মনের খোঁজটিও রাখুন

একটি প্রচলিত ধারণা আমাদের সমাজে জেঁকে বসেছে, মানসিক সমস্যা বুঝি শুধু নারীদেরই হয়। নারীদের জীবনের টানাপড়েন বেশি, হরমোনের ওঠানামা আছে, তাই হয়তো তারাই কেবল অবসাদে ভোগেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং সামাজিক পরিসংখ্যান পরিষ্কার বলছে, মানসিক রোগে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমানভাবে আক্রান্ত হন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিছু জটিল মানসিক রোগে পুরুষদের অবস্থা নারীদের চেয়েও দ্রুত খারাপের দিকে যায়। অথচ এ সত্যটা আমরা চেপে রাখি।
মেজাজের আড়ালে ডিপ্রেশন আর অ্যাংজাইটি
অফিস থেকে ফিরে ঘরের পুরুষটি হয়তো কারণে-অকারণে রাগারাগি করছেন। আমরা চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই—মানুষটার মেজাজটাই খিটখিটে, দিন দিন ভীষণ একরোখা হয়ে যাচ্ছেন। এই তীব্র রাগ, খিটখিটে আচরণ কিংবা হঠাৎ সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া আসলে ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটির লক্ষণ। মানসিক রোগ যখন কোনো পুরুষকে গ্রাস করে, তখন প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে বড় জটিলতা সৃষ্টি হয়—
প্রথমত, পারস্পরিক সম্পর্কের জায়গা। হুট করে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন, স্ত্রী বা সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে, বন্ধুদের এড়িয়ে চলেন।
দ্বিতীয়ত, নিজের প্রতি যত্ন। নিয়মিত গোসল করা, দাড়ি কাটা, ঠিকমতো খাওয়া— এই দৈনন্দিন হাইজিন মেইনটেইন করার ইচ্ছাটাই হারিয়ে ফেলেন। হয় তার ঘুম একবারে উবে যায়, না হয় সে সারাদিন মরা মানুষের মতো ঘুমিয়ে কাটান।
আর তৃতীয় ক্ষেত্রটি হলো তার পেশাগত জীবন। যে কাজে আগে দারুণ দক্ষ ছিলেন, সেখানে তার মনোযোগ শূন্যের কোটায় নেমে আসে। সিদ্ধান্তহীনতা আর কাজের প্রতি অনীহা গ্রাস করে।
শরীর যখন মনের ভাষার অনুবাদক
মনের রোগ অনেক সময় সরাসরি মনে আঘাত না করে শরীরে এসে ভর করে। একে আমরা বলি সাইকোসোম্যাটিক সিম্পটম। এ সময় দেখা দিতে পারে—
সারাক্ষণ শরীর ম্যাজম্যাজ করা
তীব্র ক্লান্তি
বুক ধড়ফড়ানি
মাথা ঘোরানো
ক্রনিক পিঠ-কোমর ব্যথা
এসবের পেছনে আসলে কোনো শারীরিক রোগ থাকে না। পুরো মেডিকেল টেস্টের রিপোর্ট হয়তো একদম নরমাল আসে অথচ মানুষটা দিন দিন শুকিয়ে যান। বিছানা থেকে ওঠার শক্তি পান না।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে শুচিবায়ু বা অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি)। ঘর থেকে বের হওয়ার পর মনে হয় দরজাটা লক করা হয়নি। একবার, দুবার, পাঁচবার করে তালা চেক করতেই থাকেন। লিফটে উঠতে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে, বদ্ধ ঘরে শান্তি পান না। এমনকি অনেক পুরুষ তীব্র মানসিক চাপের কারণে যৌন অক্ষমতা বা সেক্সুয়াল ডিসফাংশনে ভুগতে শুরু করেন। এই শারীরিক সমস্যাগুলো আসলে মনের একেকটি আর্তনাদ।
অ্যান্ড্রোপজ এবং হরমোনের উত্থান-পতন
নারীদের জীবনে যেমন মেনোপজ আসে, পুরুষদের জীবনেও কিন্তু ঠিক তেমনি আসে ‘অ্যান্ড্রোপজ’। ৫০ পার হওয়ার পর পুরুষদের শরীরে হরমোনের নানা পরিবর্তন ঘটে। তাদের শারীরিক সক্ষমতা ও যৌন ইচ্ছা বা লিবিডো আগের চেয়ে অনেক কমে যায়। এই শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আসে রিটায়ারমেন্ট, তখন জীবনটা এক ধাক্কায় ওলটপালট হয়ে যায়।
যে পুরুষটি জীবনের ৩০-৪০টা বছর সকাল হলেই ট্রাফিকের জ্যাম ঠেলে অফিসে ছুটেছেন, ফাইলের পর ফাইল সই করেছেন, যার একটা কথায় অফিসের দশটা মানুষ তটস্থ থাকতেন— হঠাৎ এক সকালে আবিষ্কার করেন তার আর কোনো তাড়া নেই। এখন ঘরের কোণে বসে থাকা এক অতিরিক্ত মানুষ। এই যে ক্ষমতা ও গুরুত্ব হারানোর তীব্র অনুভূতি, এটি অনেক সময়ই অসহনীয় হয়ে দাঁড়ায়। এটি তাদের ডুবিয়ে দিতে পারে চরম একাকিত্ব আর গভীর ডিপ্রেশনে।
আবার কর্মজীবনে তারা পরিবার বা আত্মীয়স্বজনকে খুব একটা সময় দিতে পারেননি, তাই অবসরের পর ঘরে ফিরে একধরনের অদ্ভুত অস্বস্তিতে ভোগেন। সন্তানরা হয়তো তাকে শ্রদ্ধা করে, কিন্তু ভয় আর দূরত্বের কারণে মন খুলে কথা বলতে পারে না। নাতি-নাতনিদের সঙ্গেও সেই সাবলীল সম্পর্কটি হয় না। ফলে নিজের চেনা ঘরেই শুরু হয় পরবাসী জীবন।
পঞ্চাশের পর দরকার মানসিক প্রস্তুতি
বয়স ৫০ পেরোলে দরকার মানসিক প্রস্তুতি এবং চমৎকার লাইফ প্ল্যানিং। এরই মধ্যে সেরে ফেলতে হবে রিটায়ারমেন্টের পরের পরিকল্পনাটিও। তাই বয়স ৫০ ছোঁয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে এসবের মানসিক প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। নিজেকে বোঝাতে হবে, জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হচ্ছে মানেই সব শেষ নয়। নতুন অধ্যায়ে নিজেকে কীভাবে ব্যস্ত রাখা যায়, তা আগে থেকেই ঠিক করতে হবে।
কেউ চাইলে পার্টটাইম কোনো কাজে যুক্ত হতে পারেন। অথবা জীবনের ব্যস্ততায় যে বইগুলো পড়া হয়নি, যে জায়গাগুলোতে যাওয়া হয়নি, এবার সেই অপূর্ণ শখগুলো পূরণ করার দায়িত্বটি তুলে নিতে হবে নিজের কাঁধে।
কর্মজীবনে থাকার সময়ই পরিবারের সঙ্গে একটা ইমোশনাল কানেকশন তৈরি করে রাখা জরুরি। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, বিকালে একটু হাঁটাহাঁটি করা বা জিমে জয়েন করার অভ্যাস বার্ধক্যের একাকিত্ব অনেকটাই কমিয়ে দেয়।
পাশাপাশি প্রয়োজন আর্থিক স্বাধীনতা। অবসরের পর নিজের এবং স্ত্রীর খরচের জন্য যেন কারও মুখাপেক্ষী হতে না হয়, সেই অর্থনৈতিক প্ল্যানিংটা সময় থাকতেই গুছিয়ে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ।
লেখক: মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাইকিয়াট্রিস্ট, সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল




