একা রুদ্র

অলংকরণ: অরবিন্দ হালদার
কোন পথে ফিরতে চেয়েছিলেন রুদ্র? যে পথ সবার তা কোনোদিনই তার হয়ে ওঠেনি। কবিতায় শব্দ বেছে নেওয়া, বিশ্বাসের গভীর দীক্ষার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার মধ্য দিয়ে নিজের সময়ে তিনি পৃথক হয়ে উঠেছিলেন
আমার কেন জানি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর মৃত্যুদিনটা শীতকাল বলে মনে হয়। চোখ বন্ধ করলে টের পেতে শুরু করি খুব ভোরবেলা কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকা ফোনটা জেগে উঠেছিল ভয়ংকর এক সংবাদ প্রেরণ করতে। অথচ তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯৯১ সালের জুন মাসে; আশ্চর্য!
জন্মদিনে তার চলে যাওয়ার দিনের দৃশ্যগুলো ভাঙা ভাঙা সাদাকালো ছবি হয়ে ফুটে উঠতে শুরু করল কেন, কে জানে! আমার বরাবরই মনে হয়েছে, মৃত্যুর গভীর স্তব্ধতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে কবিদের দ্বিতীয় জন্মের সূচনা ঘটায়। মৃত্যুর চির অন্ধকার, চির নৈঃশব্দ্য যা কেড়ে নেয়, তার অনেকটাই আবার ফিরে আসতে শুরু করে। যেন একটা থেমে যাওয়া নদী বৃষ্টির অগণিত নতুন ফোঁটায় আবার জেগে উঠে চলতে শুরু করল। তার গতিপথ এবার নতুন ভাবনার ভূগোলে পৌঁছাবে, চিন্তার আন্দোলনে নিজস্ব বাচ্যার্থের সীমা অতিক্রম করে ভিন্নভাবে বেঁচে উঠবে।
কবি শঙ্খ ঘোষ কবিতায় লিখছেন,
লেখো আয়ু, লেখো আয়ু
চুপ করো শব্দহীন হও।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ কি এক আয়ু লিখেছিলেন?
আদুল ঘাস ছাড়িয়ে পাইন পাহাড় ছাড়িয়ে
গহ্বরের পর গহ্বর আর ধবল শৃঙ্গের পর শৃঙ্গ ছাড়িয়ে
সেই
না...
স্বাতী বিন্দু আর অরুন্ধতীর পাশ ছাড়ানো ঊর্ধ্বতনে উঠে যাওয়া
না
আরও দূরে, দূর কিংবা না দূর যেখানে একা হয়ে শুয়ে আছে,
কিংবা নেই
চরাচরহীন সেই না— এর বিরাম থেকে, ধ্বনিমূল থেকে
নিযুত নিযুত কত আলোকবর্ষের পার থেকে।
দেখি
দেখি ওই পরিশ্রমী মুখ।
এখানে এসেই মনে হয় রুদ্র নতুন এক জন্মের মধ্যে জেগে উঠলেন। এক কবির আয়ুষ্কাল ভীষণ পরিশ্রমে আবার নিজের কবিতাকে মেলে ধরছেন ভিন্ন অনুধাবনের অর্থের সামনে। মৃত্যুর দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা কবির জন্মদিন আজ তার প্রথম জন্ম যেন। সেই প্রথম জন্মে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ উপদ্রুত উপকূল। ১৯৭৯ সাল পার হয়ে আরও কয়েক বছর পর হাতে এসেছিল। ততদিনে কবির সঙ্গেও পরিচয়ের পালা শেষ হয়েছে।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে কখনো মনে হয় দ্বিখণ্ডিত এক আত্মা। বারংবার শুধু মনে হয় সেই পুরনো এক শীতে তার মৃত্যু হয়েছিল। সেখান থেকেই আবার নতুন করে জন্ম নিয়েছেন তিনি
ভরা ফসলের মাঠে যদি মৃত্যু হয়
ভরা জোয়ারের জলে যদি মৃত্যু হয়,
আমার স্বপ্নের দায়ভার আমি তবে তোমাকেই দেবো।
মুছবো না দেহ থেকে মাছের ঘ্রাণের মতো ভেজা ঘাম
বসন্ত আসার আগে এই মৃত্যু, তবু তাকে বলবো না অসময়...
তার লেখা ‘ফসলের কাফন’ কবিতাটা প্রথম পড়েছিলাম। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে হেঁটে আসেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো। দাড়িপূর্ণ মুখ, ঠোঁটে হাসি আর একজোড়া ভীষণ উজ্জ্বল চোখ নিয়ে। ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজ মাঠে অথবা পুরনো শহরের কোনো গলিতে রিকশা ভ্রমণের সময়ে তার কবিতার শব্দগুলো যেন হাওয়ায় উড়ে আসত। কতদিন ভীষণ অন্যমনস্ক হয়ে থাকতে দেখেছি তাকে। ভিড়ের মধ্যে থেকেও কোথাও থাকতেন না রুদ্র। আরও পরে টের পেয়েছি, তার মাথার ভেতরে কবিতার শব্দ জেগে উঠছে।
একদিন সুইপার কলোনির দেয়ালের পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘মৃত্যুকে তবুও কেন অসময় বলতে চান না আপনি?’ মৃত্যু তো চির সমাপ্তির দেশ, তাহলে?’
হেসে উঠেছিলেন রুদ্র। উত্তর দেননি। মনে পড়ে সেই দুপুরে ঝির ঝির করে পড়া বৃষ্টির ভেতরে সুইপার কলোনির একটা ঘরে বসে আমাদের মৃত্যুবিষয়ক আলোচনার সমাপ্তি ঘটেছিল।
আরও অনেকদিন পরে, মানে তার মৃত্যুর দিনটাকে আরও পেছনে ফেলে এসে প্রশ্নের উত্তরটা পেয়েছিলাম ‘উপদ্রুত উপকূল’-এর পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে। ‘ক্লান্ত ইতিহাস’ কবিতায় রুদ্র লিখছেন,
যে-পথে ফিরেছে সব, সেই পথে
আমার হবে না ফেরা,
ভাঙনের রুগ্ণ গান শুনতে শুনতে,
বৃষ্টিতে আমুণ্ডু ভিজে
বেহুলার ভাঙা ভেলা ফিরে যাবে জন্মের বিশ্বাসে!
সাথে আমি কী কী নেবো?
বিলাসী নগর থেকে তীক্ষ্ণ রমণীর প্রেম
মদ, মাংস, কৃত্রিম হাসির ঠোঁট,
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভালোবাসা?
ইটের নিসর্গ থেকে জংধরা মানুষের শব,
কালো টাকা, জালিয়াতি,
আলুর গুদাম,
আর এই ন-পুংশক রাজনীতি?
কোন পথে ফিরতে চেয়েছিলেন রুদ্র? যে পথ সবার, তা কোনোদিনই তার হয়ে ওঠেনি। কবিতায় শব্দ বেছে নেওয়া, বিশ্বাসের গভীর দীক্ষার কাছে নিজেকে সমর্পণ করার মধ্য দিয়ে নিজের সময়ে তিনি পৃথক হয়ে উঠেছিলেন। একজন কবির বিশ্বাস শুধু রাজনৈতিক তো নয়। তার বিশ্বাস জমা থাকে কবিতার প্রতিটি শব্দের কাছে, তার বিশ্বাস জমা থাকে কবিতায় একটু একটু করে গড়ে তোলা সামগ্রিক ছবির কাছে, পাঠকের কাছে। কবিকে জানতে হয়, কবিতা কখন সবার কথা হয়ে ওঠে। রুদ্রর কবিতা সবার কথা হয়ে উঠতে চেয়েছিল। সফলও হয়েছে। চারপাশে যা কিছু গড়ে উঠেছে, যে জীবন বয়ে চলেছে তার সবকিছুকেই তিনি সন্দেহ করেছিলেন। তার সন্দেহ খুলে ফেলতে চেয়েছিলেন চারপাশে সময়ের নোনা ধরা সব মুখোশ। এখানেই তার জীবনের রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটে গিয়েছিল। নিজস্ব বিশ্বাস থেকে রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিকে যাত্রা করেছিল তার কবিতা। সেই যাত্রাপথকে এখন তার কবিতার পাঠক নতুনভাবে আবিষ্কার করছে।
সত্তরের দশকের এক অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলা কবিতার পৃথিবীতে ভেলা ভাসিয়েছিলেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। উপদ্রুত ছিল তার কবিতার সমকাল। বাংলাদেশে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ছাত্র আন্দোলন আর ছায়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতকদের তীক্ষ্ণ নখের আঁচড়ে কেটে যাওয়া সময়, রক্তপাতের ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা সময়ে গোটা পৃথিবীও ছিল অস্থির। কাছাকাছি সময়ে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ব্যক্তিগত ভয়ংকর অভিজ্ঞতাকে উগড়ে দিয়েছেন কবিতায়। যুদ্ধ, নিপীড়িত মানুষের উত্থান আর পুঁজিবাদী সমাজের ভেতরকার নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে কবিতা উচ্চকিত হয়ে উঠেছে। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত ‘মানুষের মানচিত্র’ কাব্যগ্রন্থে রুদ্রর কবিতার জমিনে মাটিতে হাত রেখে টের পাওয়া যায় তিনি লিখছেন,
বনের হরিণ নয়, বাঘ নয়, এতো রাতে চৌকিদার চলে।
হোই কে যায়? কে যায়? গঞ্জের বাতাস ফেরে হিম, নিরুত্তর।
কে যায়? কে যাবে আর! দশমীর অন্ধকার একা একা যায়,
একা একা চৌকিদার আঁধারের বাঁকে বাঁকে নিজেকে তাড়ায়।
নিজেকেই প্রশ্ন করে কে যায়? কী নাম তোর? কোথায় থাকিস?
কী তুই পাহারা দিবি, জীবনের কতটুকু আগলাবি তুই!
ছিঁচকে-সিঁধেল চোর— আর যেই চোর থাকে দিনের আলোয়?
আর যেই চোর থাকে দেহের ভেতর, শরীরের অন্ধকারে?
কোন অন্ধকারের কথা বলছেন রুদ্র? যে অন্ধকার থাকে শরীরের ভেতরে কে সে? সে তো আমাদেরই রুগ্ণ আত্মা থেকে প্রক্ষিপ্ত। সময়ের গহ্বরে জমে ওঠা স্থবির বিষাক্ত বাষ্প। ভাষা বদলে যায় রুদ্রর, দেখার চোখ সময়ের ভেতরে খোঁজে পাহারাওয়ালা। শব্দ তাকে এগিয়ে নিয়ে চলে ভিন্ন এক সংক্ষুব্ধ সমুদ্রের দিকে। একই কবিতার শেষে তিনি লিখছেন আবার,
অন্ধকার পৃথিবীতে শুধু কিছু তারা জ্বলে, দূরের নক্ষত্র।
ঝিঁঝি ডাকে। পাটের পচানি থেকে গন্ধ আনে রাতের বাতাস।
পুরনো কবর খুঁড়ে শেয়ালেরা বের করে আনে আধ-পচা লাশ—
হোই কে যায়, কে যায়, পৃথিবীর অন্ধকারে চৌকিদার চলে।
স্পষ্ট দেখা যায় রুদ্রকে এখান থেকে। তার কাছে পাল্টে যাচ্ছে মানুষের মানচিত্র। রাজনীতি বদলে যাচ্ছে তার কবিতায়, শব্দের ব্যবহার নতুন বাঁকে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার কবিতায় এই নতুন বাঁক নেওয়াকে বিবেচনা করতে গেলে অন্যরকমই মনে হয়। আশির দশকে ব্যক্তি রুদ্র নিজস্ব জীবনের একধরনের টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছিলেন। সেই জীবনের ভেতরে তিনি স্বেচ্ছাচারী। তিনি একা, জলে ভেসে যাওয়া কবিতার লখিন্দর; তার ভেলায় বেহুলাও নেই। কিন্তু তার কবিতাকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সেখানে তিনি ঋজু। ‘ছোবল’ কাব্যগ্রন্থের ‘মুখোমুখি’ কবিতায় লিখছেন,
আমরা কথা বলতে চাই,
আমরা আমাদের ক্ষুধার কথা বলতে এসেছি,
আমরা কথা বলবো।
তোমরা সঙ্গিন উঁচিয়ে আছো তোমরা রাইফেল তাক করে রেখেছো...
একা হেঁটে চলা, সফেন আড্ডায় ম্লান হাসি ছড়ানো, নিমগ্ন হয়ে থাকা তার আরেকটি সত্তা সেখানে অনুপস্থিত। আসলে একজন কবির কোথাও এক টুকরো বিশ্বাস গভীর হয়ে গেঁথে থাকে। সেই বিশ্বাসকে, কাব্যিক দর্শনকে মনোযোগী পাঠক খুঁজে পান কবিতা হিসেবে। সেখানে কবি বাতাসে ভেসে বেড়ানো শব্দতরঙ্গ নিমেষে ধরে ফেলে তুলে নেন কবিতায়। যে সত্তার হদিস কোথাও ছিল না তাকেই তিনি রূপ দেন। তার অভিজ্ঞতা চলমান সময়ের মধ্যে সততার সঙ্গে যা সেলাই করে তা-ই কবিতায় তার আত্মাকে প্রকাশ্যে আনে। নিজ হাতে নিজস্ব ভাষায় সেলাই করা কবিতার আচ্ছাদন নিজেকে তার সময়ের পরেও তাকে প্রাসঙ্গিক করে রাখে।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে কখনো মনে হয় দ্বিখণ্ডিত এক আত্মা। বারংবার শুধু মনে হয় সেই পুরনো এক শীতে তার মৃত্যু হয়েছিল। সেখান থেকেই আবার নতুন করে জন্ম নিয়েছেন তিনি। তার ব্যক্তিগত সত্তার পাশাপাশি কবিতার কাছে নিজস্ব বিশ্বাস জমা রাখা মানুষটি একেবারেই আলাদা। কারণ তার ভীষণ অভিজ্ঞতা এমন এক অসময়কে অতিক্রম করে এসেছে, যা আজকের পৃথিবীতে একেবারেই অচেনা নয়। তাই সেই উপদ্রুত অন্য একসময়ে বসে রুদ্রের কবিতাকেই আবার ফিরে পাঠ করার প্রয়োজন পড়ে।



