঞানীর। তিনি বললেন, ‘নির্দিষ্ট একটা গণ্ডি ঠিক করে ফেলতে হবে। অবশ্যই সবার সঙ্গে সেই সাইবার লিঞ্চিংঘটিত সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে হবে। নিজের মধ্যে সমস্যাটি পুষে রাখা যাবে না, জানাতে হবে পরিবার এবং কাছের বন্ধুদের। প্রয়োজনে নিতে হবে আইনি সহায়তাও।’
সাইবার লিঞ্চিং মব জাস্টিসের ক্ষেত্র তৈরি করে। তাই বিষয়টি নিয়ে সচেতন হওয়ার ওপরও জোর দিলেন তিনি।










