গারো সাহিত্যের বাতিঘর

মতেন্দ্র মানকিন
গারো জনগোষ্ঠীর যেকোনো অনুষ্ঠান শুরু হয় যার গান দিয়ে, সেই মতেন্দ্র মানকিন ৭৪ বছর বয়সে এখনো কাব্য রচনা করে চলেছেন। কাজ করছেন গারো টু বাংলা অভিধান নিয়ে। তাকে নিয়ে লিখেছেন আনিসুর রহমান
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার নয়াপাড়া গ্রামের এক ছায়ানিবিড় বাড়ির উঠোনের একপাশে ছায়াকাননে বসেছিলেন কবি মতেন্দ্র মানকিন। কী লেখেন, কেনই বা লেখেন, জানতে চাইলে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে কবি বললেন, ‘ছাত্রজীবন থেকেই লেখার প্রতি টান। আমাদের গারো সম্প্রদায় ভাষা ও সাহিত্যে অনেক পিছিয়ে। বাংলায়ও লিখেছি, যাতে মানুষ ইতিহাস জানতে পারে।’
কথা বলতে বলতেই জানা গেল, ১৯৫২ সালের ৩ জানুয়ারি ধোবাউড়ার এই প্রান্তিক জনপদেই জন্ম মতেন্দ্র মানকিনের। ১৯৬৯ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘সাপ্তাহিক প্রতিবেশী’ পত্রিকায় তার প্রথম কবিতা ‘বর্ষা’ প্রকাশিত হয়। ব্যাস, সেই যে কবিতার প্রেমে পড়া, আর পেছন ফিরে তাকানো হয়নি। তবে কবির জীবনপথ কখনোই মসৃণ ছিল না। ১৯৭২ সালে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে নাসিরাবাদ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে থমকে যায় পড়াশোনা। ১৯৭৩ সালে মাত্র দেড়শ টাকা বেতনে ভালুকাপাড়া মিশনারি স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। অবসরে যান ২০০৮ সালে।
মাঝে ১৯৮৪ সালে স্ত্রী তুষি হাগিদকের সঙ্গে সংসার শুরু করেন। সংসার সামলাতে গিয়ে দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট কবির মনে এক সময় তীব্র হতাশা নেমে আসে। ‘লেখালেখি করে কী হবে?’—এই ভাবনা থেকে এক দশক কবির কলম থমকে ছিল। একপর্যায়ে পাহাড়সম কষ্ট ভেঙে ফের কলম তুলে নেন কবি। ২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ, ‘পাথর চাপা ফুল’। এরপর একে একে রচনা করেছেন ১০টি বই— যার মধ্যে ৮টি কাব্যগ্রন্থ এবং ২টি প্রবন্ধ। কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে আছে না প্রেম না বসতি, এইতো জীবন এইতো মাধুরী ইত্যাদি। প্রবন্ধের মধ্যে অন্যতম গারোদের লোকায়ত জীবনধারা।
১৯৬৯ সালে স্বজাতীয় গারো (মান্দি) ভাষায় তিনি রচনা করেন কালজয়ী গান ‘বাঙআ জাবুছিম দুকনি সাগাল বালজ্রয়ে’। গারো জনগোষ্ঠীর যেকোনো আনুষ্ঠানিকতার সূচনা হয় এই অমর গানটি দিয়ে।
৭৪ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত নানান রোগ শরীরে বাসা বাঁধলেও কবির কলম থামেনি। বাড়ির পাশে বয়ে চলা নেতাই নদীর তীরে বসে তিনি এখনো নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। বর্তমানে কাজ করছেন ‘গারো টু বাংলা অভিধান’ নিয়ে। গারো ভাষা ও বাংলা সাহিত্যে অনন্য অবদানের জন্য ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির ৪৮তম বার্ষিক সাধারণ সভায় তাঁর হাতে ফেলোশিপ পুরষ্কার তুলে দেওয়া হয়।
কবির পাশে বসে স্ত্রী তুষি হাগিদক গর্বের সুর মিলিয়ে বললেন, ‘উনি প্রতিদিন ছায়াকাননে বসে লেখেন। কিছু না লিখতে পারলে ছটফট করেন।’








