নদী ও চরের আতঙ্ক

আঁকা : সোহানুর রহমান
রাজশাহীর পদ্মা নদী আর চর ঘিরে ডালপালা মেলেছে অতিপ্রাকৃত অনেক কাহিনি। অধিকাংশই মাঝি, জেলে ও চরবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়েছে। কয়েকটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন লুৎফুল কায়সার
কার্তিকের শেষ দিক। পদ্মার পানি অনেকটাই নেমে গেছে। নদীর বুক জুড়ে ছোট-বড় চর জেগে আছে আর রাতের কুয়াশায় সেগুলো দূর থেকে মৃত মানুষের সাদা কাফনের মতো লাগে। সেদিন গভীর রাতে মাছ ধরে ফিরছিলেন কাদের মাঝি। নৌকায় একা। রাজশাহীর ঘাট তখনো অনেক দূর। আকাশে চাঁদ ছিল কিন্তু কুয়াশার আড়ালে তার আলো নদীর পানিতে ঠিকমতো পড়ছিল না।
কাদের ধীরে ধীরে বৈঠা বাইছিলেন। চারদিকে এত নীরবতা যে, বৈঠা থেকে ঝরে পড়া পানির শব্দও অস্বাভাবিক জোরে শোনা যাচ্ছিল। হঠাৎ বাঁ পাশের চর থেকে কেউ যেন ডেকে উঠল, ‘কাদের...’
কাদের চমকালেন। কণ্ঠটা তার মায়ের। ঠিক সেই কোমল স্বর! অথচ কাদেরের মা মারা গেছেন আট বছর আগে।
কিছুক্ষণ থম মেরে বসে রইলেন কাদের। রাতের বেলা নদীতে অনেক কিছুই শোনা যায়। হয়তো দূরের কোনো নৌকা থেকে কেউ অন্য কাউকে ডাকছে।
আবার ডাক এলো, ‘কাদের, বাবা... নৌকাটা এদিকে ভেড়াও।’
এবার আর ভুল হওয়ার উপায় নেই। ওটা ওর মায়েরই গলা। কাদেরের বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হলো। ছোটবেলায় সে বুড়ো মাঝিদের বলতে শুনেছিল, ‘রাতে নদীর চর থেকে পরিচিত কারও গলায় ডাক এলে কখনো উত্তর দিতে নেই। পেছনে তাকাতেও নেই। কারণ যে ডাকে, সে মানুষ না!’
সাদা ঘোমটার নিচে কোনো মুখ নেই। চোখ, নাক, ঠোঁট... কিছুই না। শুধু গভীর কালো অন্ধকার
কাদের চোখ নিচু করে আবার বৈঠা টানতে শুরু করলেন।
‘বাবা, আমাকে চিনতে পারছিস না?’
কণ্ঠটা এখন আগের চেয়ে কাছে। যেন চর থেকে নয়, নৌকার পাশের পানি থেকেই উঠছে।
কাদের বিড়বিড় করে দোয়া পড়া শুরু করলেন। বৈঠা দ্রুত চালালেন। কিন্তু আশ্চর্য, যতই এগিয়ে যান, ততই মনে হয় নৌকাটা একই জায়গায় ঘুরছে। সামনের চরের একটা ছোট্ট গাছ বারবার দেখতে পাচ্ছেন। যেন একই রাস্তায় ঘুরপাক খেয়ে চলেছে নৌকা।
তারপর শোনা গেল পানিতে কারও হাঁটার শব্দ।
ছপ্... ছপ্... ছপ্...
কেউ যেন চর থেকে নেমে নৌকার দিকে আসছে।
‘কাদের...’
এবার ডাকটি নৌকার ঠিক পেছন থেকে এলো।
‘একবার ফিরে তাকা, বাবা।’
কাদের দাঁতে দাঁত চেপে বৈঠা চালিয়ে গেলেন। হঠাৎ নৌকার পেছনটা ভারী হয়ে নিচু হয়ে গেল, যেন কেউ উঠে বসেছে।
তারপর কাদেরের ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা নিঃশ্বাস পড়ল, ‘আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছিস কেন?’
কাদের চিৎকার করে পুরো শক্তি দিয়ে বৈঠা টানল। হঠাৎ নৌকাটা যেন অদৃশ্য বাঁধন ছিঁড়ে সামনে ছুটে গেল। দূরে ঘাটের হারিকেনের আলো দেখা দিল। সেই আলো দেখামাত্র পেছনের ভারটা সরে গেল।
ভোরে লোকজন কাদেরকে ঘাটে অচেতন অবস্থায় পায়। তারা নৌকার পেছনে পায় খানিকটা ভেজা বালু আর সেই বালুতে ফুটে উঠেছিল একজন মানুষের হাতের ছাপ! কিন্তু ছাপটায় ছিল ছয়টি আঙুল।
দুই
পৌষের এক কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে পদ্মা পার হচ্ছিলেন তরুণ মাঝি রশিদ। নদীর পানি কমে মাঝখানে বিশাল চর জেগেছে। চারদিকে এমন নীরবতা, যেন পৃথিবীতে রশিদ ছাড়া আর কেউ নেই।
হঠাৎ কুয়াশার ভেতর চরের ওপর সাদা কাপড় পরা এক নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। মেয়েটা স্থির হয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। রশিদ ভাবলেন, মেয়েটা হয়তো বিকালে চরে ঘুরতে এসেছিল, পরে পথ হারিয়ে ফেলেছে। তাই নৌকা ঘুরিয়ে চরের কাছে নিয়ে গেলেন।
‘আপনি কে? এত রাতে এখানে কী করছেন?’ জিজ্ঞাসা করলেন রশিদ।
মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে পানির দিকে হাঁটতে শুরু করল। আশ্চর্যের বিষয়, তার পা বালুতে দেবে যাচ্ছিল না। সাদা কাপড়টিও বাতাস না থাকলেও পেছনে উড়ছিল।
রশিদের বুক কেঁপে উঠল। তবু নৌকা থেকে নেমে বললেন, ‘ওদিকে যাবেন না! সামনে গভীর পানি।’
মেয়েটি থেমে গেল। তারপর খুব ধীরে মাথা ঘুরিয়ে রশিদের দিকে তাকাল।
রশিদ দেখলেন, সাদা ঘোমটার নিচে কোনো মুখ নেই। চোখ, নাক, ঠোঁট... কিছুই না। শুধু গভীর কালো অন্ধকার।
ভয়ে রীতিমতো জমে গেলেন রশিদ।
মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, ‘আমার নৌকাটা কোথায়?’
সঙ্গে সঙ্গে নদীর ভেতর থেকে অসংখ্য মানুষের কান্নার শব্দ উঠল। কুয়াশার মধ্যে ডুবে যাওয়া একটি নৌকার কালো অবয়ব দেখা গেল। মেয়েটি হাত বাড়িয়ে রশিদের দিকে এগিয়ে এলো।
রশিদ চিৎকার করে জ্ঞান হারাল।
পরদিন সকালে জেলেরা তাকে চরের ধারে পড়ে থাকতে দেখল। তার নৌকাটি ছিল অনেক দূরে, মাঝনদীতে।
জ্ঞান ফেরার পর রশিদ শুধু বলেছিল, ‘মেয়েটার কোনো মুখ ছিল না!’
তারপর থেকে প্রতি পৌষের কুয়াশায় ওই চরের কাছে সাদা কাপড়ের নারীকে দেখা যায়।
স্থানীয়রা বলে ওই মেয়েটাকে দেখে যদি কোনো মাঝি চরে নামে, তাহলে সে আর ফিরে আসে না।
তিন
মাঘের শেষদিকে পদ্মার পানি নেমে গেলে রাজশাহীর দক্ষিণে বিশাল এক চর জেগে ওঠে। সেখানে দিনের বেলায় গরু-মহিষ চরানো হলেও সূর্য ডোবার আগেই সবাই ফিরে আসত। কারণ রাত নামলে চরের পশ্চিম প্রান্তে অদৃশ্য কোনো পশুপালের ঘণ্টা শোনা যেত।
রাখাল সোহেল এসব বিশ্বাস করত না। এক রাতে বারোটি মহিষ পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে সে ওই চরের একটি খড়ের ছাউনিতে থেকে গেল।
রাত গভীর হলে নদীর ওপর ঘন কুয়াশা নামে। আগুনের পাশে বসে থাকা সোহেল হঠাৎ দূরে ঘণ্টার ক্ষীণ শব্দ শুনতে পেল।
টুং... টাং... টুং...
শব্দটি ধীরে ধীরে কাছে আসছিল। যেন অসংখ্য গরু-মহিষ গলায় ঘণ্টা বেঁধে কুয়াশার ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে শোনা যাচ্ছিল খুরের আঘাতে শুকনো বালু চাপা পড়ার শব্দ।
সোহেল লণ্ঠন উঁচু করে বাইরে তাকাল। কিছুই নেই।
তার নিজের মহিষগুলো তখন অস্বাভাবিকভাবে চুপ হয়ে গেছে। তারা সবাই একই দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল।
হঠাৎ কুয়াশার ভেতর থেকে ভারী গলায় কেউ ডাকল, ‘তোর মহিষগুলো আমাকে দিয়ে দে...’
সোহেলের বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। তবু সাহস করে বলল, ‘কে আপনি?’
কোনো উত্তর এলো না। শুধু ঘণ্টার শব্দটি ছাউনির চারপাশে ঘুরতে শুরু করল।
টুং... টাং... টুং...
একসময় সোহেল দেখল, বালুর ওপর একের পর এক খুরের ছাপ তৈরি হচ্ছে। অদৃশ্য পশুগুলো যেন তার চোখের সামনে হেঁটে যাচ্ছে। ছাপগুলোর মাঝখানে ছিল মানুষের খালি পায়ের চিহ্ন কিন্তু পায়ের আঙুলগুলো সামনের বদলে পেছনের দিকে বাঁকানো।
সোহেল দোয়া পড়তে পড়তে আগুনে শুকনো খড় ছুড়ে দিল। আগুন জ্বলে উঠতেই কুয়াশার মধ্যে এক লম্বা কালো অবয়ব দেখা গেল। তার হাতে ছিল বাঁকা লাঠি আর গলা থেকে ঝুলছিল বিশাল একটি পিতলের ঘণ্টা।
অবয়বটি আবার বলল, ‘তোর মহিষগুলো গুনে দেখ তো...’
সোহেল ভয়ে নিজের মহিষগুলো গুনল। বারোটির জায়গায় সেখানে তেরোটি মহিষ দাঁড়িয়ে ছিল।
শেষের মহিষটির চোখ ছিল মানুষের মতো। সেটি ধীরে ধীরে মুখ খুলে বলল, ‘এবার তুই আমাদের সঙ্গে চল।’
সোহেল আর্তচিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল।
ভোরে অন্য রাখালরা এসে তাকে ছাউনির বাইরে পড়ে থাকতে দেখল। তার বারোটি মহিষ অক্ষত ছিল। কিন্তু ছাউনির চারপাশে শত শত খুরের ছাপ নদীর দিকে চলে গেছে।




