দ. কোরিয়ায় সাহিত্য বিপ্লব
গল্প-উপন্যাসে পুরুষতন্ত্রের দেয়াল ভাঙছেন নারীরা
- গড়ে তুলছেন স্বতন্ত্র পড়া-লেখার ঘর

ছবি: এএফপি
নীরব সাহিত্য বিপ্লবের স্রোতে ভাসছে দক্ষিণ কোরিয়া। আর এর নেতৃত্বে রয়েছেন নারীরা। পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে তারা গুটি গুটি পায়ে নিজেদের মেলে ধরছেন বিশ্বমঞ্চে। নারীরা লেখার মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করছেন নিজেদের সত্তা ও আত্মবিশ্বাস।
২০২৪ সালের শুরুতে প্রকাশিত হয় ইনফ্লুয়েন্সার সিন অ্যারোমির একক জীবনের আনন্দ নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা ‘সো হোয়াট ইফ আই লাভ মাই সিঙ্গেল লাইফ’। মুহূর্তের মধ্যে বইটি হয়ে ওঠে বেস্টসেলার।
বইটি উপভোগ করতে থাকেন তরুণ-বয়স্ক, অবিবাহিত-বিবাহিত, সন্তানসহ বা সন্তান ছাড়া— সব নারীই। সিনের আত্মবিশ্বাসী প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে তারা শক্তি পান অবাঞ্ছিত পরামর্শের বিরুদ্ধে। অথবা এতে খুঁজে পান ‘নির্দ্বিধায় একা থাকার’ স্বাধীনতা।
কিন্তু শিগগিরই তার সাফল্য অনলাইনে ব্যাপক সমালোচনা ও ঘৃণার মুখে পড়ে, যার বেশিরভাগই আসে পুরুষদের কাছ থেকে। তাদের বক্তব্য, সিন একাকী মারা যাবেন; তাকে স্বার্থপর বলে আখ্যা দেন এবং তার বিরুদ্ধে তোলেন ‘নিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ করার অভিযোগ।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে নারীর স্বাধীনতা গ্রহণ এবং পিতৃতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করা। সেখানে তরুণরা বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছেন নারীবাদের বিরুদ্ধে।
নারীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, হয়রানি এবং যৌন সহিংসতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে দেশটিতে। সেখানে নারীবাদ এমন একটি বিভাজনমূলক শব্দে পরিণত হয়েছে, এটি প্রায়ই ব্যবহার করা হয় গুরুতর অভিযোগ হিসেবে। এটি অনলাইনে ‘উইচ-হান্ট’ (প্রমাণ ছাড়াই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা) এবং অফলাইনে হয়ে দাঁড়ায় নিন্দার কারণ।
এখন নারীরা নিজেদের গল্প ভাগ করে নেওয়ার জন্য একটি জায়গা তৈরি করছেন, যা দেশের সাহিত্য জগতে রূপ নিচ্ছে এক নীরব বিপ্লবের।
এ বছর দেশটির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার ‘দ্য ই স্যাং অ্যাওয়ার্ডস’-এ প্রথমবারের মতো ছয়টি বিভাগেই জয়লাভ করেছেন নারীরা। এ ছাড়া গড়ে উঠেছে ‘বই আলোচনা’ এবং ‘গুয়েলবাং’ নামে পরিচিত পড়া ও লেখার ঘর। এগুলোয় একত্রিত হতে পারেন নারীরা। সেখানে তারা বিশেষভাবে জোর দেন একটি সম্প্রদায় হিসেবে বেড়ে ওঠার। অনেকের কাছে গুয়েলব্যাং এক ধরনের স্বস্তির জায়গা, যাকে তারা একধরনের দমবন্ধ অনুভূতি থেকে মুক্তি হিসেবে দেখেন।
২০২৪ সালে হান কাংয়ের ঐতিহাসিক নোবেল পুরস্কার জয়ের ঘটনাকে বাদ দিলে কোরিয়ান লেখালেখিতে সবসময় এতটা দৃশ্যমান ছিল না নারীদের কণ্ঠ। তবে, ২০১৬ সালে দেশের ‘মি-টু’ আন্দোলন ‘সাধারণ নারীদের মুখ খুলতে উৎসাহিত করেছে’ বলে জানান লেখক ইনিউ। তিনি ২০১১ সালে চালু করেছিলেন লেখার ঘর। এসব কাজে পছন্দ করেন তার ছদ্মনাম ব্যবহার করতে।
যদিও নারীবাদী বলে বিবেচিত যেকোনো কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বাড়ছিল, তবু আরও বেশি নারী সেখানে শুরু করেন লেখালেখির ক্লাস নেওয়া বা পাঠচক্র আয়োজন। ফলে এই স্থানগুলো অন্য নারীদের জন্য হয়ে ওঠে আরও সহজলভ্য।
‘যেসব নারী পড়া ও লেখার ঘরে অংশগ্রহণকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন, পরে তাদের মধ্যে অনেকেই লেখক হয়ে উঠেছেন,’ যোগ করেন ইনিউ।
তার ভাষ্য, ‘আমি অসংখ্য উদাহরণ দেখেছি— যেখানে অংশগ্রহণকারীরা লেখার মাধ্যমে তাদের কষ্টকে করেছেন আত্মস্থ; পুনরুদ্ধার করেছেন নিজেদের সত্তা ও আত্মবিশ্বাস। যদিও এ পরিবর্তনগুলো গভীরভাবে ব্যক্তিগত। কিন্তু যখন এগুলো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘটে, তখন তা প্রায়ই তৈরি করতে পারে একটি প্রতিক্রিয়ার শৃঙ্খল। সেই অর্থে, আমরা এখানে যা দেখছি তা একটি ধীর, কিন্তু নিশ্চিত বিপ্লব।’
সিন যে গল্পটি বলছেন, তা একেবারেই ব্যতিক্রমী। তিনি একটি গ্রামীণ বাড়ি কিনেছেন, যখন দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ বাস করে বৃহত্তর সিউল এলাকায়। দক্ষিণ কোরিয়া যখন জন্মহার বাড়াতে সংগ্রাম করছে, তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিয়ে না করার এবং সন্তান না নেওয়ার। আর তিনি নিজের বেছে নেওয়া জীবন উপভোগ করছেন— হোক তা সদ্য তোলা সবজি দিয়ে পুষ্টিকর সালাদ তৈরি করা, অথবা নিজের পছন্দমতো সাজানো আরামদায়ক বসার ঘরে ডায়েরি লেখা।
‘আমি এটা বলছি না যে, সবারই বিয়ে ছেড়ে দেওয়া উচিত বা বিবাহিত মানুষদের ছোট করে দেখা উচিত’, যোগ করেন সিন । তার ভাষ্য, ‘আমি শুধু লিখেছি, কীভাবে নিজের সিদ্ধান্ত ও ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি আমাকে সত্যিই সাহায্য করেছে আমার জীবন উপভোগ করতে। মানুষ আসলে আমার মতো গল্প শোনার অপেক্ষায় ছিল বলে আমার মনে হয়েছে।’
একজন পাঠক অনলাইনে লিখেছেন, ‘আমি এমন একজন, যে ভাবছিলাম বিয়ে আসলেই আমার জন্য ঠিক কি না। এই বই আমাকে সাহায্য করেছে আমার ভেতরের কণ্ঠস্বরের দিকে মনোযোগ দিতে।’ আরেকজনের বক্তব্য, ‘আমি যদি বিয়ের আগে এই বই পড়তাম, তাহলে হয়তো ভিন্ন হতে পারত আমার জীবন। তখন আমি বুঝতেই পারিনি যে, বিয়ে করার বিষয়টি ঐচ্ছিক।’
৩৯ বছর বয়সী লেখিকা সিনকে পেঙ্গুইনের সঙ্গে ছয় অঙ্কের আন্তর্জাতিক অনুবাদ চুক্তি এনে দিয়েছে বইটির সাফল্য। সিন একা নন। ২০২৪ সালে অনূদিত কোরিয়ান বইয়ের বিক্রি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে আগের বছরের তুলনায়। কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের লেখকরা প্রবেশ করছেন আন্তর্জাতিক বাজারে।
এর ফল হলো, একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় তালিকা। ‘দ্য ওল্ড ওম্যান উইথ দ্য নাইফ’ বইটি গু বিয়ং-মোর লেখা, যেখানে বলা হয়েছে হর্নক্ল নামে ষাটোর্ধ্ব এক কিংবদন্তি ঘাতকের গল্প। যিনি অবসরের কথা ভাবছেন, একই সঙ্গে লড়াই করছেন নিঃসঙ্গতার সঙ্গে।
দেশটির নারী লেখকদের মধ্যে আরও উল্লেখযোগ্য নাম হচ্ছে কিম চো-ইয়প, লেখক ও গায়িকা ল্যাং লি, ভায়োলনিস্ট এস্থার পার্ক।
নিজেদের একটি ঘর
সম্প্রতি ডেজন শহরের একটি নিরিবিলি রাস্তায় পুরনো একটি গির্জার বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রায় ৫০ নারী। তারা দেশের নানা প্রান্ত থেকে এসেছিলেন নারীবাদী লেখক হা মিনার একটি আলোচনায় অংশ নিতে। একজন মা এসেছিলেন তার ছোট্ট মেয়েকেও সঙ্গে নিয়ে।
হার ভাষ্য, ‘আমরা এখানে একে অন্যের গল্প শুনি এবং সেই অভিজ্ঞতা রূপান্তরমূলক হতে পারে।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই কর্মশালাগুলো নারীদের জন্য একটি নিরাপদ জায়গা, যেখানে তারা ভুল করতে পারেন এবং বেড়ে উঠতে পারেন, হয়তো জীবনে প্রথমবারের মতো।
একজন আগ্রহী লেখক হিসেবে হা মিনা অংশ নিয়েছিলেন পুরুষ কবি ও ঔপন্যাসিকদের পরিচালিত বেশ কয়েকটি লেখালেখির ক্লাসে। কিন্তু তিনি জানান, সেখানে বিষাক্ত ও শিকারি আচরণ ছিল খুবই সাধারণ। বহু বছর পর একজন নারী লেখকের পরিচালিত একটি লেখালেখির ক্লাসে যোগ দেওয়ার ঘটনা তার জীবন বদলে দেয়। পরে যিনি হয়ে ওঠেন তার পরামর্শদাতা।
হা মিনার প্রথম বই ‘ক্রেজি, ফ্রিকি, অ্যারোগ্যান্ট অ্যান্ড ব্রিলিয়ান্ট উইমেন’-এ তিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৩০ তরুণীর। এ সময় তিনি নারী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিষণ্নতা নিয়ে কাজ করছিলেন, দেখেছিলেন সামাজিক প্রত্যাশা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা থেকে আলাদা করা যায় না এটিকে। বইটি প্রশংসা অর্জন করে সমালোচকদের।
তাদের গল্পগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলা তাকে গভীরভাবে আরোগ্য দিয়েছে বলে জানান হা মিনা। তার ভাষ্য, ‘আমি আত্মহত্যার চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম এই বই প্রকাশের পর। এটা কি অবিশ্বাস্য নয়?’
এত সংখ্যক নারীকে কী টানে— এর পেছনে একক কোনো কারণ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, তারা সবাই নিজেদের একটি ঘর খুঁজছেন। এমন একটি জায়গা, যেখানে তারা খুঁজে পান কিছুটা স্বাধীনতা, সামান্য অ্যাডভেঞ্চার। যেমন তাদের একজন বলছিলেন, জায়গাটিতে তারা যেন ‘নিরাপদ এবং স্বচ্ছন্দ’ বোধ করে বলতে পারেন নিজের মনের কথা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি


