তবে

বড় হওয়ার একটা অসুবিধা আছে। বড় হওয়ার সময় বোঝা যায় না, ঠিক কখন বড় হয়ে গেলাম। একদিন হঠাৎ দেখি, বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে না। বৃষ্টি হচ্ছে অথচ মাথায় চিন্তা— বাসায় ফিরে কাপড় বদলাতে হবে, জুতা ভিজে গেলে শুকাব কোথায়, কাল সকালে বৃষ্টি হলে অফিসে যাব কীভাবে?
ছোটবেলায় বৃষ্টি হলে আমরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম না। ছুটে বাইরে চলে যেতাম। মা বারান্দা থেকে চিৎকার করতেন, ‘জ্বর আসবে!’ আমরা আরও জোরে দৌড়াতাম। এখন বৃষ্টি হলে ভাবি, ছাতা নিয়েছি তো?
ছোটবেলায় বাসায় মেহমান আসবে শুনলে আনন্দ হতো। বিশেষ করে কেউ সঙ্গে করে মিষ্টি আনলে। এখন তো অবস্থা ভিন্ন। মেহমান আসবে শুনলে বুকের ভেতর আনন্দের বদলে একটা হিসাব শুরু হয়। ঘর গোছানো আছে কি না, নাশতা কী দেওয়া যায়, ফ্রিজে কী আছে। মাথার ভেতর দ্রুত সভা বসে যায়। সভার সিদ্ধান্ত সাধারণত একটাই, লোকটা আরেকটু আগে জানিয়ে এলেই পারত।
একসময় বন্ধুরা ফোন না করলে মন খারাপ হতো। এখন ফোন না করলে ভালো লাগে। ফোন করলে আবার চিন্তা হয়, নিশ্চয়ই কোনো দরকার আছে। দরকার না থাকলেও চিন্তা হয়। এত রাতে দরকার ছাড়া ফোন করার মতো মানুষ সে কি না, সেটা নিয়েও চিন্তা করি।
ছোটবেলায় ঈদের আগে নতুন জামা পেলে দিন গুনতাম। ঈদের দিন সকালে জামাটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতাম। কেউ একটু প্রশংসা করলে সারা দিন মন ভালো থাকত। এখন ঈদের আগে জামা কিনতে গিয়ে প্রথমে দাম দেখি। তারপর ভাবি, এই জামা কত দিন পরা যাবে। জামা-কাপড়ের চেয়ে বাজেটের অবস্থা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করি।
বড় হওয়ার আরও একটা লক্ষণ আছে। ছোটবেলায় মা-বাবা বলতেন, ‘সময় থাকতে পড়াশোনা করো।’ আমরা শুনতাম না। এখন নিজের সন্তানকে বলি, সন্তানও শোনে না। বুঝতে পারি, পৃথিবীতে কিছু কথা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলা হয়; কিন্তু কেউ শোনে না।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ছোটবেলায় বড় হতে চাইতাম। বড় হলে নিজের ইচ্ছামতো চলা যায়— এটাই ছিল ধারণা। এখন বুঝি, নিজের ইচ্ছামতো চলার চেয়ে অন্যের ইচ্ছা সামলাতেই বেশি সময় চলে যায়। অফিসের ইচ্ছা, পরিবারের ইচ্ছা, সমাজের ইচ্ছা। নিজের ইচ্ছাটা কোথায় থাকে, মাঝেমধ্যে মনে করতে হয়।
তবু আমরা বলি, বড় হয়েছি। কথাটা বলতে ভালো লাগে। বয়সের একটা সম্মান আছে; কিন্তু গভীর রাতে হঠাৎ পুরনো কোনো গান শুনলে, কিংবা অনেক দিন পর স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে, ভেতরে যে ছেলেটা লাফিয়ে ওঠে, সে এখনো বড় হতে পারেনি।



